ম্যানেজারকে বনহুর চিনতে পারলেও ম্যানেজার তাকে বুঝতেই পারেনি, এ লোক একদিন তার বুকে রিভলভার চেপে ধরেছিলো। ম্যানেজার তাকে নতুন আগন্তুক মনে করে যুবতীটিকে ইঙ্গিত করলো কিছু।
যুবতীও ইশারা করলো তার দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে।
চলে গেলো ম্যানেজার।
যুবতী বনহুরের হাত ধরে বললো মাই ডিয়ার ফ্রেণ্ড, চলো। উঠে দাঁড়ালো বনহুর, যন্ত্রচালিতের ন্যায় যুবতীর সঙ্গে এগিয়ে চললো। এমনি করে লোকের সর্বনাশ এরা করে চলে দিনের পর দিন রাত্রির পর রাত্রি।
বনহুরসহ যুবতী একটি কক্ষে প্রবেশ করলো।
চমকে উঠলো বনহুর।
দেখলো ওদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে দুই ব্যক্তি, নিম্নস্বরে কিছু কথাবার্তা হচ্ছে তাদের মধ্যে।
যুবতী এবং বনহুরের পদশব্দে তারা ফিরে তাকালো না। যেমন বসেছিলো তেমনি রইলো। যুবতী। বনহুরকে ইঙ্গিত করলো ওদিকের কামরায় যেতে।
বনহুর অনুসরণ করলো যুবতীকে।
যদিও বনহুর যুবতীর সঙ্গে সে কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেলো। কিন্তু সে লোক দুটিকে সম্পূর্ণ চিনতে পারলো। একজন শয়তান ধীরেনচরণ আর দ্বিতীয় জন মিঃ মাহমুদ রিজভী।
যে কক্ষে ওরা নিভৃতে আলাপ-আলোচনা করছিলো ঠিক তার পাশের কক্ষে যুবতীসহ প্রবেশ করলো বনহুর।
কক্ষটা মাঝারী গোছের।
একটা ডিমলাইট জ্বলছে টেবিলে।
সুন্দরভাবে সজ্জিত কক্ষটা।
যুবতী বনহুরকে ধরে বসিয়ে দিলো একটা চেয়ারে।
একটা বয় এসে টেবিলে রেখে গেলো এক বোতল বিলেতী মদ আর দুটো গ্লাস।
যুবতী নেশায় তখন ঢুলু ঢুলু করছে, তবু বোতলটা হাতে তুলে নিয়ে এক টানে দাঁত দিয়ে খুলে ফেললো। বোতলের মুখের ছিপিটা, তারপর গ্লাস দুটো পূর্ণ করে একটি তুলে নিলো হাতে, বললো– নাও।
বনহুর ওর হাত থেকে গ্লাসটা নিজের হাতে নিলো।
যুবতী দ্বিতীয় গ্লাসটা তুলে নিলো।
বনহুর মদের গ্লাস হস্তে তখন ভাবছে অন্য কথা, ধীরেনের সঙ্গে লুসীকে নিয়ে মাহমুদ রিজভীর দাম কষাকষি চলছে নিশ্চয়ই। এতো রাতে সে এসেছে এখানে ঐ কারণে। ধীরেন তাহলে লাবলীং ক্লাবে থাকে। কিন্তু সে জানে না লুসী এখন কোথায় আছে। কিন্তু চিঠিখানা যে ধীরেনের লেখা ছিলো, তাতে মনে হয় ধীরেন চরণই তাকে হরণ করেছে। আসলে তা নয়, হরণ করেছেন লুসীকে মিঃ রিজভী। লোকটা যে অত্যন্ত চালাক তাতে কোন সন্দেহ নেই। চিঠিখানা লেখার উদ্দেশ্যই ছিল মিঃ আলম যেন ধীরেনচরণকেই সন্দেহ করে।
যুবতী গ্লাসের মদ নিঃশেষ করে টেবিলে রাখলো, তারপর বনহুরের হাটুর উপর মাথা রেখে বললো–কি ভাবছো ডার্লিং।
বনহুরের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়, বলে–তোমার রূপসাগরে ডুববো কিনা তাই ভাবছি।
কেন, তুমি; তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না? জড়িত কণ্ঠে বললো যুবতী।
বনহুর যুবতীর চিবুকটা তুলে ধরলো–অবিশ্বাস তো করিনি তোমাকে তবে ভাবছি এর শেষ হবে কোথায়? কথার ফাঁকে বোতল থেকে কিছুটা তরল পদার্থ ঢেলে তুলে ধরলো যুবতীর মুখে–খাও প্রিয়া।
যুবতী আত্মহারা, বনহুরের হাতের মদটুকু নিঃশেষে ঢেলে দিলো কণ্ঠে, তারপর বললো–দাও আরও দাও আমাকে।
বনহুর আবার গ্লাস পূর্ণ করলো, এগিয়ে দিলো যুবতীর দিকে–নাও।
আবার যুবতী পান করলো সবটুকু।
বনহুর পর পর কয়েক গ্লাস মদ পান করালো যুবতীকে। এক সময় যুবতী ঢলে পড়লো বনহুরের হাতের
এবার বনহুর বিলম্ব না করে ওকে শুইয়ে দিলো ওর বিছানায়। তারপর চাদর দিয়ে ঢেকে দিলো গা অবধি।
বনহুর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো কক্ষ থেকে, এ ঘরে প্রবেশ করতেই কানে এলো মিঃ মাহমুদ রিজভীর চাপা কণ্ঠ–তা হলে কথা ঠিক রইলো তো?
ধীরেনচরণের গলা–বন্ধুর সঙ্গে কথা বেঠিক আবার কবে হয়েছে! তবে হাঁ, তুমি যা চাইছো তাই পাবে কিন্তু পথ পরিস্কার করে দিতে হবে, বুঝলে তো?
বুঝেছি। আজ রাতেই আমি তোমার পথ পরিস্কার করে দিবো। কিন্তু মনে রেখো এক পয়সা কম নিবো না।
চলি, গুড নাইট…উঠে পড়লেন মিঃ মাহমুদ রিজভী।
ধীরেনচরণ পুনরায় ওকে টেনে বসিয়ে দিয়ে বললো–লুসী এখন কোথায়, তোমার হোটেলে না বাইরে আছে?
সে কথা আমি বলতে রাজি নই। তবে কথা দিলাম, তোমার মাল তোমার হাতেই আসবে।
বনহুর বুঝতে পারলো–ওদের কথাবার্তা শেষ হয়ে গেছে, এবার বিদায়ের পালা। মুহূর্ত বিলম্ব না করে আড়ালে আত্মগোপন করে গাড়িতে পৌঁছে গেলো। গাড়ির পিছন থেকে তার ড্রাইভারের ড্রেস নিয়ে ওদিকে একটা থামের আড়ালে গিয়ে পাল্টে নিলো তার সাধারণ পোশাকটা। তারপর এসে বসলো ড্রাইভ আসনে।
ঘনীভূত নিদ্রাতুরের মত গাড়ির হ্যাণ্ডেলে মাথা রেখে ঝিমুতে লাগলো বনহুর।
গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালেন মিঃ মাহমুদ রিজভী ও ধীরেনচরণ।
মিঃ মাহমুদ বললো–ড্রাইভার! ড্রাইভার ঘুমাচ্ছো নাকি?
চোখ রগড়ে সোজা হয়ে বসলো বনহুর।
ধীরেন বললো–আগামী রাতে আবার দেখা হবে।
গুড নাইট! কথাটা উচ্চারণ করে গাড়িতে চেপে বসলেন মাহমুদ রিজভী।
ষ্টার্ট দিলো বনহুর।
গাড়ি ছুটলো এবার গুলশান হোটেল অভিমুখে।
*
বিছানায় শুয়ে ভাবলো বনহুর, আজ রাতেই তাকে খতম করবার সঙ্কল্প করেছে মাহমুদ রিজভী, নিশ্চয়ই সে তার সঙ্কল্প অটুট রাখবার জন্য এখানে আগমন করবে। হাতঘড়ির দিকে তাকালো বনহুর, রাত চারটা বেজে পঁচিশ মিনিট হয়েছে। শয্যা ত্যাগ করে বিছানার পাশের লম্বা বালিশ দুটো চাদর ঢাকা দিয়ে রাখলো।
ওপাশের আলমারীটার আড়ালে লুকিয়ে রইলো নিশ্চুপ হয়ে। দক্ষিণ হস্তে তার গুলীভরা রিভলভার।
