মিঃ মাহমুদ যতই বারণ করুন বনহুর গোপনে বেরিয়ে পড়লো–লুসীর সন্ধান তাকে করতেই হবে। ছদ্মবেশ ধারণ করলো বনহুর। মুখে চাপদাড়ি, মাথায় পাগড়ি, গায়ে শেরওয়ানী, পায়ে নাগরা। এক্কা ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে হাজির হলো লাবলীং ক্লাবে।
নতুন আগন্তুকের আগমনে ক্লাবের ম্যানেজার স্বয়ং এলেন তাকে অভ্যর্থনা জানাতে। বনহুরকে দিল্লীর কোনো উচ্চ সম্ভ্রান্ত মহাজন বলে মনে করলেন তারা।
সসম্মানে নিয়ে বসালেন, নানারকম খাদ্যদ্রব্য আর পানীয় এলো বনহুরের সামনে। চললো নাচগান আর বাদ্যযন্ত্রের ঐক্যতান। সুন্দরী নর্তকীদের নাচ হলো, তারপর শুরু হলো খাবার পালা। একবার একটি তরুণীর ইংলিশ ড্যান্স চললো। ডায়াসে তখন অর্কেস্ট্রার পরিবর্তে ইংলিশ বাজনা বাজতে শুরু করেছে।
সারাব পান করা অভ্যাস নয় বনহুরের। সে যখন খাবার ভক্ষণ করছিলো সে ফাঁকে সারাব-পাত্র পাশের ফুলদানীতে উজার করে দিচ্ছিলো। এতো সতর্কতার সঙ্গে বনহুর অভিনয় করে চললো, সে যেন সত্যি সত্যি মদের নেশায় চুর চুর হয়ে গেছে।
মাঝে মাঝে নর্তকীরা তার কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরছিলো। বনহুর জড়িত কণ্ঠে তাদের সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে চলেছে। যেন সে একজন পাকা সারাবী।
তারপর বনহুর বিদায় নিলো যখন, তখন এক বাণ্ডিল নোট ম্যানেজারের হাতে তুলে দিয়ে টলতে টলতে তার এক্কা ঘোড়ার গাড়িতে এসে বসলো।
সেদিনের মত ফিরে এলো বনহুর গুলশান হোটেলে।
সকলের অলক্ষ্যে সে প্রবেশ করলো তার ক্যাবিনে। কিন্তু কক্ষে প্রবেশ করতেই চমকে উঠলো–মিঃ মাহমুদ রিজভী স্বয়ং বসে আছে একটা সোফায়।
মুখে চাপদাড়ি, মাথায় পাগড়ি, গায়ে শেরওয়ানী, পায়ে জরির নাগরা–এসব দেখে বনহুরকে চিনতে পারলেন না তিনি। সসম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন মিঃ রিজভী–আপনার পরিচয়? আপনি কি মিঃ আলমের সঙ্গে…
হঠাৎ ভড়কে যাবার লোক বনহুর নয়, চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো–মিঃ আলম আমার আত্নীয়। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। আমার পরিচয়, আমি দিল্লীর একজন স্থায়ী বাসিন্দা। নাম জিল্লুর আলী রিজভী।
কি বললেন, হাঁ ঐ নাম আমি ইতি পূর্বে শুনেছি। তশরিফ রাখুন।
বসলো বনহুর। নতুন এক ফ্যাসাদে পড়লো সে। নিজের কক্ষে নিজেই সে মেহমান!
মিঃ মাহমুদ বললেন–নিতান্ত কোনো কাজেই আপনি এসেছেন নিশ্চয়ই। কিন্তু মিঃ আলম সে যে বিকেলে বেড়িয়েছেন এতক্ষণও তার ফিরবার কোনো লক্ষণ নেই। আপনাকে কিছুক্ষণ বসতে হবে বলে মনে হচ্ছে।
তা আমি তো বেশি বিলম্ব করতে পারবো না।
তা কি হয়, এসেছেন যখন তখন তার সঙ্গে দেখা না করে যাবেন কি করে। আপনি বসুন, আমি নাস্তার জন্য বলি?
না না, তা আমি আজ যাই, আবার কাল হয়তো আসতে হবে।
আপনাকে ছাড়লে তবে তো যাবেন! কলিংবেল টিপলেন মিঃ মাহমুদ।
বয় এলো।
মিঃ মাহমুদ নাস্তার অর্ডার দিলেন।
বনহুর ফ্যাসাদে পড়লো।
অল্পক্ষণ পর নানারকম খাবার এলো।
মিঃ মাহমুদ রিজভী নিজে পরিবেশন করে খাওয়ালেন। বললেন–আপনি আমার হোটেলের বাসিন্দার অতিথি। আপনার সম্মান আমি যদি না করবো তা হলে করবে কে। উনি এসে যদি জানতে পারেন, তার অতিথির অনাদর করা হয়েছে তাহলে তিনি কি মনে করবেন বলুন তো? কাজেই আপনাকে খেতে হবে।
বাধ্য হলো বনহুর খেতে।
খাবার পর বনহুর বিদায় চাইলো।
মিঃ মাহমুদ বললেন–আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন, এ এলেন বলে।
বনহুর জানে–আর কিছুক্ষণ কেন, গোটারাত অপেক্ষা করলেও মিঃ আলম আসবেন না। আলম যে সে জিল্লুর রিজভী–স্বয়ং দস্যু বনহুর।
রাত বেড়ে আসছে, মুখে একরাশ দাড়ি-গোঁফ লাগিয়ে আর কতোক্ষণ থাকবে বনহুর, এবার সে মিঃ মাহমুদ রিজভীর কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
তারপর ছদ্মবেশ পরিবর্তন করে ফিরে এলো অধঘন্টা পরে।
মিঃ মাহমুদ রেজভী শশব্যস্তে জানালেন–মিঃ আলম, আপনি এতোক্ষণে এলেন!
কেন? অবাক হয়ে বললো যেন বনহুর।
মিঃ মাহমুদ বললেন–আপনার সঙ্গে জনাব জিল্লুর আলী রিজভী সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। এতোক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন কিন্তু দুঃখের বিষয়, আপনি বড় বিলম্ব করে ফেলেছেন ফিরতে।
একটা কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম, তাই ফিরতে বিলম্ব হলো।
হাতঘড়ি দেখেন মিঃ মাহমুদ–এবার খানা খেয়ে শুয়ে পড়ুন। জনাব জিলুর রিজভী কাল আসবেন বলে গেছেন।
বয় তারপর খাবার নিয়ে এলো; বিপদে পড়লো বনহুর–খাবে কি করে সে! কিছুক্ষণ পূর্বে যে খাওয়া সে খেয়েছে, এরপর আর খাওয়া যায় না!
বনহুর কোনোরকমে চারটি মুখে দিয়ে শুয়ে পড়লো। লুসীর জন্য বড় অস্বস্তি বোধ করছিলো সে, না জানি। ওকে কোথায় নিয়ে গিয়েছে। লুসীর করুণ মুখখানা ভাসছে তার চোখের সামনে।
শয়তান ধীরেনচরণকে এ দিল্লী শহরে খুঁজে বের করা যদিও কঠিন হবে, তবু যেমন করে হোক তাকে বের করতেই হবে। লুসীকে উদ্ধার করে পৌঁছে দিতে হবে তার পিতার কাছে।
বনহুর শয্যা গ্রহণ করলো বটে কিন্তু ঘুমাতে পারলো না। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ শুয়ে থাকার পর শয্যা ত্যাগ করে নেমে দাঁড়ালো। সম্পূর্ণ জমকালো ড্রেসে সজ্জিত হয়ে হোটেলের পিছন সিঁড়ি বেয়ে প্রবেশ করলো হোটেলকক্ষে। হোটেলের পাশ কেটে আর একটি সিঁড়ি উঠে গেছে ম্যানেজার মিঃ মাহমুদ রিজভীর কামরার দিকে। বনহুর সে পথেই দ্রুত উঠে গেলো উপরে। মিঃ রিজভীর দরজার পাশে এসে দাঁড়ালো বনহুর। হঠাৎ তার কানে এলো একটি কড় কড় শব্দ। বনহুর জানালার পাশে উঁকি দিলো কিন্তু কিছুই নজরে পড়লো না। এবার শব্দটা আর শোনা যাচ্ছে না।
