কয়েক মিনিট কেটে গেলো।
হঠাৎ ওদিকের জানালা খুলে গেলো, খুট করে একটা শব্দ হলো। বনহুর দাঁড়িয়ে আছে আলমারীটার আড়ালে। কিন্তু দৃষ্টি তার জানালার দিকে।
ধীরে ধীরে একটি লোক প্রবেশ করলো, ইলেকট্রিক আলোতে তার হাতে সূতীক্ষ ছোরাখানা চক্ চক্ করে উঠলো। লোকটা সন্তর্পনে এগুচ্ছে তার বিছানার দিকে।
বনহুর রুদ্ধ নিশ্বাসে প্রতীক্ষা করছে।
লোকটার মুখে মুখোশ, দেহে কালো পোশাক।
বিছানার কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো লোকটা এবার। এদিক ওদিক একবার তাকিয়ে ছোরাখানা সমূলে বসিয়ে দিলো বিছানায় শায়িত বালিশটার বুকে।
অমনি বনহুর ওর পিছনে এসে দাঁড়ালো, হেসে উঠলো অদ্ভুত ভাবে–হাঃ হাঃ হাঃ মিঃ আলমকে হত্যা করলে?
মুখোশ-পরা লোকটা মুহূর্তে হকচকিয়ে গেলে। ফিরে দাঁড়ালো বনহুরের দিকে মুখ করে।
বনহুর রিভলভারের আগা দিয়ে লোকটার মুখের মুখোশ সরিয়ে দিলো, সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো–আপনি!
লজ্জায় মাথা নত করে নিলেন মিঃ মাহমুদ রিজভী।
বনহুর হেসে বললো–লজ্জিত হবার কিছু নেই। বসুন মিঃ রিজভী।
মাহমুদ রিজভী কোনো জবাব না দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। পথ রোধ করে দাঁড়ালো বনহুর দাঁড়ান।
মাহমুদ রিজভী থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, কিন্তু দৃষ্টি তার দরজার দিকে রইলো।
গম্ভীর কণ্ঠে বললো বনহুর–উদ্দেশ্য সফল হলো না মিঃ রিজভী? মিঃ আলমকে খতম করে মিস লুসীকে আত্মসাৎ করতে চেয়েছিলো!
নত দৃষ্টি তুলে তাকালেন মাহমুদ রিজভী বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর পুনরায় বললো–মিঃ রিজভী, আপনি মিঃ জিল্লুর আলীর কাছে মিস লুসীকে বিক্রয় করতে চেয়ে আবার গিয়েছিলেন ধীরেনের হাতে তুলে দিতে।
চমকে উঠলেন মিঃ মাহমুদ রিজভী, ভাবছেন এত সব মিঃ আলম জানলো কি করে?
বনহুর এবার মিঃ মাহমুদ রিজভীর পিঠে রিভলভার চেপে ধরলো, তারপর বললো–চলুন আমিই মিঃ জিল্লুর আলী রিজভী, মিস লুসীর সম্বন্ধে আমার সঙ্গেই চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন! আমি তার প্রথম গ্রাহক।
আশ্চর্য হয়ে তাকালেন মিঃ মাহমুদ, কিন্তু কোনো কথা তার কণ্ঠ দিয়ে বের হলো না।
বনহুর চাপা স্বরে গর্জে উঠলো–চলুন। দেখুন আমার সঙ্গে কোনোরকম চালাকি করতে গেলে মরবেন। লক্ষ টাকাও যাবে প্রাণও হারাবেন।
মিঃ রিজভী বাধ্য হয়েই অগ্রসর হলেন।
বনহুর তাকে অনুসরণ করলো। তার হস্তে গুলীভরা রিভলভার।
মিঃ রিজভী সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নিচে নামতে লাগলেন।
নিশীথ রাতের গভীরতায় সমস্ত দিল্লী নগরী নিস্তব্ধ। গুলশান হোটেলও ঢলে পড়েছে সুপ্তির কোলে। কোথাও জনপ্রাণী নেই। বনহুর আর মিঃ মাহমুদ রিজভী চলেছে, দুটো যন্ত্রচালিত মূর্তির মত।
চাপা কণ্ঠে বনহুর বললো–খবরদার, ফাঁকি দিতে চেষ্টা করবেন না মিঃ রিজভী।
এতোক্ষণ মিঃ রিজভী কোনো কথা বলেননি, এবার বললেন তিনি–মিস লুসী বাইরে আছে! আমার গাড়িতে আপনাকে যেতে হবে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–প্রথমেই বলেছি, কোনো রকম চালাকি করবেন না। আমি জানি, মিস লুসী এ হোটেলেই আছে।
নেই, তাকে লাবলীং হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
চলুন আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি…বনহুর হস্তস্থিত রিভলভারখানা চেপে ধরলো মিঃ মাহমুদ রিজভীর পিঠে।
এবার মাহমুদ রিজভী নির্বাকভাবে অগ্রসর হলেন, পিছন ফিরে তাকাবার সাহস তার হলো না।
গুলশান হোটেলের চোরাকক্ষের সুড়ঙ্গমুখে এসে দাঁড়ালো বনহুর আর মাহমুদ রিজভী।
বনহুর পূর্বদিন দেখেছিলো কেমনভাবে সুড়ঙ্গপথ আবিস্কার করতে হয়। আজ তার কোনো অসুবিধা হলো না। বনহুর দেয়ালে একটি যন্ত্রে চাপ দিতেই মেঝেতে বেরিয়ে পড়লো একটি সিঁড়ির মুখ।
মিঃ রিজভীর চোখমুখ রাগে কালো হয়ে উঠেছে। তিনি জানতেন তার এ সুড়ঙ্গপথের সন্ধান বাইরের কেউ জানে না! মিঃ আলম কি করে জানলো বা সন্ধান পেলো এ পথের!
সব রহস্য ফাঁস হয়ে গেলো দেখে তিনি ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় গর্জে উঠলেন–মিঃ আলম, আপনি কি করে এ পথের খোঁজ পেলেন?
হেসে বললো বনহুর–আপনার কাছে।
আমার কাছে?
হাঁ। আপনি লুসীর কাছে যখন যান তখন আমিও আপনার সঙ্গে ছিলাম মিঃ রিজভী।
অস্ফুট শব্দ করে উঠলেন মিঃ রিজভী–মিঃ আলম!
বনহুর রিভলভার চেপে ধরলো সজোরে তার বুকে কোনো রকম উত্তেজিত হবেন না। আমি মিঃ আলম নই।
কে! কে তবে আপনি?
আমি দস্যু বনহুর।
দস্যু বনহুর আপনি?
হাঁ।
বিশ্বাস হয় না। দস্যু বনহুরের যে কাহিনী আমি শুনেছি, তার সঙ্গে আপনার কোনোরকম মিল নেই।
তা হলে আপনার বন্ধুই মনে করুন। বেশ, চলুন এবার বন্ধু। মিস লুসীকে আমার চাই।
কিন্তু…
লক্ষ টাকা তো?
হাঁ, লুসীকে আমি…
লুসীকে আপনি হরণ করেছেন আমার নিকট হতে। জানেন তার শাস্তি কি? মৃত্যু। যদি মরতে না চান। তবে বিনা বাক্যে প্রবেশ করুন এ চোরা সুড়ঙ্গপথে, চলুন।
অগত্যা মিঃ মাহমুদ রিজভী চোরা সুড়ঙ্গপথে পা বাড়ালেন। বনহুর চললো তার পিছনে পিছনে।
গভীর মাটির নিচে একটি কক্ষ।
ক্ষীণ একটা আলো টিপ টিপ করে জ্বলছে।
কক্ষমধ্যে আরো অন্ধকার। বনহুর দেখলো, ওপাশে একটা শয্যায় শুয়ে আছে মিস লুসী! ঘুমিয়ে আছে।
মিঃ রিজভী আর বনহুরের পদশব্দ তার কানে পৌঁছলো না। যেমন নিশ্চুপ ঘুমিয়েছিলো, তেমনি রইলো।
বনহুর মিঃ রিজভীসহ পাশের খুপড়িতে প্রবেশ করলো। বললো সে–আপনার ছদ্মবেশ ত্যাগ করুন।
অবাক হবার ভান করে বলেন মিঃ মাহমুদ রিজভী–ছদ্মবেশ! আমি তো ছদ্মবেশ ধারণ করিনি।
