অল্পক্ষণ পর কক্ষমধ্যে প্রবেশ করলো মাহমুদ রিজভী আর দ্বিতীয় মশালধারী।
বনহুরকে সজ্ঞান অবস্থায় দেখে তার পাশে এসে দাঁড়ালো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো–আমাকে মৃত্যুকূপে বন্দী করে বাঁচবে ভেবে পালিয়েছিলে, এবার দেখো কে মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করছে।
বনহুরকে একটি লোহার খাটিয়ার সঙ্গে মজবুত করে বেঁধে রাখা হয়েছিলো। খাটিয়াটা পাথরের মেঝের সঙ্গে কঠিনভাবে আটকানো। বনহুর ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো, রিজভীর মুখে তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো–দস্যু বনহুর মৃত্যুভয়ে কাতর নয় রিজভী।
দেখা যাবে কাতর হও কিনা। ভেবেছো দস্যু বনহুর নাম শুনলে চমকে উঠবো?
বনহুর বললো–তোমার মুখেই আমি জানতে পেয়েছি, আমি নাকি দস্যু বনহুর।
আমার মুখে?
হাঁ, তুমি যখন আমার পরিচয় এদের কাছে দিচ্ছিলে তখন..
ও, তুমি তাহলে অজ্ঞান হওনি?
দস্যু বনহুর এতো সহজে অজ্ঞান হয় না।
আচ্ছা এবার দেখা যাবে। প্রথম মশালধারীর দিকে তাকিয়ে বললো–ভূজঙ্গ, জব্রুকে ডাকো।
আচ্ছা সাহেব। বেরিয়ে গেলো ভূজঙ্গ।
বনহুর কঠিন একটা শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। জানে সে কতবড় ভয়ঙ্কর লোক ঐ নিগ্রো জব্রু।
একটু পরে ফিরে এলো ভূজঙ্গ, তার পিছনে গরিলার মত ঘৎ ঘৎ করে এগিয়ে আসছে জমকালো জু।
রিজভী ইংগিত করলো জব্রুকে।
জব্রু রিজভীর ইশারায় ওপাশ থেকে একটা চাবুক তুলে নিলো হাতে। জানোয়ারের মত একটা শব্দ করে হেসে উঠলো–যেমন করে হেসেছিলো জুব্ৰু ঐ রাতে।
বনহুর তাকালো জব্রুর ভয়ঙ্কর চেহারার দিকে, তার হাত-পা-দেহ বন্ধন অবস্থায় থাকলেও চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে। দাঁত দিয়ে অধর দংশন করলো সে।
রিজভী এবার হাত দিয়ে ইশারা করলো জুকে।
অমনি জব্রু হিংস্র হয়ে উঠলো ভীষণভাবে, আঘাতের পর আঘাত করতে লাগলো সে বনহুরের দেহে। যখন জব্রু বনহুরের দেহে আঘাত করছিলো তখন জব্রুর মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ বের হচ্ছিলো। হুম হুম্ হুয়াম…হুম হুম্ হুয়াম
বনহুর যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত করে ফেলছিলো। দাঁত দিয়ে অধর চেপে ধরছিলো ভীষণভাবে। তবু একটু শব্দ করছিলো না।
রিজভী বললো–বাদলা, লুসীকে নিয়ে আয়, দেখুক ওর শাস্তি মনে শান্তি পাবে।
বাদলা চলে গেলো। একটু পর ফিরে এলো লুসীকে নিয়ে।
লুসীর হাত দু’খানা পিছমোড়া করে বাঁধা। এসে দাঁড়ালো বাদলার পিছনে। বনহুরের উপর নজর পড়তেই তীব্র আর্তনাদ করে উঠলো–মিঃ আলম, উঃ আপনার এই অবস্থা! মাগো…
হাঃ হাঃ হাঃ, মুখ ভেংচে বললো রিজভী–আলম! কে তোমার মিঃ আলম? জানো ওকে?
লুসী অশ্রুভরা চোখ তুলে তাকালো রিজভীর মুখের দিকে। কোনো জবাব দিলো না।
জব্রু আবার আঘাত করলো বনহুরের শরীরে।
লুসী বসে পড়লো তার পাশে না না ওকে মেরো না। ওকে মেরো না, ওর কোনো দোষ নেই।
আবার হেসে উঠলো রিজভী–জানো ও কে? ওর পরিচয় জানলে শিউরে উঠবে সুন্দরী!
লুসীর মনে ভেসে উঠে সেদিনের কথা, বলেছিলেন মিঃ আলম–লুসী, আমার পরিচয় তুমি জানো না, আমি মিঃ আলম নই। লুসী প্রশ্নভরা দৃষ্টি মেলে সেদিন তাকিয়েছিলো, কিন্তু মিঃ আলম বলেছিলেন, আজ নয় আর একদিন বললো। আজ রিজভীর কথায় লুসী অবাক হয়ে তাকালো।
বললো রিজভী লুসী, তুমি ওকে বিশ্বাস করেছিলে কিন্তু ও তোমাকে আত্মসাৎ করবার চেষ্টায় ছিলো। বিখ্যাত দস্যু বনহুর ওর নাম।
লুসী পত্রিকায় অনেকদিন আগে পড়েছিলো এই দস্যুনাম। পড়েছিলো এ দস্যু সম্বন্ধে অনেক কথা–আজ সেই দস্যু বনহুর তার সম্মুখের মিঃ আলম! লুসী অবাক হয়ে তাকালো বনহুরের ঘর্মাক্ত মুখখানার দিকে।
বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই লুসীর অন্তর মায়ায় আদ্র হয়ে উঠলো। করুণ চোখে তাকালো, দস্যুনাম শোনায় তার মনে কোনোরকম ঘৃণা বা বিতৃষ্ণা এলো না। বরং ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
রিজভী জুকে পুনরায় ইংগিৎ করলো।
সঙ্গে সঙ্গে জব্ৰু চাবুকের পর চাবুক দিয়ে আঘাত করে চললো বনহুরের দেহে।
লুসী ছুটে এসে নিজের দেহ এগিয়ে দিলো আমাকে মারো তবু ওকে মুক্ত করে দাও…
লুসী বনহুরের দেহের উপর নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করতেই, রিজভী হাত দিয়ে থামিয়ে দিলো জকে।
জব্রু হিংস্র জন্তুর মত ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো।
রিজভী এক ঝটকায় লুসীকে টেনে তুলে নিলো, কঠিন কণ্ঠে বললো–লুসী, তোমার ক্ষমতা নেই দস্যুকে তুমি বাঁচাও। ওকে আমি হত্যা করবো। ধীরেনচরণকে ও হত্যা করেছে, তার প্রতিশোধ নেবো।
বনহুরের দিকে তাকিয়ে লুসী আকুল হয়ে কেঁদে উঠলো। তার দেহের জামা ছিঁড়ে গেছে, চামড়া কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ঠোঁটের এক পাশেও কেটে গেছে অনেকটা। লুসী বলে উঠলো–মিঃ রিজভী, আপনি যা চান তাই দেবো, ওকে মুক্ত করে দিন।
বললো রিজভী–মুক্তি ও পাবে না কোনোদিন–তবে ওকে আমি মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারি যদি তুমি আমার কণ্ঠে মালা দাও–আমাকে স্বামী বলে গ্রহণ করো।
লুসী দৃষ্টি নত করে নিলো, তারপর ফিরে তাকালো বনহুরের দিকে।
বনহুরের ব্যথা-করুণ চেহারা লুসীর অন্তরে দারুণ আঘাত করলো! মিঃ আলম কতবার তাকে বাঁচিয়েছেন, কতবার তাকে শয়তানের কবল থেকে রক্ষা করেছেন–আর ওকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এটুকু পারবে না! নিজেকে না হয় উৎসর্গ করে দেবো মিঃ আলমের জন্য। বললো লুসী-আমি রাজি আছি।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–লুসী!—
