বনহুরের অপরিচিত নয় লাবলীং ক্লাব, গাড়ি ছুটলো এবার দিল্লীর শেরশাহ রোড় ধরে ফরিদা রোড়ের দিকে।
গাড়ি ছুটে চলেছে।
রাত্রির গভীরতার সঙ্গে দিল্লী নগরীর নির্জনতা যেন থমথমে হয়ে উঠেছে! পথ জনশূন্য। ইলেকট্রিক আলোগুলো কেমন যেন স্তিমিত মনে হচ্ছিলো। পথের দু’পাশের সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো যেন সুপ্তির কোলে ঢলে। পড়েছে।
মিঃ মাহমুদ রিজভীর গাড়ি তখন লাবলীং ক্লাবের উদ্দেশ্যে ছুটে চলছে।
ড্রাইভিং আসনে স্বয়ং দস্যু বনহুর।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িখানা লাবলীং ক্লাবের সম্মুখে এসে থামলো।
লাবলীং ক্লাবের উজ্জ্বল আলোগুলো তখনও দপদপ করে জ্বলছে। ভিতর থেকে ভেসে আসছে সুমিষ্ট একটা বাজনার সুর। মাঝে মাঝে জড়িত কণ্ঠের অস্পষ্ট আওয়াজের সঙ্গে শোনা যাচ্ছে নারী-কণ্ঠের হাস্যধ্বনি।
মিঃ মাহমুদ রিজভী গাড়ি থেকে নেমে চলে গেলেন ক্লাবের মধ্যে।
মাহমুদ রিজভী ক্লাবে প্রবেশ করতেই বনহুর তার ছদ্মবেশ পাল্টে নিলো। গাড়ির মধ্যে সে লুকিয়ে রেখেছিলো তার স্বাভাবিক ড্রেস। সাধারণ এক নাগরিকের বেশে সজ্জিত হয়ে প্রবেশ করলো সে ক্লাবকক্ষে।
হলকক্ষের একটা কোণে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লো বনহুর। তাকালো সে কক্ষের চারপাশে। লাবলীং ক্লাব এখন বেশ নীরব। প্রায় টেবিলগুলোই শূন্য–ফাঁকা। দু’একটা টেবিল অধিকার করে তখনও বসে আছে কয়েকটা বিশিষ্ট মাতাল ব্যক্তি। সম্মুখে শূন্য বোতল আর কাঁচপাত্র। কেউ কেউ খালি বোতলটা তুলে ধরে নিঃশেষিত সারাটুকু ঢেলে দিচ্ছে গলার মধ্যে। কেউ বা টেবিলে মাথা রেখে পড়ে আছে উবু হয়ে, হাত দুখানা ঝুলছে টেবিলের নিচে।
বনহুর সিগারেট ধরালো।
একটা বয় নিদ্রাজড়িত কণ্ঠে বললো–আনবো স্যার?
হ নিয়ে এসো।
লাবলীং ক্লাবে কিছু বলতে হয় না–ওরা জানে, বেশি রাতে যারা আসে তারা কোন জিনিসের লোভে আসে। বনহুর লক্ষ্য করলো, ডাইনিং হলে তখনও কয়েকজন লোক বসে আছে। এবং তাদের মধ্যে কিছু আলাপ-আলোচনা চলছে। যদিও তারা সারাব পানে চুর চুর তবু বেশ স্বাভাবিকভাবেই ফিস ফিস করে আলাপ করছে। দুটো যুবতীও আছে তাদের দলে! বনহুর আরও লক্ষ্য করলো, যে দুটি যুবতী তখনও ক্লাবের জৌলুস বাড়াবার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিলো তারা প্রায় নগ্নদেহী নারী। চোখ দুটো নেশায় লালে লাল হয়ে উঠেছে। দুটো পুরুষের পাশে চেয়ারের হাতলে বসে সিগারেট ফুকছিলো। আর মাঝে মাঝে ঝঙ্কার তুলে হাসছিলো যুবতীদ্বয়। কখনও বা ঢলে পড়েছে তারা পুরুষগুলোর গায়ে।
এসব দৃশ্য বনহুরের কাছে অত্যন্ত ঘৃণাজনক! তবু তাকে স্থির হয়ে দেখতে হচ্ছে। সকলের অলক্ষ্যে সে অন্বেষণ করে চলেছে মিঃ মাহমুদ রিজভীকে।
ক্লাবে প্রবেশ করেই কি সে হাওয়ায় উবে গেলো, বিরাট কক্ষটার কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না।
বনহুরের সম্মুখে ততক্ষণে কয়েকটা মদের বোতল আর কয়াচপাত্র এনে রাখা হয়েছে। বয় চলে যেতেই। একটি নগ্নপ্রায় যুবতী এগিয়ে এলো, বোতলটা হাতে তুলে নিয়ে হাসলো ফিক করে।
বনহুর মৃদু হেসে বললো–দাও।
যুবতী কাঁচপাত্রে খানিকটা মদ ঢেলে হাতখানা এগিয়ে ধরলো বনহুরের ঠোঁটের কাছে!
এবার বনহুর বেশ বিব্রত হয়ে পড়লো। কিন্তু পরক্ষণেই যুবতীর হাতখানা ধরে কাঁচপাত্রটা তুলে নিলো নিজের হাতে, তারপর যুবতীর মুখে তুলে ধরে বললো–তুমি খাও।
যুবতীর চোখ দুটো আনন্দে চক্ করে উঠলো। এক নিঃশ্বাসে কাঁচপাত্রের মদটুকু পান করে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। দু’চোখ তার নোশায় ঢুলু ঢুলু করছে। একরাশ কোকড়ানো চুল ছড়িয়ে পড়েছে তার চোখে-মুখে-কপালে। বনহুরের চোখে-চোখ রেখে বললো–তুমিও খাও।
হা খাবো।
বনহুর আর যুবতীর যখন কথাবার্তা চলছিলো, তখন বনহুরের দৃষ্টি ছিলো ক্লাবকক্ষের চারদিকে। ওদিকে ডাইনিং হলে লোকগুলো বেশ মাতাল হয়ে পড়েছে, ওদের কথাবার্তা এখন আর চাপা নেই, জড়িত গলায় স্পষ্টভাবে আলাপ হচ্ছিলো।
যুবতীদ্বয়ের একজন তখন বনহুরের পাশে, আর একজন তখনও ঐ মাতাল লোকগুলোর মনঃতুষ্টি সাধন করে চলেছে। আর অবিরত সিগারেট থেকে ধুম্র নির্গত করে চলেছিলো সে।
যে যুবতীটি এখন বনহুরের পাশে, তার সঙ্গে বনহুরের প্রথম দিন লাবলীং ক্লাবে দেখা হয়েছিলো কিন্তু সেদিন বনহুরের মুখে ছিলো চাপদাড়ি আর বড় বড় গোঁফ, মাথায় পাগড়ি। আজ বনহুর সাধারণ ড্রেসে এসেছে। যুবতীটি যদিও তাকে চিনতে পারছে না কিন্তু সে তাকে চিনতে পেরেছে।
যুবতী বলে উঠলো–মাই ডিয়ার ফ্রেণ্ড, তুমি মোটেই খাচ্ছো না কেন?
বনহুরের দৃষ্টি যদিও ফিরে এলো যুবতীর মুখে কিন্তু তার কান সজাগ রইলো। বললো বনহুর–অনেক খেয়েছি আর নয়।
উঁ হুঁ হবে না, আমার হাতে আর একটু খাও…যুবতী কাঁচপাত্রটা আবার তুলে ধরলো বনহুরের মুখের সামনে।
বনহুর কাঁচপাত্রটা হাতে নিলো, তারপর বললো–ঐ দেখ কি সুন্দর আকাশ!
যুবতী পাশের জানালা দিয়ে তাকালো জোছনা প্লাবিত আকাশের দিকে।
বনহুর দ্রুতহস্তে কাঁচপাত্র থেকে মদটুকু ফেলে দিলো পাশের ফুলদানীতে। খালি কাঁচপাত্রটা মুখের কাছে নিয়ে বললো,–চমৎকার!
যুবতী এবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো বনহুরের মুখে।
বনহুর খালি কাঁচপাত্রটা রাখলো টেবিলে।
এমন সময় লাবলীং ক্লাবের ম্যানেজার সে স্থানে উপস্থিত হলো। বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো তার। বনহুরের চিনতে বিলম্ব হলো না, এর সঙ্গে পূর্বের ঐ দিন সাক্ষাৎ হয়েছে। ধীরেনচরণের দক্ষিণ হস্ত এ শয়তান। বনহুর বিশ্বাস করেছিলো, লাবলীং ক্লাবের ম্যানেজার মিঃ মাহমুদ রিজভীকে, কিন্তু তার আসল রূপ উদঘাটন হয়ে গেছে বনহুরের কাছে। লাবলীং ক্লাব আর গুলশান ক্লাবের মধ্যে রয়েছে ভীষণ এক রহস্যময় যোগাযোগ। অত্যন্ত জঘন্য আর অপ্রীতিকর এ দুটি ক্লাব। বনহুর এ দুটি ক্লাবের ধ্বংস কামনা করে। এখানে দিনের পর দিন কত সচ্চরিত্র ব্যক্তি তাদের জীবনকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে! কত সতী নারী বিসর্জন দিচ্ছে তাদের মহামূল্যবান ইজ্জৎ। আজ কদিন ধরে বনহুর নিজে উপলব্ধি করে চলেছে এসব ক্লাবের পরিবেশ। ঘৃণায় বিতৃষ্ণায় তার মন বিষিয়ে উঠেছে, তার বিবেক বাধা দিয়েছে এখানে আসতে কিন্তু না এসে উপায় নেই। লুসীকে তার উদ্ধার করতে হবে আর সায়েস্তা করতে হবে এ সব ক্লাবের শয়তান দুষ্ট বদমায়েশদের! বনহুর এদের ক্ষমা করবে না কিছুতেই।
