মিঃ মাহমুদ বললেন–বেশ কিছুদিন পূর্বে লেবাননে গিয়েছিলাম কোনো কাজে। তখন লেবানন পত্রিকায় দস্যু বনহুর সম্বন্ধে আমি জ্ঞাত হয়েছি। তার অসাধ্য কিছু নেই।
দস্যু বনহুর! আমি কিন্তু তার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। এর পূর্বে আমি তার নাম শুনেছি বলে মনে হয় না।
মিঃ মাহমুদ দস্যু বনহুরের কার্যকলাপ সম্বন্ধে যা জানতেন বর্ণনা করে শোনালেন বনহুরের নিকটে।
বনহুর মনে মনে হাসলেও মুখোভাবে বার বার অবাক হবার অভিনয় করলো।
লুসীও বেশ ভড়কে গেছে, দস্যু বনহুরের নাম সে শোনেনি কোনোদিন। আজ নতুন করে এ নাম সে শুনলো। এক সময় বললো–মিঃ আলম, চলুন আমরা দিল্লী ত্যাগ করে চলে যাই!
অবাক হয়ে বললো বনহুর–এতো তাড়াহুড়ো করছো কেন লুসী?
দস্যু বনহুরের জন্য আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। না জানি সে কত বড় ভয়ঙ্কর দস্যু!
হোক সে ভয়ঙ্কর, তোমার তো সে কোনো ক্ষতি করেনি লুসী?
ক্ষতি সে করেনি কিন্তু যে দস্যু তার অসাধ্য কি আছে বলুন?
লুসী, দস্যু বনহুর আমার বন্ধু, কাজেই তাকে বলে দেবো তোমার যেন কোনো ক্ষতি না করে।
দস্যু বনহুর আপনার পরিচিত?
শুধু পরিচিতই নয়, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু সে!
আশ্চর্য, একজন দস্যুর সঙ্গে আপনার আন্তরিকতা আছে!
কেন, সেকি মানুষ নয়?
মানুষ হলেও সে দুর্বৃত্ত!
তারও অন্তর আছে লুসী। তাছাড়া আজকের পৃথিবীতে সবাইতো দস্যু, সবাই দুবৃত্ত। ভদ্রতার মুখোশ পরে এক একজন দস্যুর চেয়েও অতি ভয়ঙ্কর মানুষ পৃথিবীতে বসবাস করছে। লোকসমাজ তাদের উপরের খোলস দেখে সাধু ভ্রমে প্রণাম জানাচ্ছে, কিন্তু তারা জানে না–কত সাংঘাতিক সমাজপতিগণ!
ঠিক বলেছেন মিঃ আলম।
লুসী, তুমি নির্ভয়ে থাকবে, দস্যু বনহুর তোমার কেশও স্পর্শ করবে না।
আপনি বলে দেবেন তার সঙ্গে দেখা হলে।
নিশ্চয়ই দেবো। চলো, রাত অনেক হয়েছে–শোবে চলো।
মিস লুসী আর বনহুর শয্যার দিকে এগুলো। বিপদে পড়লো তারা; বিশেষ করে লুসী একটু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
বনহুর বললো–তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও লুসী, আমি জেগে রইবো, দস্যু বনহুর যেন তোমার কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
লুসী শয্যায় শুয়ে পড়লো।
বনহুর সোফায় বসে পত্রিকাটা তুলে নিলো হাতে।
রাত বেড়ে চললো।
বনহুর পত্রিকা রেখে সিগারেট ধরালো। একটির পর একটি নিঃশেষ করে চললো। তারপর এক সময় সোফায় ঠেস দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করলো।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই, হঠাৎ একটা খট খট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো তার। চমকে তাকালো একি, বিছানা শূন্য–লুসী কোথায়? ধরফড় উঠে দাঁড়ালো, চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই দেখলো– দরজা খোলা।
বনহুর দরজার পাশে এসে থমকে দাঁড়ালো। বাইরে মোটর ছাড়ার শব্দ হলো। ছুটে গেলো বনহুর। বেলকুনিতে, দেখলো একটা মডেল কার বেরিয়ে গেলো হোষ্টেল-প্রাঙ্গণ থেকে।
ফিরে এলো বনহুর কক্ষমধ্যে। মন অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। লুসীকে সে আশ্বাস দিয়েছিলো–দস্য বনহুর যাতে তোমার ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য আমি জেগে রইবো। কিন্তু তার আশ্বাস-বাণী রক্ষা করতে পারেনি সে। হঠাৎ নজর পড়লো তার বিছানার দিকে, একখানা ছোট্ট কাগজের টুকরা পড়ে আছে বালিশের। পাশে।
বনহুর এগিয়ে গেলো, কাগজের টুকরাটা হাতে নিতেই দেখলো দুটি লাইন লিখা মিস লুসীকে আমি নিয়ে গেলাম। কারণ, লুসী আমার শিকার। লুসীর অন্বেষণ করা সম্পূর্ণ বৃথা।
ধী…চা…ভৌ।
বনহুর চিঠি পড়ে হেসে উঠলো হাঃ হাঃ করে। তারপর সে চিঠিখানা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিলো।
*
ভোরে প্রতিদিনের মত আজও এলেন মিঃ মাহমুদ রিজভী। বনহুরের কক্ষে প্রবেশ করে বললেন–হ্যালো মিঃ আলম, গুড মর্নিং।
বনহুর মুখোভাব স্বাভাবিক রেখে হেসে বললো–গুড মর্নিং। আসুন মিঃ রিজভী।
মিঃ মাহমুদ রিজভী আসন গ্রহণ করলেন।
বনহুর একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে সিগারেট কেসটা এগিয়ে দিলো মিঃ মাহমুদ রিজভীর দিকে নিন।
মিঃ মাহমুদ একটা সিগারেট তুলে নিলেন।
সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো–বনহুর। নিজের সিগারেট ধরিয়ে মিঃ রিজভীর সিগারেট ধরিয়ে দিলো সে।
মিঃ মাহমুদ বললেন–মিসেস পারভিনকে দেখছি না যে?
হেসে বললো বনহুর–ওর এক আত্নীয়ার বাড়ি বেড়াতে গেছেন।
ও। আপনি বুঝি এখন মুক্ত বিহঙ্গ?
কতকটা তাই।
মিসেস পারভিন ফিরবেন কখন?
আজ বোধ হয় ফিরবেন না! দুচার দিন থাকতেও পারেন সেখানে। মিঃ রিজভী?
বলুন মিঃ আলম?
আজ বিকেলে আপনি আমার সঙ্গে বাইরে যেতে পারেন কি?
কোথায় যাবেন মিঃ আলম?
লাবলীং ক্লাবে।
মিঃ মাহমুদ যেন চমকে উঠলেন, অস্ফুট কণ্ঠে বললেন–লাবলীং ক্লাবে যাবেন আপনি?
ভ্রূকুঞ্চিত করে বললো বনহুর–আপনি যেন কথাটা পছন্দ করলেন না। ব্যাপার কি মিঃ রিজভী?
মিঃ আলম, ও ক্লাব ভদ্রসমাজের জন্য অত্যন্ত অমঙ্গলজনক। তবে হাঁ, লাবলীং ক্লাবে ভদ্রমুখোশধারী ব্যক্তিগণই গিয়ে থাকেন।
কারণ কি জানতে পারি কি?
নিশ্চয়ই পারেন। মিঃ আলম, আপনাকে আমি ভালবেসে ফেলেছি। আপনার সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। আপনার ব্যবহারে আমি সন্তুষ্ট। আমি চাই না আপনার কোনো মন্দ হোক।
বেশ আমি যাবো না।
হ, কোনো সময় আপনি ঐ ক্লাবের ত্রিসীমানায় যাবেন না। বরং অন্য যেখানে খুশি যাবেন।
মিঃ মাহমুদ রিজভী বিদায় গ্রহণ করলেন!
বনহুর পুনরায় সিগারেট ধরালো। ললাটে তার ফুটে উঠলো গভীর চিন্তার ছাপ। বনহুর চিন্তা করছিলো। মিঃ মাহমুদের কথা–লোকটা সত্যি মহৎ ব্যক্তি, না ভিতরে ওর কোনো চক্রান্ত রয়েছে।
