বনহুর কান পেতে শুনতে চেষ্টা করলো।
কক্ষমধ্য থেকে আর কোনোরকম সাড়া এলো না।
কিছুক্ষণ ধৈৰ্য্য সহকারে দাঁড়ালো বনহুর, তারপর পিছন দিকের জানালার কপাট খুলে সন্তর্পণে প্রবেশ করলো ভিতরে। কক্ষমধ্যে কোনোরকম আলো নেই, জমাট অন্ধকার কক্ষটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বনহুর সুইচ টিপতেই বিস্ময়ে চমকে উঠলো–বিছানা শূন্য, মিঃ মাহমুদ রিজভী কক্ষে নেই। অথচ কক্ষের চারদিকে দরজা ভালোভাবে বন্ধ। অবাক হলো বনহুর, তার মনে একটা রহস্য দানা বেঁধে উঠলো। নিপুণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলো চারদিকে লক্ষ্য করে।
কিন্তু মধ্যে কোথাও কোনো ফাঁকা বা ছিদ্রপথ নেই। মিঃ মাহমুদ রিজভী গেলো কোথায়! অনেক অন্বেষণ করেও কোনো সন্ধান পেলো না বনহুর, তার চোখে কোনোরকম সন্দেহজনক কিছু পরিলক্ষিত হলো না।
বনহুর যখন গভীরভাবে চিন্তা করছে ঠিক তখন পুনরায় সে শব্দ শুনতে পেলো সে, অদ্ভুত কড় কড় শব্দ। কোনো কপাট বা লৌহদরজা খুলে যাওয়ার মত শব্দ হলো যেন।
বনহুর দ্রুত একটা আলমারীর পাশে আত্মগোপন করে দাঁড়ালো কিন্তু দৃষ্টি তার রইলো কক্ষের সর্বত্র।
হঠাৎ বনহুর দেখলো–কক্ষের মেঝের একটা জায়গা ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। এবং শব্দটা ঐ স্থান থেকেই বের হচ্ছে। কর্কশ কড় কড় শব্দ। শব্দটা খুব বেশি জোরে হচ্ছেনা যদিও, তবু বেশ শোনা যাচ্ছে।
আরও বিস্মিত হলো বনহুর–মেঝেতে সুন্দর একটি সুড়ঙ্গপথ বেরিয়ে এলো এবং সে সুড়ঙ্গমুখে দেখা গেলো গুলশান হোটেলের ম্যানেজার মিঃ মাহমুদ রিজভীকে। আরও অবাক হলো যে, মাহমুদ রিজভীর মুখে এখন কোনো দাড়ি-গোঁফ নেই।
বনহুর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো, কোনোরকম শব্দ না করে। মিঃ রিজভী সুড়ঙ্গমুখ থেকে বেরিয়ে দেয়ালে টাংগানো একখানা ছবির পাশে এসে দাঁড়ালেন। ছবিটা কোনো কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো বা ঐ ধরনের নয়। দেয়ালের গায়ে পাথরে খোদাই করা যেন মূর্তি। মিঃ রিজভী সে মূর্তির গায়ে হাত দিয়ে চাপ দিতে লাগলো, অমনি সে কড় কড় শব্দ শোনা গেলো। তাকিয়ে দেখলো বনহুর–মেঝের সে সুড়ঙ্গমুখটা মিশে গেছে। একেবারে।
মিঃ রিজভী এবার পূর্বের ন্যায় মুখে দাড়ি গোঁফ পরে নিয়ে চেয়ারে এসে বসলেন। রিসিভার হাতে তুলে নিয়ে ফোন করলেন নাইন নাইন, জিরো জিরো ফাইভ ওয়ান লাবলীং ক্লাব।
বনহুর রুদ্ধ নিশ্বাসে মিঃ মাহমুদ রিজভীর কার্যকলাপ লক্ষ্য করে চললো। আশ্চর্য হলো–বিশেষ করে মিঃ রিজভীকে সে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে এসেছে। এমন সরল-সহজ মানুষটির মধ্যেও লুকায়ে আছে এত বড় রহস্যময় জীবন। বনহুর ধৈর্যসহকারে শুনতে লাগলো কি কথাবার্তা হয় জানার জন্য উন্মুখ হয়ে রইলো সে।
এবার মিঃ রিজভী কাকে যেন সম্বোধন করে বললেন–তোমার কথামতই আমি কাজ করে চলেছি। মেয়েটিকে কিছুতেই বাগে আনতে পারছি না। তবে আর দুই তিন দিনের মধ্যে সে রাজি হবে বলে মনে করছি। তাকে অত্যন্ত সাবধানে রেখেছি। না না, কেউ টের পাবেনা–সে আমার এখানে আছে। হাঁ, সে অনেক। রাতে ফিরে এসেছে। জানিনা সে কোথায় গিয়েছিলো। হয়তো লুসীর সন্ধানে…হ্যালো, হ আমি ওকে একটু বুঝতে দেবো না। লুসীকে এখান থেকে সরানোর পূর্বেই ওকে আমি খতম করে ফেলবো। কিন্তু মনে রেখো লুসী শুধু তোমারই হবেনা আমারও…কথা যেন মনে থাকে বুঝেছো…
বনহুর দাঁতে অধর দংশন করছিলো, এ মুহূর্তে শয়তান রিজভীকে যমালয়ে পাঠাতে পারে সে কিন্তু এতো দ্রুত সে কারো ক্ষতি করতে রাজি নয়। মিঃ রিজভীকে সে এতোদিন সম্মান করে এসেছে শ্রদ্ধাও করেছে। বনহুর–কারণ তার ব্যবহারে মুগ্ধ ছিলো সে। আজ মিঃ রিজভীর মুখের খোলস উম্মোচিত হয়ে গেলো। বিশেষ করে লুসীর সন্ধান পেয়ে তৃপ্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলো।
মিঃ রিজভী এবার রিসিভার রেখে শয্যায় এসে শয়ন করলো চাদরখানা টেনে দিলেন সমস্ত দেহে।
বনহুর তখনও দাঁড়িয়ে রইলো নিশ্চুপ পাথরের মূর্তির মত। মিঃ রিজভী হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন।
বনহুর পাশের আলমারীতে টোকা দিয়ে একটু শব্দ করলো। কোনো সাড়াশব্দ করলেন না মিঃ রিজভী।
বনহুর যে পথে এসেছিলো সে পথে বেরিয়ে গেলো সন্তর্পণে।
সোজা সে নিজের ক্যাবিনে গিয়ে শয্যা গ্রহণ করলো। লুসীর সন্ধানে বনহুর দিল্লীর কত স্থানই না সন্ধান করে ফিরেছে, তবু লুসীর খোঁজ পায়নি। আজ বনহুর কথাটা ভেবে নিজেই অবাক হলো–দস্যু বনহুরের চো খেও থোকা লাগিয়েছে মিঃ রিজভী! লুসী তারই হোটেলের কোনো এক গোপনকক্ষে বন্দিনী রয়েছে।
বনহুর মিঃ রিজভীকে খতম করে আজই লুসীকে উদ্ধার করতে পারে কিন্তু তা সে করবে না। এ ব্যাপারে শুধু মিঃ রিজভীই নয়, এমন একটা দল এর সঙ্গে জড়িত আছে যা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে ফেলতে হবে। তবেই তার স্বস্তি। এখন বনহুরের উদ্দেশ্য শুধু লুসীকে উদ্ধারই নয়–লুসীর হরণকারী দলকে শায়েস্তা করা।
*
পরদিন চায়ের টেবিলে মিঃ রিজভীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো বনহুরের। যেন কত সরল-সহজ-সুন্দর মানুষটি। মিঃ রিজভীকে দেখলে মনেই হয় না–তিনি একজন সত্যিকারের শয়তান।
বনহুর চায়ের কাপটা মিঃ রিজভীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো–সুপ্রভাত মিঃ রিজভী।
মিঃ রিজভী বনহুরের আচরণে একটু আশ্চর্য হয়ে অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করলেন–সুপ্রভাত। একটু থেমে। পুনরায় বললেন–আমার সম্মুখে আমার চা আছে। আপনি খান মিঃ আলম।
