না, না, আমি আপনার জন্য সব হাসিমুখে মেনে নিতে পারবো। তবু ওরা আপনাকে মুক্ত করে দিক।
লুসী, আমার জন্য তুমি নিজেকে বিনষ্ট করা না। আমার অভিশপ্ত জীবনকে এভাবে শেষ হতে দাও লুসী।
না না, ওকে মুক্ত করে দিন রিজভী, আমি আর ওর এ কষ্ট সইতে পারছি না। আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো।
রিজভীর মুখ উজ্জ্বল হলো, জুকে বেরিয়ে যাবার জন্য ইংগিত করলো সে।
জব্রু হাতের চাবুক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঘৎ ঘৎ করতে করতে বেরিয়ে গেলো। রিজভীর আদেশে সে ক্ষান্ত হলো, কিন্তু আরও মারার জন্য সে উগ্রীব হয়ে উঠেছিলো।
জব্রু নিগ্রো এবং বোবা। তার রাগ অতি ভয়ঙ্কর। রিজভী এই জ্বর সাহায্যে দিল্লী শহরে বহু অসাধ্য কাজ সাধন করে থাকে। জব্রু জানোয়ারের মতই বুদ্ধিহীন, ওকে রিজভী যেভাবে চালনা করে সেভাবে সে চলে।
রিজভীর বাবা ত্রুকে ভিয়েৎকং-এর কোনো এক জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে এনেছিলো। তখন জব্রু ছিলো পাঁচ ছ’ বছরের বালক মাত্র। কথা বলতে পারতো না বলেই জ্বর বাবা-মা ওকে বনের মধ্যে ফেলে দিয়ে এসেছিলো। জব্রু বনে ফলমূল খেয়েই বেঁচে ছিলো বোধ হয়। রিজভীর বাবা লোকজন। নিয়ে ভিয়েৎকং-গিয়েছিলেন কোনো কাজে। হঠাৎ কোনো কাজবশতঃ তাদের বনে যাওয়ার দরকার পড়ে, তখন পায় ছোট্ট জমকালো গরিলা শিশুর মত জব্রুকে। নিয়ে আসে এবং তাকে লালন-পালন। করে। কিন্তু জব্রু সভ্য জগতে এলেও আর মানুষ হতে পারলো না। বোবা তো সে জন্ম-থেকেই ছিলো, তার হাবভাব সব যেন কেমন হলো। রাক্ষসের মত খেতো, আর ঘুমাতো। একদিন এক দারওয়ানের। বিছানার পাশে শুয়ে ঘোৎ ঘোৎ করে ঘুমাচ্ছে জব্রু। দারওয়ান এসে ওকে লাথি দেয়–বেটা আমার ঘরে কেন, ভাগ এখানে থেকে।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় জব্রু বন্যহস্তীর মত তেড়ে উঠে এবং দারওয়ানজীকে টুটি টিপে হত্যা করে ফেলে।
সেদিন রিজভীর আত্নীয়-স্বজন–বাড়ির সবাই জঞর কাজ দেখে স্তম্ভিত হতবাক হয়ে গিয়েছিলো। কারো মুখে কোনো কথা ছিলো না। সবাই জুকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো, কিন্তু রিজভীর বাবা কে পিঠ চাপড়ে তাকে বাহবা দিয়েছিলেন।
সেই জব্রু আজ রিজভীর দক্ষিণ হস্তে।
জব্রুর দ্বারা সে যে-কোনো অসম্ভব কাজ সমাধা করে! শুধু মাত্র একটি ইংগিতে।
জব্রু বেরিয়ে গেলো।
রিজভী লুসীর হাতের বন্ধন মুক্ত করে দিলো, বললো–আমাদের বিয়ের পর ওর বন্ধন উন্মোচন করা হবে।
চলো এ কক্ষ থেকে। লুসীর হাত ধরে রিজভী বেরিয়ে গেলো।
লুসী করুণ অশ্রুভরা নয়নে বার বার তাকালো বনহুরের দিকে।
বনহুর নিশ্চুপ পড়ে রইলো, দেহের আঘাতের চেয়ে তার মনে বেশি দুঃখ লুসীর জন্য! একটা লম্পট প্রৌঢ়কে বিয়ে করে লুসীর জীবন বিনষ্ট হবে! পিপাসায় কণ্ঠতালু শুকিয়ে গেছে। এ মুহূর্তে এক ফোঁটা পানি পেলে সে আবার নবজীবন লাভ করতো।
মশালধারী বাদলা আর ভুজঙ্গ বেরিয়ে গেলো মশাল হস্তে। কড় কড় শব্দে বন্ধ হলো আবার লৌহকপাট। জমাট অন্ধকারে ভরে উঠলো কক্ষটা।
*
ঘুমন্ত নূর হঠাৎ জেগে উঠলো একটা দুঃস্বপ্ন দেখে। বিছানায় বসে ডাকলো–মা, মা, বাপি এসেছে, ঐ দেখো বাপির সমস্ত শরীরে রক্ত…
ধড়মড় করে উঠে বসে উদ্ভ্রান্তের মত তাকায় মনিরা কক্ষের চারদিকে কোথায় বাবা তোমার। বাপি? কোথায় সে?
মাগো, ঐ তো বাপিকে তুমি দেখতে পাছো না?
মনিরা মনে করে–সত্যি বুঝি সে ফিরে এসেছে। তাড়াতাড়ি শয্যা ত্যাগ করে মেঝেতে নেমে দাঁড়ায়। সুইচ টিপে আলো জ্বালে–কই, কোথায় নূর, তোর বাপি কোথায়? মনিরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে–আর কি সে ফিরে আসবে নূর! আর কি আমি তাকে পাবো বাপ?
মা, আমি কি তবে স্বপ্ন দেখলাম? ছোট নূর খাট থেকে নেমে মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়।
মনিরা পুত্রকে বুকে চেপে ধরে–বাবা, কি স্বপ্ন দেখলি তুই?
মা, সেকি তোমায় বলবো। আমি বাপিকে ঠিক দেখেছি। বাপি ঐ জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকলো। তার সমস্ত দেহে রক্তের ধারা বইছে। মা, সত্যি বাপির কিছু হয়েছে।
দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকেন মরিয়ম বেগম–মা মনিরা, কি হয়েছে মা? দরজা খোল…দরজা। খোল…
মনিরা দরজা খুলে দেয়।
মরিয়ম বেগম কক্ষে প্রবেশ করেন– আমার মনির এসেছে? ওরে আমার মনির এসেছে? কোথায়? কোথায় আমার মনির?
মনিরা আঁচলে চোখের পানি মুছে, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে মামীমা, নূর স্বপ্ন দেখেছে, তার বাপি নাকি এসেছে।
তাহলে আমার মনির আসেনি? ফিরে আসেনি সে? ওরে নূর, কি দেখলি, কেমন দেখলি তোর বাপিকে? মরিয়ম বেগম নূরকে কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলেন।
নূর স্বপ্নে যা দেখেছিলো বলে।
নূরের কথায় মরিয়ম বেগম কেঁদে আকুল হন, পুত্রের সন্ধান তিনি অনেকদিন হলো পান না, না জানি সে জীবিত আছে না মরে গেছে। হয়তো বা কোথায় কিভাবে আছে কে জানে! মায়ের প্রাণ আকুল হয়ে কেঁদে উঠে।
সমস্ত রাত আর ঘুম হয় না কারো।
শুধু আজ নয়, এমনি কত দিন, কত রাত এই চৌধুরী বাড়িতে শোকের হাওয়া বয়ে গেছে। বৃদ্ধ সরকার সাহেব এখন আরও বৃদ্ধ হয়েছেন। তারও কি কম চিন্তা–চৌধুরী বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তার জীবন।
মরিয়ম বেগম পুত্রশোকে কাতর।
মনিরার অবস্থাও তাই। মেয়েদের স্বামীই তো সব–হোক সে চোর-ডাকু বা খুনী-আসামী তবু স্বামী। মনিরা স্বামীর অভাবে জীবন্বত হয়ে পড়েছে। কোনো সময় তার মুখে হাসি নেই। যেন ধীরস্থির একটি প্রতিমূর্তি। যা না করলে নয়, তাই সে করে। নূরের জন্য একটু নড়তে হয়, নইলে তো একেবারে স্থবিরের মত হয়ে পড়তো।
