কিন্তু বনহুর পরক্ষণেই লুসীকে বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে দেয়। গম্ভীর কণ্ঠে বলে–না না, লুসী, তুমি…তুমি…যাও। লুসী, তোমার পবিত্রতা আমি নষ্ট করতে চাই না।
বনহুর উঠে দাঁড়ায়, স্থির দৃষ্টি মেলে তাকায় সে লুসীর মুখের দিকে।
লুসী দৃষ্টি নত করে নেয়।
বনহুর বেরিয়ে যায় কক্ষ ত্যাগ করে।
ভোরের আকাশ তখন ফর্সা হয়ে এসেছে।
*
মিঃ মাহমুদ রিজভীর বেশে দস্যু বনহুর বসে আছে গুলশান হোটেলের ম্যানেজারের আসনে। নিপুণভাবে ছদ্মবেশ ধারণে অভিজ্ঞ বনহুর। কণ্ঠস্বরকেও পাল্টে নিয়েছে সে অদ্ভুতভাবে।
মিঃ মাহমুদ রিজভী বেশি কথা বলছে না, তার অন্যান্য কর্মচারীদের বলে দিয়েছে, আজ যেন তাকে বেশি বিরক্ত না করে। কারণ, তার শরীর আজ মোটেই ভাল নয়।
নিজের ক্যাবিনে বসে কাজ করে চলেছে সে।
এমন সময় একটি বয় এসে একটা কার্ড রাখলো তার সামনে।
মিঃ মাহমুদ রিজভী কার্ডখানা হাতে তুলে নিতেই বুঝতে পারলো ধীরেনচরণ এসেছে। বয়কে বললো– আসতে বলো।
বয় বেরিয়ে গেলো।
একটু পরে কক্ষে প্রবেশ করলো ধীরেনচরণ! চোখে কালো চশমা, মাথায় ক্যাপ। ক্যাপ দিয়ে মুখ অর্ধেকটা ঢাকা।
মিঃ মাহমুদ রিজভীবেশি বনহুর এক নজরেই ধীরেনকে চিনে নিতে পেরেছিলো। বনহুরের সূতীক্ষ দৃষ্টির কাছে কোনোরকম চালাকি চলে না। বললো–বসুন।
মাহমুদ রিজভীর কথায় আসন গ্রহণ করলো ধীরেনচরণ, তারপর বললো–শুনলাম আপনি নাকি অসুস্থ?
হাঁ। বড় সর্দি-কাশি হয়েছে। গলাটা কেমন ভার ভার বোধ হচ্ছে! বলে গলায় মাফলারটা আরও ভালোভাবে জড়িয়ে নিলো।
ধীরেনকে বেশ উত্তেজিত বলে মনে হচ্ছিল। মিঃ রিজভীর কথায় কান না দিয়ে বললো–আমার কথার কি হলো? ভেবে দেখেছেন তো?
হা দেখেছি, কিন্তু আমি যা চেয়েছি তার কম হবে না।
জানেন লুসী আমার শিকার।
একথা বার বার শুনিয়ে কোনো ফল হবে না মিঃ ধীরেনচরণ, যা চেয়েছি তাই দিতে হবে।
বেশ তাই দেবো। কিন্তু মিঃ আলমকে খতম করে দিতে হবে।
সে দায়িত্ব আমার, আমি তাকে সরিয়ে ফেলেছি।
আনন্দধ্বনি করে উঠলো ধীরেনচরণ–সত্যি বলছেন?
হাঁ, মিঃ আলমকে গত রাতে গুম করে দিয়েছি।
আপনাকে ধন্যবাদ মিঃ মাহমুদ। হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ডসেক করলো ধীরেনচরণ।
বনহুর মৃদু হাসলো–আপনার পথ আমি পরিস্কার করে দিয়েছি।
মিস লুসীকে তাহলে পাবো?
পুরো টাকা দিলেই পাবেন!
আচ্ছা–আজ রাতে আবার দেখা হবে।
লাবলীং ক্লাবে?
না, আপনার গুলশানে। আপনাকে টাকা দিয়ে মিস লুসীকে নিয়ে যাবো!
বেশ তাই হবে।
ধীরেনচরণ বেরিয়ে যায়।
মিঃ মাহমুদ রিজভীবেশি বনহুর হাসে।
এমন সময় অন্য একজন বয় আসে তার ক্যাবিনে–স্যার, রীণা সাঈদ এসেছেন।
বনহুর থতমত খেয়ে যায়, রীণা সাঈদ–এ আবার কে! এর সঙ্গে মিঃ মাহমুদ রিজভীর কি সম্বন্ধ? এবার হয়তো তার ছদ্মবেশ উদঘাটন হয়ে যাবে। তবু সামলাতে হবে তো! বললো বনহুর–আচ্ছা আসতে বলো!
বয় অবাক চোখে তাকালো, কেমন যেন হতভম্ব ভাব।
বনহুর বললো নিজেকে সামলে নিয়ে কোথায় ওনি?
স্যার, আপনার ক্যাবিনে!
আচ্ছা যাও, আমি আসছি।
বয় বেরিয়ে যায়।
বনহুর ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করে নিজের ছদ্মবেশটা ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখে নেয়। না, ধরবার কোনো উপায় নেই, তবে গলার স্বরটা যা একটু অন্যরকম। মালারটা ভালোভাবে গলায় জড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়ে এলো বনহুর বাইরে।
মিঃ মাহমুদ রিজভীর ক্যাবিন, বনহুর পূর্ব হতেই চিনতো, কাজেই কোনো অসুবিধা হলো না।
বনহুর মিঃ রিজভীর বেশে প্রবেশ করলো তার ক্যাবিনে! প্রবেশ করেই থমকে দাঁড়ালো বনহুর, একটি তরুণী কক্ষমধ্যে পায়চারী করছে।
মিঃ মাহমুদ রিজভীকে দেখেই তরুণী ছুটে এলো, জড়িয়ে ধরলো ওর গলা–হ্যালো রিজভী, এতো দেরী করলে। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো সে আবার–সব বুঝি ভুলে বসে আছো? যাবে কখন?
হঠাৎ কোনো জবাব দিতে পারলো না মিঃ রিজভী, কারণ সে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।
তরুণী মিঃ রিজভীর আচরণে যে সন্তুষ্ট হতে পারছে না, বললো–কি হলো তোমার বলো তো?
বনহুর এমনি একটা ফ্যাসাদে আর একবার পড়েছিলো, এমনি এক তরুণীর কবলে। বনহুর ঘাবড়ে গেলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো, কেশে বললো–বড় সর্দি কাশি হয়েছে। গলাটা কেমন যেন বসে গেছে রীণা।
বনহুর বয়ের মুখে শুনেছিলো তরুণীর নাম রীণা সাঈদ। তাই সে ওকে রীণা বলেই সম্বোধন করলো।
রীণার বাহুদুটি মিঃ রিজভীর কণ্ঠ আলীঙ্গন করে আছে।
বললো মিঃ রিজভী–চলো, যাবার সময় হয়ে গেছে যে! তরুণী মিঃ রিজভীর কণ্ঠ মুক্ত করে দিয়ে বললো–এতোক্ষণে তোমার হুঁস হলো বুঝি? চলো।
তরুণী মিঃ রিজভীর হাত ধরে অগ্রসর হলো।
গাড়িতে বসে ড্রাইভ আসনে বসলো রীণা সাঈদ।
নিশ্বাস ফেললো বনহুর, কারণ রীণা আর মিঃ রিজভীর গন্তব্য স্থানের সন্ধান জানে না সে।
দিল্লীর পথ বেয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে।
পাশের আসনে বসে আসে মিঃ রিজভীবেশী দস্যু বনহুর। হাওয়ায় রীণা সাঈদের আঁচলখানা উড়ছে। একটা উগ্র সেন্টের গন্ধ প্রবেশ করছে বনহুরের নাকে। রীণা সাঈদের চুলগুলো এলো মেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তার ললাটে-ঘাড়ে-কপালে। মাঝে মাঝে দক্ষিণ হস্তে গাড়ির হ্যাণ্ডেল ঠিক রেখে চুলগুলো বাম হস্তে সরিয়ে নিচ্ছিলো।
বনহুর ওর অলক্ষ্যে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিলো, কে এ মেয়েটি রীণা সাঈদ। এখন তাকে নিয়ে কোথাই বা চলেছে। মেয়েটিকে স্বাভাবিক তরুণী বলে মনে হয় না! রীণা সাঈদ পকেট থেকে সিগারেট প্যাক বের করে বাড়িয়ে ধরলো মিঃ রিজভীর দিকে–অমন বোবা বনে গেছো কেন? নাও আমি দিচ্ছি ধরাও।
