রীণা সাঈদের হাত থেকে সিগারেট কেসটা নিয়ে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো সিগারেট কেসটা সোনার তৈরি। এবং সিগারেটগুলো অতি মূল্যবান সিগারেট।
বনহুর নিজে একটা ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে আর একটা গুঁজে দিলো রীণা সাঈদের ঠোঁটে। তারপর অগ্নিসংযোগ করলো সে সিগারেট দুটোতে।
দিল্লীর সেরা সিগারেট এা, রীণা সাঈদ সম্মুখে দৃষ্টি রেখে গাড়ি চালাচ্ছিলো। একরাশ ধুয়া ছড়িয়ে পড়ছিলো। চারপাশে। ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট চেপে ধরে বললো রীণা সাঈদ–রিজভী আজ কিন্তু তোমাকে ছাড়বোনা। থাকতে হবে আমার ওখানে।
উঁ হুঁ আজ সম্ভব হবে না রীণা।
কই কোনোদিন তো আমার কথায় অমত করনি রিজভী? আজ তোমার কোনো কথা আমি শুনবো না।
বনহুরবেশী রিজভী কোনো কথা বলতে নারাজ, কারণ সে দেখতে চায় এর শেষ কোথায়?
রীণা সাঈদ গাড়িখানা স্পীডে চালাচ্ছিলো।
দিল্লীর সেকেন্দ্রো রোড ধরে আগ্রার দিকে অগ্রসর হলো।
প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর গাড়িখানা একটা বড় বাড়ির সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। বাড়িটা বেশ নির্জন এবং শহরের এক প্রান্তে বলে মনে হলো।
গাড়িখানা দাঁড়িয়ে পড়তেই একটি দীর্ঘদেহী জমকালো লোক সেলুট করে দাঁড়ালো–মালিক বড্ড দেরী হয়ে গেছে, শীঘ্র চলুন।
রীণা সাঈদ দ্রুত ড্রাইভ আসন থেকে নেমে দাঁড়ালো, বললো–তোমার জন্য বিলম্ব হলো রিজভী।
বনহুর কোনোরকম কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো, বললো–শীগগীর চলো।
রীণা সাঈদ অগ্রসর হলো।
তাকে অনুসরণ করলো রিজভী, পকেটে হাত দিয়ে একবার রিভলভারটার অস্তিত্ব অনুভব করে নিলো সে।
পিছনে চলেছে জমকালো দীর্ঘদেহী লোকটা।
বাড়িটার মধ্যে প্রবেশ করতেই বনহুর অনুভব করলো কেমন যেন একটা থমথমে গুরুগম্ভীর ভাব। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনীভূত না হলেও বাড়িটা বেশ অন্ধকার লাগছিলো।
বড় বড় দুটো ঘর পেরিয়ে একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো রীণা সাঈদ।
বনহুর আর জমকালো লোকটা দাঁড়িয়ে রইলো পিছনে। লিফটের মত একটা চৌকা জিনিস নেমে এলো। নীচে। রীণা সাঈদ লিফটে চেপে পড়লো।
মিঃ রিজভীবেশি বনহুরও উঠে দাঁড়ালো।
কালো লোকটা উঠলো না, সে পূর্বের ন্যায় সেলুট করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
লিফট উঠে গেলো উপরের দিকে।
সাঁ সাঁ করে লিস্ট উঠছে। রীণা সাঈদ মিঃ রিজভীর হাতখানা নিজের হাতে চেপে ধরে বলে–সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
মিঃ রিজভী তার কথায় কোন জবাব দিলে না, কিন্তু ওর হাতে চাপ দিলো একটু।
রীণা সাঈদ হাসলো।
মিঃ রিজভী বললো–হঠাৎ শরীর খারাপ হওয়ায় বড় নার্ভাস মনে করছি, মাফ করো রীণা।
খিল খিল করে হেসে উঠলো রীণা সাঈদ–তবে এলে কেন, চলো সব ঠিক হয়ে যাবে।
লিফটা একটা বড় ধরনের হলঘরে এসে থামলো।
নেমে পড়লো রীণা সাঈদ।
মিঃ রিজভীও রীণাকে অনুসরণ করলো। কিন্তু পরক্ষণেই চক্ষু তার স্থির হলো। কতগুলো লোক বসে আছে, এক একটা লোকের পাশে এক একটা যুবতী দাঁড়িয়ে! কেউ বা পুরুষটির গায়ে হেলান দিয়ে, কেউ বা চেয়ারের হাতলে বসে, কেউ বা কারো কাঁধে হাত রেখে অদ্ভুত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে।
মিঃ রিজভীকে দেখেই সবাই উঠে দাঁড়ালো, অভিনন্দন করলো সকলে নত মস্তকে।
রীণা সাঈদের বাহুখানা তখন মিঃ রিজভীর বাহুর মধ্যে রয়েছে।
মাহমুদ বিজভীসহ রীণা সাঈদ একটা উচ্চ স্থানে এসে দাঁড়ালো। কক্ষটা এতক্ষণ যেন ঘুমিয়ে ছিলো, এবার জেগে উঠলো নব উদ্যমে। ওদিকে কতগুলো বাদ্যকর বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসেছিলো, এবার সবাই নিজ নিজ বাদ্যযন্ত্রে হাত রাখলো।
হঠাৎ যেন কক্ষটা মুহূর্তে সরগরম হয়ে উঠলো।
বাজনার তালে তালে এক একটি পুরুষ আর নারী মিলিতভাবে চললো অদ্ভুত ভঙ্গীমায় নাচ।
রীণা সাঈদ মাহমুদ রিজভীকে বললো–চলো।
আসলে তো মাহমুদ রিজভী সে নয়, বনহুর কোনোদিন এ ধরণের নাচে দক্ষ নয়। বলড্যান্স বা ফ্যান্সি নাচে তার কতকটা অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু একি ধরনের অদ্ভুত ভঙ্গীমায় নাচ। বললো সে–আমাকে মাফ করো রীণা, আজ আমি বড় অসুস্থ।
কিন্তু তুমি না আমায় কথা দিয়েছিলে?
হঠাৎ শরীর খারাপের জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।
রীণার মুখ গম্ভীর হলো।
তখন হলঘরটার মধ্যে শুরু হয়েছে নারী-পুরুষে মিলিত বিশেষ ভঙ্গীমায় নাচ। শুধু নাচ নয়, নাচের সঙ্গে সঙ্গে মদপান–আরও কত কি!
বনহুর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো।
কিন্তু রীণা সাঈদ কিছুতেই তাকে ছাড়বে না, আজ নাকি এদের এ উৎসবের দিন। দিল্লীর অধিবাসীদের মধ্যে নাকি এ নাচ প্রসিদ্ধ। কাজেই একটু-আধটু নাচতেই হবে তাকে।
রীণা যখন জেদ করছিলো, তখন বনহুর নিপুণ দৃষ্টি মেলে লক্ষ্য করছিলো, পারবে কিনা এ নাচ। তবে চেষ্টায় দোষ কি। দস্যুতা তার নেশা-পেশা সবকিছু। দস্যুতা করতে গিয়ে তাকে জীবনে অনেক অসাধা সাধন করতে হয়েছে, আজ না হয় একটু নাচবে!
বললো বনহুর–চলো তা হলে।
রীণা সাঈদের চোখেমুখে আনন্দের দ্যুতি খেলে গেলো, খুশি হলো সে। টেবিল থেকে গ্লাস ভরা মদ তুলে নিয়ে ঢক ঢক করে খেলো। বললো রিজভী খাও।
না শরীর খারাপ ওসব খাবো না।
বেশ এসো। রীণা মাহমুদ রিজভীবেশি বনহুরের বাহুর মধ্যে বাহু দিয়ে বেষ্টন করে ধরলো।
অদ্ভুত নাচ শুরু হলো রীণা সাঈদের সঙ্গে দস্যু বনহুরের। বাজনার তালে তালে পা এবং অঙ্গভঙ্গী করে নাচতে লাগলো।
সত্যিই একটা নাচের উন্মাদনা সৃষ্টি হচ্ছে বাজনার শব্দে। বাদ্যযন্ত্রিগণ অদ্ভুতভাবে বাজাচ্ছে তাদের যন্ত্রগুলো।
