লুসীকে দেখে ধীরেনের চোখ দুটো ক্ষুদ্ধ শার্দুলের মত দপ করে জ্বলে উঠলো।
দৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলো লুসী ধীরেনচরণকে, এ শয়তান তাকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো, কতবার সে হামলা চালিয়ে তাকে নাজেহাল পেরেশান করে ফেলেছে। ভাগিস মিঃ আলম তাকে পর পর বাঁচিয়ে নিয়েছেন ঐ লম্পট পাপিষ্ঠের হাত থেকে। মিঃ মাহমুদ রিজভীকেও সে ভালো মনে করেছিলো, কিন্তু আজ তাকে বিশ্বাস করতে পারলো না। কারণ মিঃ রিজভীর আসল রূপ উদঘাটন হয়েছে তার কাছে। মিঃ রিজভী তাকে চোরা কুঠরীতে বন্দী করে রেখে তার উপর চালিয়েছে নানা রকম অকথ্য অত্যাচার। লুসীকে তবু সে আয়ত্তে আনতে পারেনি। ধীরেনচরণের সঙ্গে মিঃ রিজভীকে দেখে শিউরে উঠলো লুসী। ভয়ে পিছিয়ে গেলো কয়েক পা।
মিঃ মাহমুদ রিজভীর বেশে দস্যু বনহুর আর ধীরেনচরণ ভৌম প্রবেশ করলো কক্ষমধ্যে।
লুসীর তখন হৃদকম্প শুরু হয়েছে। চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে ভয়-ভীতি আর উৎকণ্ঠা। মিঃ আলম তাকে বলেছিলো সংকেত-পূর্ণ শব্দ ছাড়া সে যেন দরজা না খোলে। কিন্তু এরা কি করে তার সে সংকেত জানতে পারলো! লুসী ভেবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলো না।
ধীরেনচরণ বললো–লুসী, আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছিলে কিন্তু এবার আর তোমার উদ্ধার নেই।
মিঃ রিজভী বললো–হাঁ, তোমার জিনিস তুমি এবার বুঝে নাও বন্ধু। কিন্তু তার পূর্বে আমার পাওনাটা মিটিয়ে দাও। শুধু লুসীকেই আমি তোমার হাতে তুলে দিলাম তাই নয়, তোমাদের পথের কাঁটা মিঃ আলমকেও তোমাদের চলার পথ থেকে সরিয়ে ফেলেছি…
লুসী কথাটা শুনে যেন আর্তনাদ করে উঠলো–উঃ মিঃ আলমকে তোমরা হত্যা করেছো?
হা সুন্দরী, মিঃ আলম যেন আর ধীরেনচরণের কাছ থেকে তোমাকে ছিনিয়ে নিতে না পারে সেজন্য তাকে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছি। বললো রিজভী।
দু’হাতে মুখ ঢেকে লুসী আকুলভাবে কেঁদে উঠলো।
ধীরেনচরণ হেসে উঠলো হাঃ হাঃ করে, তারপর হাসি থামিয়ে বললো–মিস লুসী, হাজার বার রোদন করেও কোনো ফল হবে না। এখন তুমি আমার…
গম্ভীর গলায় বললেন মিঃ রিজভী–তার পূর্বে আমার টাকা?
হাঁ, আপনার টাকা পরিশোধ করে দিচ্ছি। ধীরেনচরণ ব্যাগ খুলে টাকার বাণ্ডিলগুলো বের করে টেবিলে রাখলো।
মিঃ মাহমুদ রিজভী বাণ্ডেলগুলো গুণে নিলেন হাতে উঠিয়ে, একটির পর একটি করে। তারপর ব্যাগে ভরে তুলে নিলেন ব্যাগটা হাতে।
ধীরেনচরণ লুসীর হাত ধরলো এবার–চলো লুসী, এবার তুমি আমার।
মিঃ রিজভী বাম হস্তে টাকার ব্যাগ আর দক্ষিণ হস্ত লুসীর মাথায় রেখে বললো–আপত্তি করে কোনো ফল হবে না মিস লুসী, চলুন আপনাকে গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দিয়ে আসি।
লুসী উচ্ছলভাবে কেঁদে উঠলো,–আমাকে হত্যা করুন, তবু আমি যাবো না।
যাবে না?
না!
জানো হোটেল আমার? এখানে থাকলে তোমার নিস্তার নেই। তোমাকে নাচতে হবে, গাইতে হবে, আমার আদেশে আরও অনেক কিছু করতে হবে তোমাকে–পারবে? বললো মাহমুদ রিজভী।
অসহায় কাতর চোখে তাকালো লুসী মিঃ রিজভীর মুখের দিকে।
ধীরেনচরণ বললো–শুনলে? কোটা চাও–আমার ঘর করতে চাও, না সকলের মন তুষ্টি সাধনে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সুখী হতে চাও? বলো কোটা তুমি বেছে নেবে?
লুসী দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠে–তোমার ঘর করবার আগে আমি মরতে চাই।
কিন্তু তোমাকে মরতে দিলে তো মরবে! যাক, বেশি সময় আমি নষ্ট করতে চাই না। এসো লুসী। জোরপূর্বক লুসীকে টেনে নিয়ে চলে ধীরেন।
মিঃ মাহমুদ রিজভী অনুসরণ করেন ওদের। বলে তিনি–চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
লুসীকে গাড়ির পিছন আসনে তুলে নেওয়া হলো। লুসীর পাশে বসলো ধীরেনচরণ।
আর মিঃ মাহমুদ রিজভীবেশি বনহুর বসলো ড্রাইভ আসনে।
ধীরেন বললো–লাবলীং ক্লাবে চলুন মিঃ রিজভী।
হাঁ তাই যাবো।
গাড়ি চলতে শুরু করলো।
লুসী যেন চিৎকার করতে না পারে তার জন্য লুসীর মুখে রুমাল গুঁজে দেয়া হয়েছিলো ইতিপূর্বে। লুসী মৃতের ন্যায় পড়েছিলো পিছন আসনে।
দিল্লীর রাজপথ প্রায় জনশূন্য হয়ে এসেছে।
এ-পথ-সে-পথ করে গাড়ি ছুটছে।
মিঃ রিজভী অধর দংশন করছিলেন ড্রাইভিং আসনে বসে। চোখ দুটো তার আগুনের ভাটার মত জ্বলছিলো অন্ধকারে।
লাবলীং ক্লাবের সম্মুখে এসে গাড়ি থামলো।
রাত তখন দুটো বেজে গেছে।
লাবলীং ক্লাব নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। তবে দু’একটা মাতাল তখনও টেবিলে মাথা রেখে জড়িত কণ্ঠে আবোল তাবোল বকছিলো।
মিঃ রিজভীর সহায়তায় ধীরেনচরণ মিস লুসীকে উপরে নিয়ে এলো।
লুসীর মুখের রুমাল খুলে ফেলা হয়েছে।
করুণ চোখে তাকাচ্ছে লুসী চারদিকে। ব্যথাভরা অসহায় তার মুখোভাব। সাগরে পড়লে মানুষ যেমন কূল পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে তেমনি লুসীর অবস্থা।
মিঃ রিজভী চলে যাবার জন্য পা বাড়ালেন।
লুসী ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো মিঃ রিজভীর পা দু’খানা–আমাকে উদ্ধার করুন। আমাকে বাঁচান এ দুষ্টের হাত থেকে।
হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলো ধীরেনচরণ, ভয়ঙ্কর পাশবিক সে হাসি। লুসীর হাত ধরে টেনে তুলে নিলো জোরপূর্বক।
লুসী ভয়ার্তভাবে আর্তনাদ করে উঠলো–মিঃ রিজভী, আমাকে ফেলে যাবেন না। বাঁচান আপনি…
কিন্তু শয়তান ধীরেন লুসীকে আকর্ষণ করলো, জাপটে ধরলো ওকে।
লুসী নিজেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
ফিরে দাঁড়ালো মাহমুদ রিজভী, দক্ষিণ হস্তে তার রিভলভার গভীর কণ্ঠে বললো–মুক্ত করে দাও লুসীকে।
