রীণা সাঈদ বনহুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতে গিয়ে হাঁপিয়ে পড়েছে।
বললো রীণা সাঈদ–রিজভী, তুমি না অসুস্থ?
বনহুর বললো–অসুখ সেরে গেছে তোমার স্পর্শে।
রিজভী!
হাঁ রীণা।
নাচের ফাঁকে ফাঁকে কথা হচ্ছিলো ওদের মধ্যে।
বনহুর অল্পক্ষণের চেষ্টায় দিল্লীর অধিবাসীদের এ অদ্ভুত নাচে দক্ষ হয়ে উঠলো।
রীণা বললো–আর পারছি না।
হেসে বললো বনহুর–আমিও ছাড়ছি না তোমাকে।
উঁ আর নয় রিজভী!
এরি মধ্যে সখ মিটলো?
পারছি না আর।
বনহুর লক্ষ্য করলো, তার হাতের উপর ক্রমে এলিয়ে পড়ছে, রীণা সাঈদের দেহটা শিথিল হয়ে আসছে ক্রমেই।
ওদিকে বাদ্যযন্ত্রিগণ ঠিক তালে তালে বাজনা বাজিয়ে চলেছে।
ধীরে ধীরে নাচছে অন্যান্য ব্যক্তিগণ।
মাঝে মাঝে মদ পান করছে ওরা।
রীণা সাঈদের দেহটা ক্রমান্বয়ে এলিয়ে পড়লো বনহুরের বাহুর মধ্যে। বনহুর আর বিলম্ব না করে আস্তে সরে পড়লো রীণা সাঈদকে নিয়ে আড়ালে। পাশের কক্ষে এনে শুইয়ে দিলো রীণার শিথীল দেহটা। তারপর সন্তর্পণে বেরিয়ে এলো সেখান থেকে! আড়ালে আত্মগোপন করে দেখতে লাগলো সব। বুঝতে পারলো, এটা শয়তান মাহমুদ রিজভীর আড্ডাখানা। এখানে তার সমস্ত দলবল নিয়ে আমোদ-প্রমোদ করে থাকে সে।
মাহমুদ রিজভীর বেশ এখনও বনহুরের শরীরে রয়েছে। কাজেই তার কোনো অসুবিধা হলো না। লিফটের। নিকটে পৌঁছতেই তাকে সানন্দে নিচে নামিয়ে দিলো লিফটম্যান।
বনহুর এবার গাড়ি নিয়ে সোজা বেরিয়ে পড়লো দিল্লীর পথে। লাবলীং ক্লাবের সম্মুখে এসে গাড়ি রেখে নেমে পড়লো। ভিতরে প্রবেশ করতেই ক্লাবের ম্যানেজার তাকে গুরুদেবের মত অভিনন্দন জানালো।
বনহুর বললো–ধীরেনচরণ আছেন।
ম্যানেজার বিনীতভাবে জানালো আছেন।
ডেকে দিন তাকে!
ম্যানেজার বললো–আপনি বসুন, আমি তাকে ডেকে আনছি।
ম্যানেজার চলে গেলো।
মিঃ রিজভীবেশি বনহুর বুঝতে পারলো, লাবলীং ক্লাবের সবাই মাহমুদ রিজভীর অনুগত দাস।
একটু পরে এলো লাবলীং ক্লাবের ম্যানেজার এবং তার সঙ্গে শয়তান ধীরেনচরণ। অত্যন্ত নেশা করায় ঢুলু। ঢুলু করছে তার চোখ দুটো। মিঃ রিজভীকে দেখে তার চোখ চক্ চক্ করে উঠলো। জড়িত কণ্ঠে বললো আপনি এসেছেন মিঃ রিজভী। আমার মাল কই?
বললো রিজভী–মাল মজুত আছে। কথাবার্তা পাকা করতে এলাম।
কথা আবার কি মিঃ রিজভী। যা দেবো বলেছি তাই হবে। কিন্তু ঐ পথের কাঁটাটাকে সরিয়ে,…
হাঁ সে আপদ দূর করেই এসেছি মিঃ ভৌম।
তবে তো আর কথাই নেই। লুসীকে পাওয়া এখন আমার পরম সৌভাগ্য।
হাঁ, এবার আপনি পরম নিশ্চিন্ত।
তবে কখন লুসীকে পেতে পারি বন্ধু?
যখন আমার পাওনা পরিশোধ করবেন।
বেশ, আমি এক্ষুণি আপনার টাকা নিয়ে যাচ্ছি। লুসীকে ঠিক পাবো তো?
পাবেন মানে? নিশ্চয়ই পাবেন। আপনি জানেন, মিঃ রিজভী কোনোদিন মিথ্যা কথা বলে না।
আপনি অপেক্ষা করুন, আমি এক্ষুণি আসছি।
বেরিয়ে যায় মিঃ ধীরেনচরণ ভৌম।
মাহমুদ রিজভীবেশি দস্যু বনহুর আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজের ছদ্মবেশটা একবার ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেয়। না, তাকে চিনবার কোনো উপায় নেই।
ফিরে আসে ধীরেনচরণ, হাতে তার ব্যাগ। ঐ ব্যাগের মধ্যে যে টাকা রেখেছে–লুসীর মূল্য। বললো সে–চলুন মিঃ রিজভী।
গাড়িতে এসে বসলো ওরা।
মাহমুদ রিজভী নিজে ড্রাইভিং আসনে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। গাড়ি ছুটে চললো।
ধীরেনচরণ ভয়ানক নেশা করেছে সে এখনও জড়িতকণ্ঠে আবোল-তাবোল কথাবার্তা বলছিলো। এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকার ব্যাগ তার কোলের উপর রয়েছে। মিঃ রিজভীবেশি দস্যু বনহুর একবার পকেটে হাত রেখে রিভলভারের অস্তিত্ব অনুভব করে নিলো। হাতঘড়ির দিকে তাকালো বনহুর, রাত এখন বারোটা।
গুলশান হোটেলে পৌঁছে ধীরেনচরণসহ মিঃ রিজভী সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপরে। রাত বারোটা গুলশান হোটেল এখনও গমগম করছে। অসংখ্য নর-নারী হোটেল কক্ষ সরগরম করে তুলেছে। হোটেলের সম্মুখে নানা ধরণের গাড়ি অপেক্ষা করছে। কোনো কোনো গাড়ির ড্রাইভার গাড়ির হ্যাণ্ডেলে মাথা রেখে ঝিমুচ্ছে। এখনও মনিবের ফিরবার কোনো লক্ষণ নেই। রাত বারোটা–কিন্তু গুলশান ক্লাবে যেন এমাত্র সন্ধ্যা হলো।
মিঃ রিজভীসহ ধীরেনচরণ এসে পৌঁছলো মিস লুসীর দরজায়।
মিঃ রিজভী দরজায় মৃদু আঘাত করলেন।
লুসীর সবেমাত্র একটু নিদ্রা এসেছিলো, এতোক্ষণ সে প্রতীক্ষা করছে মিঃ আলমের। তিনি তো এতো রাতেও ফিরলেন না! কোথায় গেলেন তিনি, কেনই বা গেছেন–এমনি নানা চিন্তা করতে করতে সবেমাত্র একটু তন্দ্রা এসেছে। সেদিনের পর মিঃ আলম যেন তাকে এড়িয়ে চলে সব সময়। লুসীও সাহস পায় না তার। সঙ্গে কোনোরকম কথা বলার। হাজার হলেও সে তো বাঙালি নারী, লজ্জা-দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তাকে সঙ্কোচিত করে তুলে।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ায় তন্দ্রা ছুটে যায় লুসীর। চমকে বিছানায় উঠে বসলো, কান পেতে শুনলো– আবার দরজায় আঘাত হলো।
লুসী বুঝতে পারলো, এ মিঃ আলমের সংকেতপূর্ণ শব্দ। মিঃ আলম লুসীকে বলে দিয়েছিলো–পর পর জোড়াভাবে টোকা পড়লে তবেই তুমি দরজা খুলবে, নচেৎ খুলবে না।
লুসী বুঝতে পারলো আলম ছাড়া কেউ নয়।
তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে সম্মুখে যম দেখার মতই আঁতকে উঠলো লুসী। দেখলো মিঃ মাহমুদ রিজভী আর ধীরেনচরণ ভৌম সাক্ষাৎ ভয়ঙ্করের মত দাঁড়িয়ে আছে।
