বেশি কথা বলার সময় এখন নেই। আপনার দাড়ি-গোঁফ খুলে আমাকে দিন। এখন আপনি বিশ্রাম করুন। আজ থেকে আমি গুলশান হোটেলের ম্যানেজার মিঃ মাহমুদ রিজভী।
*
বনহুর মিঃ মাহমুদ রিজভীর ড্রেসে সজ্জিত হয়ে মিস লুসীর সম্মুখে এসে দাঁড়ালো।
ভীত দৃষ্টি নিয়ে তাকালো লুসী বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর বললো–মিস লুসী, ভয় পাবার কিছু নেই। জানো আমি কেন এসেছি?
কেঁদে কেঁদে লুসীর দু’চোখ ফুলে গেছে। দেহটা পূর্বের চেয়ে ক্ষীণ হয়ে গেছে। চুলগুলো এলোমেলো তৈলহীন।
বনহুর লুসীর হাত ধরলো–এসো আমার সঙ্গে।
না না আমি যাবো না, আমাকে ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন, আপনার পায়ে পড়ি আমাকে ছেড়ে দিন…
হবে না, চলো আমার সঙ্গে যেতে হবে তোমাকে।
কোথায় নিয়ে যাবেন আমাকে?
ধীরেনচরণের কাছে।
উঃ তার চেয়ে আমাকে মেরে ফেলুন। আমাকে মেরে ফেলুন আপনি।
কোনো কথা শুনতে চাই না, এসো আমার সঙ্গে।
বনহুর মিঃ মাহমুদ রিজভীর বেশে মিস লুসীকে নিয়ে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে উঠে এলো উপরে।
চোরা কুঠরীর মধ্যে বন্দী করে রাখলো বনহুর আসল মাহমুদ রিজভীকে। সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসার কোনো উপায় নেই তার। নিজের তৈরি মৃত্যুকূপে আটকা পড়েছেন এবার মাহমুদ রিজভী। এতোকাল বহু অন্যায় কাজ তিনি সমাধা করে এসেছেন গুলশান হোটেলের অন্তরালে, সর্বনাশ করেছেন অনেক মহৎ ব্যক্তির। এবার হবে তার উপযুক্ত শাস্তি।
বনহুর মিস লুসীকে নিয়ে গোপন সুড়ঙ্গপথ বেয়ে গুলশান হোটেলের ভিতরে এসে দাঁড়ালো। রাত তখন শেষ হয়ে এসেছে।
মিস লুসী করুণ সুরে বললো–আমাকে আমার ক্যাবিনে পৌঁছে দিন দয়া করে। আমাকে আমার ক্যাবিনে পৌঁছে দিন…
বেশ চলো। মিঃ রিজভীবেশি বনহুর বললো।
লুসীসহ বনহুর তাদের পূর্বের ক্যাবিনে হাজির হলো। ব্যাকুল আগ্রহে তাকালো লুসী কক্ষের মধ্যে। ওপাশে খাটখানা শূন্য পড়ে আছে। মিঃ আলম কই, তবে কি তিনি এ হোটেল ত্যাগ করে চলে গেছেন! কিন্তু পাশের আলনায় নজর পড়তেই কতকটা আশ্বস্ত হলো লুসী, দেখলো কোট-প্যান্ট-সার্ট ঝুলছে। এসব যে মিঃ আলমের তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আনন্দ উজ্জ্বল হলো ওর চোখ দুটো।
বনহুর তার দাড়ি-গোঁফের আড়ালে লুসীর আনন্দভরা মুখের দিকে তাকালো। মনে মনে সেও কত খুশি হলো, না, লুসীকে সে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সে এ ভাবে তাকে পরিচয় দিতে রাজি নয়, আরও বিলম্ব আছে। দিল্লী নগরীতে আরো কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে তাকে! কারণ ধীরেনচরণকে এখনও উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হয়নি।
মিঃ রিজভীবেশি বনহুর বললো–তুমি এখানে থাকতে পারো। কিন্তু এ হোটেল ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না।
বনহুর লক্ষ্য করলো তার কথায় লুসীর মুখ প্রফুল্ল হয়ে উঠেছে। এ কথা তার মনে একটা শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিয়েছে যেন; এখানে তার রক্ষক আলমকে পাবে–এই তার ভরসা।
মিল লুসীকে এ ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে সরাসরি চলে গেলো বনহুর ম্যানেজার মিঃ মাহমুদ রিজভীর ক্যাবিনে। তাকে কয়েকদিন মিঃ রিজভীর অভিনয় করতে হবে।
বনহুর চলে যেতেই লুসী কক্ষের চারদিকে ব্যাকুল আঁখি মেলে তাকাতে লাগলো, কোথায় তিনি, যার প্রতীক্ষায় তার দিন-রাত্রি চোখের জলে বুক ভাসছে। কোথায় সে দেব সমতুল্য মিঃ আলম। লুসীর মনে ঝড় বইছে, তবে কি তিনি নেই এখানে তাকেও কি ঐ শয়তান সরিয়েছে?
লুসী শয্যায় গিয়ে বসলো, রাত শেষ হয়ে এসেছে। তবে সূর্য উঠতে এখনও ঘন্টাখানেক বাকি।
লুসী শয্যায় শুয়ে পড়লো, কিন্তু ঘুম তার চোখে আসছে না। মনের মধ্যে ঝড় বইছে তার।
এমন সময় ক্যাবিনের দরজায় মৃদু আঘাতের শব্দ হয়। চমকে উঠে লুসী, তাকায় বদ্ধ দরজার দিকে। পরপর দরজায় মৃদু আঘাত হচ্ছে।
লুসী খুলে দেয় দরজা–যা তার ভাগ্যে থাকে হবে। দরজা খুলেই দেখতে পায় সে মিঃ আলমকে, উজ্জ্বল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে লুসী বনহুরের বুকে–আপনি!
বনহুরও নিজেকে সংযত রাখতে পারে না, বেশ কিছুদিনের ঘনিষ্ঠতায় লুসীর প্রতি তার একটা অনুরাগ জন্মেছিলো। হাজার হলেও সেও তো মানুষ, তার মধ্যেও আছে একটা মানুষের প্রাণ। বনহুর লুসীকে সরিয়ে দিতে পারে না, নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে।
বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে লুসী আবেগভরা গলায় বলে–আপনি আমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবেন না। বলুন আর কোথাও যাবেন না?
না লুসী। তোমাকে ছেড়ে আমি তো যাইনি, তুমিই তো আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে।
আমি যাইনি মিঃ আলম, আমাকে ঐ শয়তান মিঃ রিজভী ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।
বনহুর লুসীর চোখের পানি নিজের হাতে মুছিয়ে দিয়ে বললো–শয়তানকে আমি উপযুক্ত শাস্তি দেবো;
না না, সে এখন আমাকে এ ক্যাবিনে পৌঁছে গিয়েছে, বলেছে আমি যেন এ ক্যাবিন ছেড়ে কোথাও না যাই। ওকে আপনি আর কিছু বলবেন না। হয়তো আবার সে আপনার উপর প্রতিশোধ নিতে পারে।
লুসী, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো–আমি বললাম আর কেউ তোমার বা আমার উপর কোনোরকম অত্যাচার করতে সক্ষম হবে না।
মিঃ আলম।
বলো লুসী?
বনহুর আর লুসী বিছানায় এসে বসে।
লুসীর মায়াময় চোখে, চাহনী বনহুরের মনে একটা আলোড়ন জাগায়। বনহুর লুসীকে বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে, মুখখানা নেমে আসে ওর মুখের উপর।
লুসী বাধা দেয় না বনহুরকে, কারণ সে তাকে ভালোবেসে ফেলেছে অন্তর দিয়ে।
