অনেক চেষ্টা করেও বনহুর এক চুল নড়তে পারলো না। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। লুসীর জন্য মনটা কেমন উতালা হলো। হয়তো তাকেও এই আশেপাশে তারই মত অবস্থায় রাখা হয়েছে। বনহুর ডাকলোলুসী…লুসী…লুসী…
কোনো সাড়াই এলো না তার আশেপাশে থেকে।
প্রতিধ্বনি হলো শুধু তার কণ্ঠের লুসী…লুসী….লুসী…
বনহুর অনেক চেষ্টা করতে লাগলো নিজেকে মুক্ত করে নেবার জন্য। কিন্তু কিছুতেই সম্ভব হলো না। ক্রমেই হতাশ হয়ে আসছে তার মন, এই বুঝি তার দস্যু জীবনের পরিসমাপ্তি। বনহুর দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে রশিগুলো ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করলো। অত্যন্ত মজবুত রশি–তাই ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব হলো না বনহুরের পক্ষে। না হলে তাকে রশি দিয়ে এভাবে বেঁধে রাখে কার সাধ্য! লৌহ-শিকলও তাকে কোনোদিন বন্দী করে রাখতে পারেনি। আজ বনহুর কাবু হলো রাত্রির সেই ভয়ঙ্কর লোকটার কাছে।
নানাভাবে চেষ্টা করেও বনহুর তার দেহের বন্ধন এতোটুকু শিথিল করতে পারলো না।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা কড় কড় শব্দ শোনা গেলো।
বনহুর বুঝতে পারলো, কোনো লৌহকপাট খুলে যাওয়ার শব্দ এটা। পরক্ষণেই কক্ষমধ্যে আলোকরশ্মি দেখা গেলো। বনহুর পূর্বের ন্যায় জ্ঞানশূন্যের মত নিশ্চুপ পড়ে রইলো, কিন্তু সে সামান্য দৃষ্টি মেলে চেয়ে দেখতে লাগলো।
কক্ষমধ্যে কয়েকটা লোক প্রবেশ করলো। সম্মুখস্থ দুটি লোকের হস্তে জ্বলন্ত মশাল দপদপ করে জ্বলছে। বনহুর চমকে উঠলো, বিস্ময়ে আরষ্ট হলো সে দেখলো মশালধারী লোক দুটির মাঝখানে মিঃ মাহমুদ রিজভী। তার পাশে সেই ভয়ঙ্কর জমকালো মানুষটি। মশালের আলোতে বনহুর তীক্ষ্ণ নজরে দেখলো মাহমুদ রিজভীর পাশের কালো লোকটা এ দেশীয় মানুষ নয়। নিগ্রো বলেই মনে হলো তাকে। বিরাট দেহ, মাথাটা দেহের আকারে ছোট। মাথায় কদম-ছাটা চুল। চোখ দুটো যেন আগুনের গোলা। লোকটাকে দেখলেই বোঝা যায় তার দেহে অসুরের শক্তি রয়েছে। সাধারণ মানুষের চেয়ে সে অনেক বেশি মোটা। মাংসপেশীগুলো যেন ফুটবলের মত ফুলে ফুলে উঠেছে। ঠোঁট দু’খানা মোটা, সাদা মত আর উল্টানো। দেহে কোনোরকম কাপড় নেই, শুধু একটা নেংটী ধরনের কিছু আটকানো রয়েছে লজ্জাস্থানে। বনহুর আরও অবাক হলো–কালো লোকটার বুকে মজবুত লোহার পাত দিয়ে তৈরি একটি বর্ম। এবার সে বুঝতে পারলো। পর পর গুলী ছুঁড়েও কেন তাকে কাবু করতে পারেনি সে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বনহুরকে বিচলিত করলো মিঃ রিজভীর আবির্ভাব। তাকে তার মৃত্যু কূপে বন্দী করে রেখে এসেছিলো, সে জানতো ওখান থেকে বের হবার আর কোনো উপায় নেই তার। এখন দেখছে মিঃ রিজভীর তাকে কৌশলে বন্দী করতে সক্ষম হয়েছে। এতো দুঃখেও বনহুরের মনে হাসি পেলো। ঐ শয়তান রিজভীকেই একদিন সে অত্যন্ত ভদ্র এবং মহৎ জন বলে মনে করেছিলো।
বনহুর ঠিক সব দেখছিলো, কিন্তু পূর্বের মত নিশ্চুপ নিস্পন্দ-পড়ে ছিলো সে।
মিঃ রিজভী এগিয়ে এলো, ভালভাবে বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো–এখনও জ্ঞান ফিরে আসেনি। বেশ, ওকে জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত এভাবে থাকতে দাও। তারপর জ্ঞান ফিরে এলে হবে ওর শাস্তি।
মশালধারী লোক দু’টির একজন বললো-হা সাহেব, সব মনে আছে। আপনি শুধু আদেশ করবেন, কাজ করবো আমরা। ব্রুই ওকে ঠিক করে।
কালো লোকটা গোঁ গোঁ শব্দ করে উঠলো।
বনহুর তখন চোখ বন্ধ করে পড়েছিলো, তবু অনুমানে বুঝতে পারলো, জব্রু নামটা ঐ জমকালো নিগ্রো লোকটার এবং সে বোবা বা ঐ ধরনের কিছু হবে। বনহুর একটুও নড়ছে না, ঠিক যেমন পড়ে ছিলো তেমনি রয়েছে।
মিঃ মাহমুদ রিজভী কঠিন কণ্ঠে বললো–সাবধানে এর বন্ধন উন্মোচন করে লৌহশিকল পরাবে। এর আসল পরিচয় আমি পেয়েছি, জানো এ কে?
মশালধারী প্রথম ব্যক্তি বললো–সাহেব, কে এই শয়তান?
বললো-মাহমুদ রিজভী–এর পরিচয় অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। বিশ্ববিখ্যাত দুর্দান্ত দস্যু বনহুরের নাম শুনেছো? সেই দস্যু বনহুর।
দস্যু বনহুর! এক সঙ্গে মশালধারী লোক দুটো যেন অস্ফুট শব্দ করে উঠলো।
রিজভী বললো হাঁ, একে পুলিশ ফোর্স কোনোদিন বন্দী করে রাখতে পারেনি বা কেউ কোনোদিন ওকে কাবু করতে সক্ষম হয়নি। জর কৃতিত্বে আজ আমি তাকে বন্দী করতে সক্ষম হয়েছি। শোন, তোমরা অত্যন্ত হুশিয়ারীর সঙ্গে কাজ করবে।
আপনার আদেশ শিরোধার্য সাহেব। বললো মশালধারী একজন।
বনহুর নিস্পন্দ পড়ে ছিলো বটে কিন্তু ওদের কথাবার্তা সব শুনছিলো সে। বুঝতে পারলো, তার পরিচয় আর অজানা নেই। মাহমুদ রিজভী তাকে চিনে নিয়েছে।
রিজভী জমকালো জব্রুকে কিছু ইংগিত করলো।
জব্রু গোঁ গোঁ করে কি যেন জবাব দিলো তারপর বেরিয়ে গেলো সে। রিজভীওে তাকে অনুসরণ করলো।
মশালধারী দুইজন বনহুরের পাহারায় নিযুক্ত রইলো।
বনহুর নড়ে উঠলো এবার, বললো–উঃ পানি…পানি দাও।
মশালধারী লোক দুটোর চোখ জ্বলে উঠলো চক্ চক্ করে।
প্রথম ব্যক্তি বললো–বালা, যা সাহেবকে খবর দে, বল্ ওর হুঁশ ফিরে এসেছে।
দ্বিতীয় জন মশালটা দেয়ালের খুপড়ীতে গুঁজে রেখে চলে গেলো।
বনহুর আবার বললো–ভাই, একটু পানি দাও না।
সাহেব এলেই তোমাকে পানি দেওয়া হবে, বুঝলে?
লোকটার কথা বলার ভঙ্গী দেখে রাগে গ গস করে উঠলো বনহুরের দেহ। মনে হলো এই মুহূর্তে ওকে এক ঘুষিতে শেষ করে দেয়। কিন্তু এখন সে নির্জীব হয়ে পড়েছে, কৌশলে তাকে বন্দী করা হয়েছে। বনহুর বুঝতে পারলো, পানি তো দূরের কথা, শয়তান রিজভী এসে তাকে ঘোল খাওয়াবে, মানে তার উপর চালাবে অত্যাচার। বনহুর সেজন্য প্রস্তুত হয়ে নিলো। বন্দী যখন সে হয়েছে, তখন আর ভেবে কোনো ফল হবে নন।
