চমকে ফিরে তাকালো ধীরেন–এ কি এ যে মিঃ আলম! মিঃ রিজভীর দাড়ি গোঁফ অদৃশ্য হয়েছে, সুন্দর পুরুষ দীপ্ত বলিষ্ঠ একটা মুখ বেরিয়ে এসেছে তখন।
ধীরেনের চোখে যেন সর্ষে ফুল ঝরে পড়ছে। চোখ রগড়ে তাকায় সে।
বনহুর রিভলভার উদ্যত করে এগিয়ে আসে–মুক্ত করে দাও লুসীকে।
ধীরেনের বাহুবন্ধনে তখন আবদ্ধা লুসী।
লুসীর চোখেমুখে বিস্ময়, তেমনি একটা আনন্দদ্যুতি বয়ে যায় তার সমস্ত মুখে!
লুসীকে মুক্ত করে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় ধীরেন। এততক্ষণে যেন হুস হলো তার। একি কথা! মিঃ। আলম তাহলে মিঃ রিজভীর বেশে তাকে ধোকা লাগিয়েছে! তার সমস্ত অর্থ লুটে নিয়েছে মিঃ আলম আর লুসীকেও উদ্ধার করে নিতে এসেছে। ধীরেন দ্রুত টেবিলের পাশে ছুটে গিয়ে রিসিভার তুলে নিলো হাতে।
অমনি বনহুরের রিভলভারের একটি গুলী তার দক্ষিণ হস্তে বিদ্ধ হলো।
সঙ্গে সঙ্গে রিসিভার খসে পড়লো ধীরেনের হাত থেকে। মুখটা বিকৃত করে বাম হস্তে দক্ষিণ বাহু চেপে ধরলো। রক্তে ভেসে গেলো সমস্ত হাতখানা।
বনহুর দাঁত পিষে বললো–ধীরেন, জানো না আমি কে। আমার চোখে ধুলো দিয়ে তুমি লোকের সর্বনাশ করবে! মিঃ মাহমুদ রিজভী তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে, তারই হাতে তৈরি মৃত্যুকূপে তিল তিল করে শুকিয়ে মরছে সে। পৃথিবীর কেউ আর তার সন্ধান পাবে না। এবার তোমাকে যমালয়ে পাঠাবো, আর যেন কারো সর্বনাশ তুমি না করতে পারো।
বনহুরের গম্ভীর কণ্ঠস্বর আর অগ্নিমূর্তি রূপ দেখে ধীরেনের মুখমণ্ডল বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো, ভুলে গেলো সে তার হাতের ক্ষতের ব্যথা। পালাবার জন্য দ্রুত এগুলো দরজার দিকে।
বনহুর পিছন থেকে গর্জে উঠলো–খবরদার, এগুবে না।
থমকে দাঁড়ালো ধীরেন! তার ঝুলে পড়া হাত দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়ছে।
লুসী ভয়বিহ্বল চোখে আনন্দভরা অন্তরে উপলব্ধি করছে এ দৃশ্য!
হঠাৎ ধীরেন ওদিকে ড্রয়ার খুলে বের করলো একটা ক্ষুদে পিস্তল। বাম হস্তেই সে ওটা উঁচু করে ধরলো।
কিন্তু বনহুর ওকে গুলী করার সুযোগ দিলো না, তার রিভলভার গর্জে উঠলো আবার।
সঙ্গে সঙ্গে ধীরেন মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো ভূতলে। ওর হাতের ক্ষুদে পিস্তলটা ছিটকে পড়লো দূরে। ধীরেনের বুকের রক্তে রাঙা হয়ে উঠলো মেঝেটা।
লুসী আর্তকণ্ঠে বললো–একি করলেন মিঃ আলম?
বনহুর পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো–শয়তানের উপযুক্ত শাস্তি দিলাম। চল লুসী।
বনহুর লুসীর হাত ধরে সিঁড়ি বেড়ে দ্রুত নেমে এলো নিচে।
লাবলীং ক্লাবের সম্মুখে তাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলো। বনহুর লুসীকে তার পাশে বসিয়ে নিয়ে গাড়িতে ষ্টার্ট
লুসীর চোখে শুধু বিস্ময় নয়, তার অন্তরে এক বিরাট প্রশ্ন–মানুষ না দেবতা ইনি। লুসী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অন্ধকারে বনহুরের মুখের দিকে। কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠেছে তার মন।
বনহুর স্পীডে গাড়ি ছাড়লো। সে বুঝতে পারলো, তার রিভলভারের গুলীর শব্দে লাবলীং ক্লাবের তন্দ্রা ছুটে গেছে। আরও লক্ষ্য করলো, একটা গাড়ি তাদের গাড়িখানাকে ফলো করে তীর বেগে ছুটে আসছে।
লুসী বললো– মিঃ আলম, পিছনে একটা গাড়ি আসছে।
সম্মুখে দৃষ্টি রেখে বললো বনহুর–আমি ঐ গাড়িখানাকে দেখতে পেয়েছি লুসী। এ গাড়ি আমাদের গাড়িকে ফলো করছে। কারণ, লাবলীং ক্লাবে ধীরেনের হত্যা রহস্য প্রকাশ হয়েছে।
এখন উপায়।
উপায় করতেই হবে একটা।
আমার ভয় করছে মিঃ আলম।
ভয় পাবার কিছু নেই।
ওরা যদি ধরে ফেলে, তাহলে কি হবে?
ফাঁসী হবে!
উঃ।
তোমার নয় লুসী, আমার।
কিন্তু আমি যে আপনার কথাই ভাবছি।
আমার জন্য ভেবো না। আমার চেয়ে তোমার নিজের কথা ভাবো লুসী।
গাড়িখানা অনেক এগিয়ে এসেছে।
বনহুর ডবল স্পীডে গাড়ি চালাচ্ছে। সামনের আয়নায় দেখা যাচ্ছে। গাড়ির সার্চলাইটের আলো। অত্যন্ত দ্রুত গাড়িখানা ছুটে আসছে।
বনহুর এলোপাতাড়ি গাড়ি চালাচ্ছিলো, সোজা পথে না গিয়ে এ পথ সে-পথ ধরে এগুচ্ছিলো সে।
পিছনের গাড়িখানা যদিও দ্রুত আসছিলো তবু সম্মুখের গাড়ির সঙ্গে পেরে উঠছিলো না। বনহুর মৃত্যুকে ভয় করে না। তার গাড়ি ছুটছিলো উল্কা বেগে।
যে পথ দিয়ে এখন গাড়ি যাচ্ছিলো সো হলো হুমায়ুন রোড, এ পথে কয়েক মাইল অগ্রসর হলেই পৃথীরাজের রাজপ্রাসাদ। বিরাট একটি দীঘির পাড়ে এ প্রাসাদটি গড়ে উঠেছিলো। আজ অবশ্য সে দীঘির কোনো অস্তিত্ব নেই। নব নব প্রাসাদ সমতুল্য অট্টালিকা শোভা বর্ধন করছে।
বনহুরের গাড়ি এক সময় পৃথীরাজের প্রাসাদের সম্মুখপথে এসে হাজির হলো।
এখন পিছনের গাড়িখানা সম্পূর্ণ আড়ালে পড়ে গেছে।
বনহুর একটা বাগানের আড়ালে গাড়ি রেখে লুসী সহ নেমে পড়লো। দক্ষিণ হস্তে তার টাকার ব্যাগটা রয়েছে।
বাগানের ঝোপের আড়ালে আত্মগোপন করে পৃথীরাজের প্রাসাদের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো।
ঠিক সে মুহূর্তে সম্মুখ পথ দিয়ে দ্রুত চলে গেলো ঐ গাড়িখানা। যে গাড়িখানা দিল্লীর লাবলিং ক্লাব থেকে তাদের অনুসরণ করে আসছে।
বনহুর লুসীকে বললো–দেখলে তো চলে গেলো।
উঃ! বাচলাম এবার। লুসী যেন নিশ্বাস নিলো প্রাণ ভরে।
বনহুর বললো–লুসী, এবার কোথায় যাওয়া যায় বলোতো?
চিন্তিত কণ্ঠে বললো লুসী–তাই তো!
অন্ততঃ রাতের মত একটু আশ্রয় চাই কি বলো?
হা।
এখন কটা বাজে?
চারটা। দু’ঘন্টা ধরে দিল্লী শহরটায় ছুটোছুটি করেছি।
