বনহুরও এসে দাঁড়ালো ক্যাবিনের দরজায়। শুনতে পেলো লাবলীং ক্লাবের ম্যানেজারের কণ্ঠে অভ্যর্থনা বাণী। মিসেস বাঞ্ছারাম, পরিচিতা তাঁর। কিছুক্ষণ চাপা স্বরে আলাপ হলো মিসেস বাঞ্ছারাম, ধীরেনচরণ আর লাবলীং ক্লাবের ম্যানেজারের মধ্যে। অতি নিম্ন-কণ্ঠে কথাবার্তা চললো, কাজেই বনহুর বুঝতে পারলো না কিছু।
এবার বিদায় সম্ভাষণের পালা।
বনহুর সতর্কতার সঙ্গে বেরিয়ে এলো লাবলীং ক্লাব থেকে। গাড়িতে বসে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
অল্পক্ষণ পর বেরিয়ে এলো মিসেস বাঞ্ছারাম ও ধীরেনচরণ। ওদিকে গাড়িখানার দিকে এগিয়ে গেলো তারা।
গাড়িখানা চলে যেতেই বনহুর তার গাড়ি থেকে পুনরায় নেমে পড়লো, সোজা প্রবেশ করলো ম্যানেজারের ক্যাবিনে। গাঢ় নীল মখমলের পর্দা ঠেলে এগুতেই ম্যানেজার অবাক কণ্ঠে বললেন–কি চান আপনি!
বনহুর চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিলো, কামরায় একমাত্র ম্যানেজার ছাড়া আর দ্বিতীয় জন ছিল না। ক্লাবের অভ্যন্তর হতে তখন অর্কেস্ট্রার সুর ভেসে আসছে। আরও ভেসে আসছে তরুণ-তরুণীদের উচ্ছল হাসির শব্দ।
বনহুর ম্যানেজারের নিকটে এগিয়ে এসেই রিভলভার চেপে ধরলো তার বুকের কাছে। তারপর গম্ভীর চাপা কণ্ঠে বললো–বলুন এ মুহূর্তে যারা বেরিয়ে গেলো তারা আপনাকে কি বলে গেলো?
কে আপনি?
আমি যে-ই হই, জবাব দিন আমার প্রশ্নের?
এক্ষুণি পুলিশ ডাকবো!
তার পূর্বেই আপনার মৃতদেহ গড়িয়ে পড়বে মেঝেতে। বলুন ওরা কি বলে গেলো? মিথ্যা বলার চেষ্টা করলে মৃত্যু অনিবার্য।
ম্যানেজার এবার ভয় পেয়ে গেলেন, এ অবস্থায় ভয় পাবারই কথা। ম্যানেজারের কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলো বনহুর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে। তবু দমবার লোক নন পাকা লোক ম্যানেজার; বললেন–যারা এমাত্র বেরিয়ে গেলো তারা আমার আত্মীয় এবং আমার সঙ্গে তাদের পারিবারিক আলাপ-আলোচনা হয়েছে।
আমি জানি তারা কে। তাদের পরিচয় আমার অজ্ঞাত নেই। এবং যা তারা বলছে তাও আমি জানি। কিন্তু জানো, যার সর্বনাশ তোমরা করতে চাইছো সে এখন আমার হাতের মুঠায়?
মিস লুসী তোমার হাতের মুঠায়? সে তোমার কাছে আছে?
হাঁ।
কে তুমি?
দস্যু বনহুর!
বিস্ময়ভরা অস্ফুটে ধ্বনি করে উঠলো ম্যানেজার দস্যু বনহুর! দক্ষিণ পশ্চিম কান্দাই অঞ্চলের দুর্ধর্ষ দস্যু….
হাঁ, আমিই সে!
ম্যানেজারের মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো। তাকালেন সে বনহুরের হস্তস্থিত রিভলভারখানার দিকে। বনহুর এবার কঠিন কণ্ঠে বললো–বলবে যা আমি জানতে চাইলাম?
ম্যানেজারের কণ্ঠ বাকহীন হয়ে পড়েছিলো, তিনি তখন ভেবে চলেছেন–সুদূর কান্দাই-এর দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল থেকে দস্যু বনহুর দিল্লী শহরে এলো কি করে! দস্যু বনহুরের নাম তিনি শুনেছেন, আরও শুনেছেন কি ভয়ঙ্কর দুর্দান্ত দস্যু সে।
ম্যানেজারকে ভাবতে দেখে বললো বনহুর কি ভাবছো? যাক আজ তোমাকে রেহাই দিলাম, কিন্তু মনে রেখো–মিস লুসীর কোনো ক্ষতি করেছে তখনই তোমার মৃত্যু হবে।
বনহুর আর বিলম্ব না করে বেরিয়ে গেলো জানালার শাশী খুলে পিছন পথ দিয়ে।
পরক্ষণেই বনহুর লাফিয়ে পড়লো রাস্তায়, সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে চেপে বসলো।
ততক্ষণে ম্যানেজার দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন ক্লাবঘরের মধ্যে, চিৎকার শুরু করে দেন–দস্যু দস্যু, ডাকু ডাকু…
সঙ্গে সঙ্গে ডায়াসে অর্কেস্ট্রা বাদ্য থেমে যায়, আরও থেমে যায় ডাইনিং হলের তরুণ-তরুণীর কলকণ্ঠে হাস্যধ্বনি। ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়ে ক্লাবকক্ষ। কিন্তু পর মুহূর্তেই একটা হট্টগোল শুরু হয়–কোন্ দিকে কে পালাতে থাকে তার ঠিক নেই।
ম্যানেজার রিসিভার তুলে নেন হাতে–হ্যালো পুলিশ পুলিশ, দস্যু বনহুরের আবির্ভাব ঘটেছে আমার লাবলীং ক্লাবে…শীঘ্র চলে আসুন।
অল্পক্ষণে পুলিশ চলে এলো, সমস্ত ক্লাব তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো কিন্তু দস্যু বা ডাকুর কোনো সন্ধান। পাওয়া গেলো না।
লাবলীং ক্লাবে একটা ভীতিকর থমথমে ভাব জেগে উঠলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্লাব জনশূন্য হয়ে পড়লো। পুলিশ অনেক সন্ধান নিয়েও দস্যুকে আবিস্কারে সক্ষম হলো না।
ম্যানেজারের মুখে সমস্ত শুনে দিল্লী পুলিশ ইন্সপেক্টর ডায়রী লিখে নিলেন।
*
বনহুর ইচ্ছে করেই ম্যানেজারের নিকটে তার আসল পরিচয় দিয়েছিলো। পরদিন দস্যু বনহুরের আবির্ভাব সংবাদ প্রচার হলো। কাগজে কাগজে দিল্লীর বুকে জাগলো এক ভীতিকর আতঙ্ক। এ দেশের অনেকেই দস্যু বনহুরের নামের সঙ্গে তেমন করে পরিচিত ছিলো না। এবার সবাই বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। দস্যু বনহুর সম্বন্ধে নানা পত্রিকায় বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করলো।
দিল্লীর লোকজনের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো সংবাদটা শহর থেকে শহরতলী পর্যন্ত।
হোটেল-রেষ্টুরেন্টে, ক্লাবে, পথে-ঘাটে সর্বস্থানে সবার মুখে মুখে ঐ এক কথা–সুদুর কান্দাই শহর থেকে দস্যু বনহুরের দিল্লী আগমন।
বনহুর সেদিন গুলশানে বসে মিঃ মাহমুদ রিজভীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছে। তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্নভাবে বললেন–মিঃ আলম, অদ্ভুত সংবাদ, কান্দাই দেশ থেকে দস্যু বনহুর আমাদের দিল্লীতে আগমন করেছে।
আমিও পত্রিকায় সে রকম সংবাদ দেখলাম। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না একথা।
কারণ? বললেন মিঃ মাহমুদ রিজভী।
বললো বনহুর–কারণ কান্দাই দেশ ভারত থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে। সে দেশ থেকে এদেশে সে আসবে কি করে।
