মরিয়ম বেগম শুধু নামায আর কোরআন তেলাওয়াৎ নিয়ে কাটান, সব সময় তার কামনা শুধু পুত্রের জন্য। পুত্রের চিন্তায় তিনি সর্বক্ষণ বিভোর। মাঝে মাঝে সংসার দেখা-শোেনা তাকে করতে হয়; কিন্তু মন তার পড়ে থাকে কোথায়–কোন্ অজানা দেশে।
নূর স্কুলে পড়ে, আজকাল একটু-আধটু বুঝতে শিখেছে। মাঝে মাঝে কখনও বাপির কথা স্মরণ হল উদাস হয়ে পড়ে। পড়া শোনায় সে সেরা ছেলে, যদিও তার বয়স সামান্য তবু বুদ্ধি অত্যন্ত প্রখর। বাপির কথা মনে হলে মাকে গিয়ে প্রশ্ন করে–মাগো, আমার বাপি কোথায় গেছে? কবে আসবে? কেন সে এত দিন আসে না?
কিন্তু কি জবাব দেবে মনিরা, কি করে বলবে তার বাপি কোথায় গেছে! কবে আসবে তাই বা কে জানে! জীবিত আছে না নেই, তাই বা কে বলতে পারে!
মনিরা শিশু সন্তানের কথায় শুধু নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতো, স্বামীর মুখখানা বার বার স্মরণ হতো তার অন্তরে।
মাকে কাঁদতে দেখে নূর ব্যস্ত হয়ে পড়তো, মায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলতো-মা, বাপির কথা বললে তুমি কাঁদো কেন? আর আমি বাপির কথা বলবো না। ছোট্ট নূর এখন অনেক কথা বলতে শিখেছে।
নূরের কথায় মনিরা ওকে বুকে চেপে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো–আমি এমনি কাঁদছি বাবা। তোমার বাপির কথা মনে করে কাঁদছি? তুমি কেন বলবে না?
মাগো, আমার বাপি কি করে বলো না মা? কোথায় থাকে সে?
তোমার বাপি মস্ত সৈনিক, দেশের কাজ তিনি করেন বাবা। কখন যে কোথায় থাকেন আমরা কেউ জানি না।
এবার বাপি এলে আমি কিছুতেই তাকে আর যেতে দেবো না। কিছুতেই যেতে দেবো না।
হায়রে অবুঝ শিশু, সে জানে না তার বাপিকে এ পৃথিবীর কেউ ধরে রাখতে পারবে না। কোনো শক্তিই তার চলার পথে বাধা দিতে পারবে না।
মনিরা নীরবে পুত্রের কথা শুনে যেতো আর আঁচলে চোখের পানি মুছতো।
মনিরা সদা উদাসীন থাকে বলে মামী মার চিন্তার অভাব নেই। সরকার সাহেবও ভাবেন এ ব্যাপার নিয়ে। মনিরার বয়স তো খুব বেশি নয়, এই বয়সে কোন্ মেয়ে স্বামী ছাড়া বাঁচতে পারে!
মাঝে মাঝে রহমান আসে, গোপনে সাক্ষাৎ করে যায় সে মনিরার সঙ্গে। সর্দার না থাকায় তাদের মনের অবস্থা ভাল নয়। সমস্ত আস্তানা জুড়ে এক মহা অশান্তির কালোছায়া নেমে এসেছে। তবে আস্তানার কাজ বন্ধ নেই, তাদের দলবল সব পূর্বের ন্যায় সঙ্গবদ্ধভাবেই রয়েছে। রহমান এখন এদের পরিচালনা করে। কায়েস তার সহকারী হিসেবে কাজ করছে।
নাসরিন তার কয়েকজন সঙ্গিনী মেয়েদের নিয়ে বনে বনে নেচে গেয়ে ঘুরে বেড়ায়। বৃদ্ধা দাইমার অনুরোধে নাসরিনকে বিয়ে করেছে রহমান। অবশ্য বনহুর রহমানকে আদেশ দিয়েছিলো নাসরিনকে যেন রহমান জীবনসঙ্গিনী করে নেয়।
রহমানকে স্বামীরূপে পেয়ে নাসরিন গর্বিতা-আনন্দিতা, রহমান বলিষ্ঠ সুন্দর সুপুরুষ। তাছাড়া দস্যু বনহুরের সহকারী সে–কম কথা নয়।
তাজকে নিয়ে শুধু মুস্কিলে পড়েছে রহমান। তাজ সেই থেকে কেমন যেন মুষড়ে পড়েছে। ভালভাবে খায় না, সব সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে, হয়তো তার মনিবকে আর দেখতে পায় না– এটাই তার দুঃখ।
রহমান নিজের হাতে তাজকে খাওয়ায়। পিঠ চাপড়ে আদর করে। গা নেড়ে দেয়।
অশ্ব হলেও তাজ অত্যন্ত বুদ্ধিশীল ছিলো।
মাঝে মাঝে তাজকে নিয়ে যেতো রহমান কান্দাই শহরে। চৌধুরী বাগান বাড়ির অদূরে রেখে দাঁড়িয়ে থাকতো। মনিরা স্বামীর অশ্বের পাশে এসে দাঁড়াতো। তাজের পিঠে স্বামীর চেহারাটাই ফুটে উঠতো তার চোখের সামনে। জমকালো তাজের পিঠে জমকালো পোশাক পরা সৌম্য সুন্দর একটি পুরুষ।
মনিরার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তো ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। রহমান সান্ত্বনা দিতো, বলতো–বৌরাণী কাঁদবেন না। সর্দার নিশ্চয়ই ভাল আছেন। তিনি আবার ফিরে আসবেন।
কিন্তু মনিরার মনে সান্ত্বনা আসতো না। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতো তার বুক চিরে।
রহমান ফিরে যেতো।
তাজ অদৃশ্য হতে দৃষ্টির অন্তরালে। মনিরা ঘরে ফিরে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়তো বিছানায়, শূন্যতায় হাহাকার করে উঠতো তার মন।
নূর তখন স্কুলে।
মামীমা হয়তো ঘরে বসে এবাদত করছেন। মনিরা একা একা, স্বামীর শিশুকালের ছবিটা বুকে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকতো নিশ্চুপ পাষাণমূর্তির মত।
পাশের বাড়ির এক বান্ধবী ছিলো মনিরার। কলেজে একই সঙ্গে পড়াশোনা করেছে ওরা। অল্পদিন হলো বিয়ে হয়ে এসেছে, চৌধুরী বাড়ির অদূরেই তাদের বাড়ি। মনিরার বান্ধবীর নাম মাসুমা। মনিরার সঙ্গে ওর অত্যন্ত মিল ছিলো ছোটবেলা থেকেই স্কুলে যখন পড়তো তখন হতে। তারপর কলেজ জীবনেও ওরা পড়াশোনা করেছে এক সঙ্গে।
এবার মাসুমা বিয়ে হয়ে এলো মনিরার বাড়ির পাশে। সময়ে অসময়ে মাসুমা আসতো মনিরার কাছে। মনিরা সন্তানের জননী হয়েছে, আর মাসুমা সদ্য বিবাহিতা।
মনিরার হৃদয়জোড়া হাহাকার আর মাসুমার জীবন আনন্দে ভরপুর।
মাসুমা স্বামীর কথা নিয়ে মেতে উঠতো–কত কথা!
মনিরা নিশ্চুপ শুনে যেতো, সামান্য দু’চারটে কথা বলতো। উদাস হয়ে পড়তো মনিরা, মাসুমার স্বামীর কথায় মনে হতো তার স্বামীকে।
বলতো মাসুমা–আমি তো তোকে সব কথাই বলি। কোনো কথা লুকোই না, কিন্তু তুই বড় চাপা মেয়ে–একটি কথাও তুই বলিস না আমাকে।
মনিরা হাসতো–ব্যথাকরুণ, বেদনাভরা সে হাসি।
মাসুমা নাছোড়বান্দা, একদিন মনিরাকে ধরে বসলো সে–শুনেছি তোর স্বামী নাকি দূরদেশে কাজ করেন, কিন্তু কি করেন তা তো কোনোদিন বললি না?
