আশ্চর্য মানুষ আপনি!
লুসী, পৃথীরাজের প্রাসাদ এটা। এ পৃথীরাজ সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শক্তিবান মহারাজা ছিলেন। কাল সমস্ত প্রাসাদটা আমরা ঘুরে ফিরে দেখবো। কিন্তু আজ রাত…
ঐ যে সম্মুখে একটা ঘর–চলুন ওখানে রাতটুকু কাটিয়ে দিই।
তাই চলো লুসী, ওখানে কোন মানুষ-জন নেই বলে মনে হচ্ছে।
বনহুর আর লুসী সে ঘরটার দরজায় এসে দাঁড়ালো। দেখলো বেশ ঝকঝকে তকতকে পরিস্কার সুন্দর মেঝে। মনে হলো এককালে মন্দির ছিলো ওটা। এক পাশে শিবলিঙ্গ, আরও কয়েকটা কালো পাথর রয়েছে।
বনহুর আর লুসী কক্ষে প্রবেশ করলো।
কক্ষমধ্যে অন্ধকার তেমন জমাট নয়, বাইরের লাইটের আলো কক্ষমধ্যে কিঞ্চিৎ আলোকিত করে তুলেছে।
বনহুর ব্যাগটা এক পাশে ধাপ্ করে ফেলে দিয়ে নিজেও বসে পড়লো এতোক্ষণ একটানা গাড়ি চালিয়ে ক্লান্তি বোধ করছিলো সে।
লুসী দাঁড়িয়ে ছিলো পুতুলের মত স্থির হয়ে।
বনহুর বললো– লুসী, বিছানার আশা ত্যাগ করে আজ ভূতলে শয্যা গ্রহণ করো।
লুসী বললো–না, সেজন্য নয়।
তবে দাঁড়িয়ে রইলে কেনো?
কিছু না।
বনহুর টাকার ব্যাগটা মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পড়লো।
লুসী বসলো।
বনহুর বললো–শুয়ে পড় লুসী।
কখন যে বনহুর ঘুমিয়ে পড়েছে, হঠাৎ একটা কোমল হাতের স্পর্শ অনুভব করলো সে মাথায়। ধীরে ধীরে কেউ যেন তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বনহুরের ঘুম ভেঙে গেলেও সে চোখ মেলে চাইলো না, ঘুমের ভান করে পড়ে রইলো। কোমল হস্তের অংগুলো সঞ্চালন আজ বনহুরের সমস্ত মনে একটা মধুর আবেশ এনে দিলো। ভাববিহ্বল কণ্ঠে বললো বনহুর-লুসী!
চমকে উঠলো লুসী, কিন্তু পালালো না বা সরে গেলো না। বনহুরের ডাকে জবাব দিলো–বলুন?
ঘুমাওনি কেন?
লুসী কোনো জবাব দিলো না।
বনহুর পাশ ফিরে শুলো।
লুসীর হস্ত সঞ্চালন তখনও বন্ধ হয়নি।
বললো বনহুর–লুসী, আজ রাত শেষ হলে কাল আমি তোমাকে নিয়ে কলকাতার পথে রওয়ানা দেবো। পৌঁছে দেবো তোমাকে তোমার পিতার কাছে।
তারপর আপনি?
একটু হাসলো বনহুর–আমি! আমার কেউ নেই, কিছু নেই। আমি যে বন্ধনহীন, লুসী।
মিঃ আলম!
আমার আসল পরিচয় তুমি জানো না লুসী, কে আমি।
জানি আপনি মুসলমান।
শুধু তাই আমার পরিচয় নয়। আরও একটা পরিচয় আমার আছে। যা জানলে শিউরে উঠবে তুমি। যা সে কথা লুসী যতক্ষণ আমি তোমাকে তোমার পিতা-মাতার কাছে পৌঁছে দিতে না সক্ষম হয়েছি ততক্ষণ আমি নিশ্চিত নই।
কিন্তু আমি আর ফিরে যাবো না মিঃ আলম, আমার বাবা-মা কে আমি জানি না, চিনি না তাদের কাউকে। আমাকে আপনি কলকাতায় নিয়ে যাবেন না।
তাহলে কোথায় যাবে?
আমি চিরদিন আপনার পাশে থাকতে চাই।
বনহুরের ললাটে ঝরে পড়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু, চমকে উঠে বসে বনহুর– লুসী তুমি কাঁদছো?
আপনি আমাকে দূরে ঠেলে দেবেন না।
লুসী!
আপনার পায়ে পড়ি…লুসী বনহুরের পা দুটি জড়িয়ে ধরে।
বনহুর অস্বস্তি বোধ করে, লুসীকে তুলে নেয় সে, নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে।
ঠিক সে মুহর্তে জমকালো একটি ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ায় কক্ষটার দরজায়। অন্ধকারে চোখ দুটো যেন হিংস্র। ব্যাঘ্রের মত জ্বলছে।
বনহুর লুসীকে সরিয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে উঠে দাঁড়ায়।
অন্ধকারে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে লুসী ভয়ার্ত-শব্দ করে উঠে–উঃ! মা গো।
ভয়ঙ্কর মূর্তিটা দু’হাত প্রসারিত করে এগিয়ে আসে বনহুরের দিকে।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে পকেট থেকে রিভলভারখানা বের করে উদ্যত করে ধরে।
ভয়ঙ্কর মূর্তিটা এগিয়ে আসছে। চোখ দু’টো তার আগুনের গোলার মত জ্বলছে যেন।
লুসী মুখ লুকায় বনহুরের বুকে।
২.১১ রাত্রির ভয়ঙ্কর
দ্রুত হস্তে লুসীকে সরিয়ে দিয়ে বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ালো। দক্ষিণ হস্তে উদ্যত রিভলভার। ভয়ঙ্কর লোকটা অট্টহাসি হেসে উঠলো, কেমন যেন উৎকট সে হাসির শব্দ।
অন্ধকার রাত্রির নিস্তব্ধতা যেন খান খান হয়ে ভেঙে পড়লো সে হাসির শব্দে।
বনহুর আজ পর্যন্ত কত লোকের সঙ্গে লড়াই করেছে–কত দুর্দান্ত দুর্বত্তের সঙ্গে, কত ভয়ঙ্কর দস্যুর সঙ্গে, কত সাংঘাতিক লম্পটের সঙ্গে কিন্তু এমন হাসি সে কোনোদিন শোনেনি। বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে গুলী ছুঁড়লো!
সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলো বনহুর–জমকালো লোকটা তেমনি দু’হাত প্রসারিত করে এগিয়ে আসছে। রিভলভারের গুলীতে এতোটুকু টললো না লোকটা।
বনহুর পর পর কয়েকটা গুলী ছুঁড়লো, কিন্তু আশ্চর্য লোকটার কিছু হলো না, বরং সে যমদূতের মত এগিয়ে আসছে!
বনহুর পুনরায় গুলী ছুঁড়লো কিন্তু রিভলভারের গুলী না থাকায় কোনো শব্দ হলো না বা গুলী বেরুলো না। দুর্দান্ত দস্যু বনহুর ভীত হয়ে পড়লো–জীবনে এমন অবস্থায় সে কোনোদিন পড়েনি। লুসী তীব্র আর্তনাদ করে উঠলো–বাঁচাও, বাঁচাও, কে আছো বাঁচাও…।
কিন্তু কোনোদিক থেকে কোনো সাড়া আসে না। ভয়ঙ্কর লোকটা ধরে ফেলে বনহুরকে, তার লোহার সাঁড়াশীর মত হাত দু’খানা দিয়ে টিপে ধরে বনহুরের গলা।
বনহুর বলিষ্ঠ বাহু দু’টি দিয়ে নিজের গলা মুক্ত করে নিতে যায় কিন্তু সক্ষম হয় না। গলার চাপ অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই বনহুর সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে।
যখন জ্ঞান হলো বনহুর তাকিয়ে দেখলো তার চারদিকে জমাট অন্ধকার, কিছু দেখতে পাচ্ছে না সে। এখন সে কোথায় ভেবে পায় না। একি! হে হাত-পা কিছু নড়াতে পারছে না। বনহুর বুঝতে পারলো, তাকে মজবুত রশি দিয়ে এঁটে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার সমস্ত দেহটা জড়িয়ে বাঁধা হয়েছে শক্ত রশি দিয়ে। তাহলে কি সেই জমকালো লোকটা তাকে এভাবে বেঁধে রেখেছে? সে তা হলে এখনও তাকে ত্যাগ করেনি? মনে পড়লো দুটি সাঁড়াশীর মত কঠিন হাতের কথা। কিন্তু লুসী কোথায়, তাকেও কি অন্ধকারে বেঁধে রাখা হয়েছে? সব যেন কেমন ঘোলাটে মনে হচ্ছে বনহুরের। মাথার মধ্যে ঝিম ঝিম করছে এখনও! গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে যেন। একটু পানির জন্য জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁটখানা চাটতে লাগলো বার বার।
