বনহুর এবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো, সৈনিকগণ যেখানে থাকতে বা বিশ্রাম করতে! ছোট ছোট অনেকগুলো কামরা। এগুলোতে সৈনিকগণ কি করতো ঠিক বোঝা গেলো না। ওদিকে তাকাতেই দেখলো দুর্গের মধ্যে সারি সারি কামান খাড়া করা রয়েছে। কামানের মুখগুলো সব বাইরে। মাটি ভেদ করে উঠে গেছে উপরে। কিন্তু উপরে কামানের মুখ–টের পাবার জো নেই। কৌশলে বসানো হয়েছে কামানগুলো। শত্রুর আগমন জানতে পারলেই সম্রাটের আদেশে এ সব কামান গর্জে উঠতো। আজ অবশ্য কামানগুলো সম্পূর্ণ অকেজোভাবে রয়েছে।
বনহুর আরও কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলো। কত পুরানের স্মৃতি ভাসতে লাগলো তার চোখের সম্মুখে। দিল্লী-দুর্গ দেখা শেষ করে বনহুর উঠে এলো উপরে। হাতঘড়িটা দেখে নিলো, তারপর গাড়িতে এসে বসলো।
মতি মসজিদ, কতুবমিনার দেখা শেষ করে বনহুর আগ্রার গেটে এসে গাড়ি রাখলো, প্রথমেই তার নজরে পড়লো কঠিন পাথরে তৈরি বিরাট ঘোড়ার মূর্তি। সামনের দু’খানা পা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই সুউচ্চ প্রাচীর, যার উপর থেকে ঘোড়া নিয়ে লাফিয়ে পড়েছিলো অমর সিংহ। এখানের প্রধান গেটের নাম অমরসিংহ গেট। দিল্লী দুর্গের চেয়ে এ দুর্গটি আরও বড়। এ দুর্গ তৈরি করেছিলেন সম্রাট আকবর। ভিতরে প্রবেশ করে দেখলো নানারকম প্রকোষ্ঠ। দেওয়ানই খাস মহল, সম্রাটের আরামখানা। বেগম মহল, বেগমদের গোসলখানা। প্রত্যেকটা কক্ষে এক কালে মণি-মুক্তা-হীরা খচিত ছিলো, আজ আর সে সব নেই।
শাহজাহানকে যে কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো সেখানে গিয়ে বনহুর কিছুক্ষণ মৌন রইলো। তারপর গেলো উপরে, যেখানে দাঁড়িয়ে একদিন বলেছিলেন বৃদ্ধ শাহজাহান তার আদরিণী কন্যা জাহানারাকে, মা জাহানারা এখান থেকে লাফিয়ে পড়ে মরবো মা?
জাহানারা পিতাকে আঁকড়ে ধরে বলেছিলো–বাবা, আত্মহত্যা করা যে মহাপাপ।
বনহুরের কানে যেন আজ জাহানারার কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি জাগলো। শুনতে পেলো বৃদ্ধ শাহজাহানের কম্পিত কণ্ঠ।
চিরকুমারী জাহানারার কবর দেখলো, কোনোরকম সাজসজ্জা বা আড়ম্বড়ের বালাই নেই। শ্যামল দুর্বা ঘাসে আচ্ছাদিত কবরের বক্ষস্থল। শিয়রে একখণ্ড শীলা, তাতে লিখা রয়েছে জাহানারার হৃদয়ের কথা, তার অন্তরের বাণী।
তারপর বনহুর দিল্লীর শ্রেষ্ঠ আউলিয়া “চেরাগে দেহেলি” নিজাম উদ্দিনের গোর জিয়ারৎ করলো।
এবার ফিরে চললো সে, অনেক দেখেছে আজ আর নয়। লুসী হয়তো তার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে।
নিজাম উদ্দিনের মাজার থেকে গাড়ি নিয়ে বনহুর সোজা চললো হোটেল গুলশানের দিকে।
আজ একদিনে বনহুর অনেক কিছু পথঘাট সব চিনে নিলো, চিনে নিলো বড় বড় নামকরা জায়গাগুলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, বনহুরের গাড়িখানা তখন লাবলীং ক্লাবের সম্মুখপথ দিয়ে চলছিলো। বনহুরের দৃষ্টি আর্কষণ করলো লাবলীং ক্লাবের চোখ ঝলসানো আলোকসজ্জা।
বনহুর ব্যাক করে গাড়িখানা এনে রাখলো লাবলীং ক্লাবের সম্মুখে। নেমে পড়লো সে, ক্লাবে প্রবেশ করতেই অর্কেস্ট্রার সুর তার কানে এসে পৌঁছলো। বনহুর ক্লাবের ভিতরে প্রবেশ করে একটা টেবিলের পাশে বসে পড়লো।
এ ক্লাবটি শুধুমাত্র বিদেশীদের জন্য। দিল্লীর অধিবাসিদেরকে এ ক্লাবে কমই দেখতে পেলো বনহুর। বাঙালির সংখ্যা নেহাৎ কম নয়।
ডায়াসে তখন যন্ত্রসংগীতের ঐক্যতান একটানা বেজে চলেছে। উজ্জ্বল তীব্র আলোকে আলোকিত ক্লাবকক্ষ। ওদিকে ডাইনিং হলটি গমগম করছে। অভিজাত সম্প্রদায়ের সুবেশধারী নানা বয়সী নর-নারী সরগরম করে তুলেছে স্থানটি।
বনহুর একটা সিগারেট ধরালো। দৃষ্টি তার ক্লাবকক্ষের চারদিকে সতর্কভাবে ঘুরে ফিরছে। বয় এসে দাঁড়াতেই খাবারের অর্ডার দিলো, লাবলীং হোটেলের সুস্বাদু খাবারের লোভ বনহুর ত্যাগ করতে পারলো না, তাছাড়া ক্ষুধায় পেটের নাড়ি চো চো করছিলো তার।
খাবার এলো, তার সঙ্গে এলো মাংস আর মদ।
বনহুর খেতে শুরু করলো।
ওদিকে ডাইনিং হলের টেবিলে ছুরি-কাঁটা-চামচের ঠুং ঠাং শব্দের সঙ্গে চলেছে নানা রকম হাসিগল্পের ফুলঝুরি। তার সঙ্গে ভেসে আসছে বিলেতী মদের তীব্র গন্ধ, আর অভিজাত সম্প্রদায়ের নর-নারী দেহের প্রসাধনীর সুবাস।
বনহুর খেতে বসে লক্ষ্য করছিলো এসব নর-নারীদেরকে এবং কান পেতে শুনছিলো তাদের আলাপ আলোচনা।
হঠাৎ একটা হাসির শব্দে বনহুর ফিরে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতখানা থেমে গেল মাঝপথে। প্রায় অর্ধ-উলঙ্গ একটা যুবতী একটি পুরুষের কণ্ঠ বেষ্ঠন করে হাসির ঝঙ্কার তুলেছে। উভয়ের হস্তে সুরার পাত্র। যুবতীর দিকে চোখ পড়তেই দৃষ্টি নত করে নিলো। কিন্তু নিজের অজ্ঞাতেই আবার তার চোখ দুটো ফিরে গেলো নগ্ন তরুণীর দিকে।
লোকটা তখন তরুণীর কণ্ঠ বেষ্টন করে ওর গণ্ডে চুম্বন দিয়ে চলেছে। যুবতীও প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছে ঠিকভাবে। ঘৃণায় নাসিকা কুঞ্চিত হলো বনহুরের।
বনহুর বিল চুকিয়ে দিয়ে যেমন উঠতে যাবে অমনি দেখলো ক্লাবকক্ষে প্রবেশ করলো মিসেস বাঞ্ছারাম– তার সঙ্গে রয়েছে সে শয়তান ধীরেনচরণ!
বনহুর দ্রুত মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালো, যাতে তাকে দেখে না ফেলে ওরা। আত্মগোপন করে একটা থামের। আড়ালে ঠেশ দিয়ে দাঁড়ালো বনহুর।
মিসেস বাঞ্ছারাম ও ধীরেনচরণ চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এগিয়ে গেলো হোটেলের ম্যানেজারের ক্যাবিনের দিকে।
