মনিরা বিব্রত বোধ করে, যদিও তার মিথ্যা বলা অভ্যাস নয় তবু মাসুমার কাছে তাকে মিথ্যা কথাই বলতে হয়েছিলো। মাসুমা বলেছিলো হাঁ ভাই, তোর স্বামী কি করেন?
জবাব দিয়েছিলো মনিরা বিদেশে থাকেন। চাকরী করেন।
মাসুমা আজ ধরে বসলো তোর স্বামী কি চাকরী করেন তা তো বললি না মনিরা! আজ তোর সব কথা বলতে হবে।
মাসুমার কাছে মনিরা অন্তরের কথা বলে, কিন্তু তাই বলে সব কথাইতো বলা চলে না বা যায় না! হেসে বললো মনিরা–তিনি সেনা বিভাগে কাজ করেন। সেনাপতি।
মাসুমার মুখে হাসি ফুটেছিলো পরক্ষণেই মুখ গম্ভীর করে বলেছিলো–তাই তো এমন বৌ ঘরে রেখে যেতে বাধ্য হয়েছেন, নইলে সারাদিন তোর আঁচলের তলায় পড়ে থাকতেন, বুঝলি?
একটা নিশ্বাস গোপনে চেপে বলেছিলো–মনিরা আঁচলের নিচে থাকবার মানুষ সে নয় মাসুমা, সে যে পাষাণের চেয়েও কঠিন।
বুঝেছি অভিমান হয়েছে। একবার দেখা হলে আমি তাকে ঠিক করে দেবো মনিরা। কেমন করে। তোকে ছেড়ে পালায় দেখবো! জানিস ভাই, আমার স্বামী একটি মুহূর্ত আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে রাজি নয়। অফিসে যান তাই না কতো, যতক্ষণ অফিসে থাকেন ফোনের পর ফোন করেন। সত্যি। ভাই, লজ্জায় আমার কেমন লাগে। বাড়িতে শ্বশুড়-শাশুড়ী কি যে ভাবেন—
মনিরা মাসুমার কথা শোনে আর ভাবে তার নিজের স্বামীর কথা সেও তো অমনি, একদণ্ড তাকে ছেড়ে সরে যেতে চায় না, কিন্তু পারেনা সে থাকতে। তার কাজ, তার নেশায় তাকে হাতছানি দিয়ে। ডাকে। তখন কোনো শক্তিই তাকে ধরে রাখতে পারে না। মনিরা জানে তার স্বামীর ভালবাসা অপূর্ব, যার কোনো দাম নেই। তার স্বামীর মত এমন ভালবাসতে বুঝি আর কেউ জানে না।
মনিরা স্বামীর চিন্তায় বিভোর হয়ে যেতো।
মাসুমা বলতো–একি, এমন নিশ্চুপ হয়ে গেলি কেননা মনিরা?
জবাব দিতো–কিছু না।
হাঁরে মনিরা, শুনেছি তোর স্বামী নাকি খুব সুন্দর দেখতে?
মোটেই না, কুৎসিৎ কদাকার তিনি।
বড় দুষ্ট তুই নিজের স্বামীর কথা বলবি না, এইতো?
এমনি নানা কথাবার্তায় দুই বান্ধবী মেতে উঠতো। মনিরার ভাল লাগতো মাসুমাকে, মাসুমা ভালবাসতো মনিরাকে। মনিরা সব কথা বান্ধবীকে বললেও আসল কথা কোনোদিন বলতো না, কারণ মাসুমার স্বামী পুলিশ অফিসার–পুলিশ সুপার সে। তরুণ পুলিশ সুপার হাশেম চৌধুরী।
কান্দাই শহরে ছুটিতে হাশেম এসেছে নতুন বৌকে নিয়ে বাপ-মার কাছে কটা দিন কাটাবে বলে। তারপর চলে যাবে সুদূর ভারতে। এর আগে ছিলো হাশেম চৌধুরী রেঙ্গুনে, সেখান থেকে বদলী হয়েছে সুদূর ভারতে। ইচ্ছা করেই হাশেম চৌধুরী ভারতে যাওয়া স্থির করে নিয়েছে। দিল্লী নগরীতে তার জয়েনের হুকুম এসেছে।
মাসুমার আনন্দ ধরে না–সে ভারতবর্ষ দেখতে পাবে! বিশেষ করে দিল্লী দেখার সখ তার অনেক। দিল্লীর বাদশাহদের জীবনকাহিনী তাকে চঞ্চল করে তোলে। আকবরের সমাধি, মমতাজের স্মৃতিসৌধ। তাজমহল, দিল্লীর চেরাগে দেহেলি মাজার–আরও কত কি!
মাসুমা গল্প করে মনিরা তন্ময় হয়ে শুনে। এসব দেশ দেখার সখ তারই কি কম! কিন্তু উপায়। নেই, কি করে যাবে, কে তাকে নিয়ে যাবে এই সব দেশে।
*
ছুটির দিন শেষ হয়ে আসে হাশেম চৌধুরীর।
মাসুমা বলে–ভাই, তোকে ছেড়ে যেতে হবে তাই আমার দুঃখ। সত্যি, তোকে যদি আমি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতাম!
হাসে মনিরা–সে সৌভাগ্য আমার কোনো দিন হবে না মাসু। আমি বড় হতভাগী।
কিসের অভাব তোর? লক্ষ লক্ষ টাকা যাদের রয়েছে তাদের আবার অভাব! ইচ্ছা করলে তুই সব পারিস।
কি যে বলিস ভাই। টাকা থাকলেই সব হয় না। তোর স্বামী পাশে আছে, তাই এতো বড় বড় কথা বলতে পারিস, আমার সব থেকেও আজ আমি সর্বহারা। জানিস মাসুমা, আমার বুকের মধ্যে কত ব্যথা জমাট বেধে আছে।
বলবি না তো কোনো কথা, জানবো কি করে!
সবতো বলবার নয়, তাই বলতে পারি না মাসু।
লক্ষ্মী বোনটি আমার, সত্যি তোর জন্য আমার অনেক কষ্ট হয়। আমার স্বামী যখন পাশে আসে–হাসে, কথা বলে, তখন মনে পড়ে তোর কথা জানিস মনিরা, তোর কথা মনে হলে আমি কেমন বিমর্ষ হয়ে যাই। উনি বলেন, হঠাৎ গম্ভীর হলে কেন? আমি কোনো জবাব দেই না। মনিরা, তুই যদি বলিস তাহলে আমি ওকে বলবো তোর সব কথা। কে তোর স্বামী যে এমন মানুষ বছরে একটি বার স্ত্রীর কথা মনে করে না। বড় পাষাণ, বড় নির্দয় তোর স্বামী।
মনিরা মাসুমার মুখে হাত চাপা দেয়, না না, তার কোনো দোষ নেই মাসু। সে তো সব সময় কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাই আসতে পারে না।
ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে মাসুমা–অমন চাকরী নাই বা করলো। কিসের অভাব তার? টাকার? কেন তোর তো অগাধ ঐশ্বর্য, যত টাকা সে চায় দিতে পারিস না?
উদাস কণ্ঠে বলে মনিরা–টাকার অভাব তার নেই মাসু। আমার ঐশ্বর্যের চেয়ে তার অনেক অনেক বেশি ঐশ্বর্য আছে।
তবে কেন সে চাকরী করে?
তার নেশা।
তোর মত স্ত্রীকে অবহেলা করে সে নেশা বজায় রাখে! বুঝেছি।
কি বুঝলি?
তোদের মধ্যে বনিবনাও নেই বুঝি?
ছিঃ ভুল বুঝিস নে মাসু। ওর মত মানুষ হয় না রে! ওর ভালবাসা যে একবার পেয়েছে সে ওকে কোন দিন ভুলতে পারবে না। মাসু, তোকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না, সে কেমন। মনিরার চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে আসে।
মাসুমা বলতো বেশ, তোর স্বামীর মত আর কারও স্বামী হয় না। কাদিনে বোন। নিজের হাতে মাসুমা মুছে দিতো ওর চোখ দুটো। ভাবতো–স্বামীকে কত ভালবাসে মনিরা, স্বামীর কথায় সে আত্মহারা হয়ে যায়!
