হা মিঃ আলম। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো, বয় প্রবেশ করলো কক্ষে, বললো স্যার, ম্যানেজারবাবু আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন।
আসতে বলো। বললো বনহুর।
বেরিয়ে গেলো বয়।
বনহুর বললোলুসী, এবার আমাদের অভিনয় করতে হবে। কারণ, এখানে আমরা স্বামী-স্ত্রী, বুঝলে।
ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানালো লুসী।
ম্যানেজার কক্ষে প্রবেশ করতেই লুসী মাথায় কাপড় তুলে দিলো।
বনহুর উঠে অভ্যর্থনা জানালো তাকে।
ম্যানেজার মাহমুদ রিজভী অত্যন্ত ভদ্র এবং অমায়িক লোক। এভোবড় একটা হোটেলের কর্মকর্তা হলেও তিনি মিশুক লোক। আসন গ্রহণ করে বললেন মিঃ মাহমুদ–আপনার স্ত্রী কেমন আছেন আজ?
বনহুর বললো–ভালো আছেন। সত্যি, আপনি যা উপকার করেছেন সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ।
না না, এমন আর কি করেছি, যা করেছি সে তো আমার কর্তব্য।
আমার ড্রাইভারের নিকটে আপনার অনেক প্রশংসা শুনলাম। ঐ মুহূর্ত আপনি যা করেছেন তা আপনার কর্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি করেছেন।
হাঁ, উনি না হলে আমার কি যে হত! ওনার সহায়তা আমাকে সুস্থ করে তুলতে সক্ষম হয়েছে, বললো। মিস লুসী।
মিঃ মাহমুদ বললেন–ছিঃ ছিঃ বেশি বাড়িয়ে বলেছেন মিসেস পারভিন বেগম। আপনারা বিদেশী, আপনাদের সেবা করাই আমাদের কাজ। এখানে আপনাদের কোনোরূপ অসুবিধা হবে না।
আরও কিছু সময় গল্প-সল্প করার পর চলে গেলেন মিঃ মাহমুদ রিজভী।
এবার লুসী বললো–বড় হাপিয়ে পড়েছিলাম কিন্তু?
এরি মধ্যে হাঁপিয়ে পড়েছিলে লুসী? আরও অনেক বাকী। লুসী, আমাকে একবার এক্ষুণি বেরুতে হবে, তুমি সাবধানে থাকবে।
কোথায় যাবেন এখন?
বাইরে, কিন্তু কোথায় যাবো সঠিক বলতে পারছি না।
আমার কিন্তু ভয় করছে।
সাবধানে থেকো, আমি বাইরে বেশিক্ষণ বিলম্ব করবো না।
মিঃ আলম!
আস্তে বল–কারণ বাংলাদেশের মেয়েরা স্বামীকে এভাবে সম্বোধন করে না।
লজ্জিত হলো লুসী, বললো সে–আমিও যাবো আপনার সঙ্গে!
না, তা হয় না লুসী, আমি কোথায় যাবো ঠিক নেই কি না।
লুসী আর কোনো কথা বললো না।
বনহুর লুসীর দিকে একবার তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বেরিয়ে গেলো।
*
বনহুর ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
এ ট্যাক্সিখানা সে আজই ক্রয় করেছে। নতুন ঝকঝকে কুইন কার! বনহুর এ-পথ সে-পথ কিছু সময় ঘুরে বেড়ালো। বিশেষ করে দিল্লী শহরটা তার ভালোভাবে জানা নিতান্ত দরকার হয়ে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ বনহুর ঘুরে বেড়ালো শহরের বিভিন্ন স্থানে।
দিল্লীদুর্গের সম্মুখে এসে গাড়ি রেখে নেমে পড়লো বনহুর। সুউচ্চ ফটকের সম্মুখে দু’জন রাইফেলধারী পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে। একজন অফিসার ধরনের লোক অদূরে একটা উঁচুস্থানে দাঁড়িয়ে কি যেন লিখছিলেন। বনহুর জানতে পারলো, তিনি দুর্গে যারা প্রবেশ করছেন তাদের নাম লিখে নিচ্ছেন, এবং একটা টিকিট দিচ্ছেন। বিনা পারমিশানে দুর্গে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।
বনহুর এগিয়ে এলো, একটি পারমিশান কার্ড নিয়ে প্রবেশ করলো, গেটের ভিতরে। খানিকটা প্রশস্ত পথ পেরিয়ে বিরাট বড় বড় কয়েকখানা অট্টালিকা।
বনহুর এগুতেই একটি লোক এগিয়ে এলো, খাঁটি উর্দুতে বললো–আপনি দুর্গের মধ্যে যাবেন? না বাইরেই দেখবেন?
উর্দুতেই জবাব দিলো বনহুর–আমি দুর্গের মধ্যে যাবো।
লোকটা বনহুরকে নিয়ে অগ্রসর হলো, অবশ্য ওদের কাজ এা, তবে কিছু বখশীসের আশা আছে এ আর কি।
সম্মুখের বড় কামরাটায় প্রবেশ করলো লোকটা, তার পাশে দাঁড়িয়ে বনহুর।
বনহুর দেখলো লোকটা দেয়ালের একস্থানে একটা চক্রাকার চাবি ঘুরাতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে মেঝের একস্থানে একটা সুড়ঙ্গ পথ বেরিয়ে এলো।
লোকটা এবার সুড়ঙ্গ পথে নামতে লাগলো, বনহুর অনুসরণ করলো তাকে। সুড়ঙ্গ পথ বেশি প্রশস্ত নয়, পাশাপাশি দু’জন মানুষ নামতে বা উপরে উঠতে পারে। লোকটা আরও বললো, দিল্লী-দুর্গে প্রবেশের আর একটি পথ আছে, সেপথ অতি দুর্গম। এখন কীটপতঙ্গ আর ভগ্ন অবস্থায় সে পথ রোধ হয়ে পড়েছে!
সিঁড়ির ধাপ বেয়ে বনহুর আর লোকটি নেমে এলো নিচে। দুর্গের মধ্যে ইলেকট্রিক আলো নেই, সেকালে ঝাড়বাতি, লণ্ঠন বা ঐ ধরণের কোনো আলো জ্বালান হতো। লোকটি দু’হস্তে দুটি মোম-জ্বেলে গিয়েছিলো, সিঁড়ির মধ্যে অন্ধকার একটু বেশি। বনহুর আরও লক্ষ্য করলো সিঁড়ির দু’পাশে শ্বেত পাথরের বড় বড় টুকরা রাখা হয়েছে। ঐ পাথরগুলো অত্যন্ত সচ্ছ, পাথরের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর আলো প্রবেশ করছে। ঐ রকম শ্বেত পাথর দুর্গের নানাস্থানে দেয়ালে গাঁথা রয়েছে দেখলো বনহুর।
নিচে নেমে আসার পর ঘুরেফিরে দেখতে লাগলো সে। একস্থানে বন্দীদের আটকে রাখা হতো। মোটা মোটা শিখ দিয়ে সে স্থানটি ঘেরাও করা রয়েছে। সে কি মজবুত প্রকোষ্ঠ, কোনোক্রমে এখান থেকে বন্দিগণ পালাতে সক্ষম হতো না! অন্য এক স্থানে অপরাধী দাস-দাসীদের বন্দী করে রাখা হতো, সে স্থানটি বন্দীদের কারাকক্ষের চেয়ে কিছুটা পৃথক ধরণের। অন্য এক-স্থানে ফাসীর মঞ্চ। এ ফাসীমঞ্চে অপরাধীদের ফাসী দেয়া হতো। রশি ছাড়া সব ঠিক রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটা ফাসীর মঞ্চ। এক সঙ্গে কয়েকজনকে ফাঁসী দেয়া হতো হয়তো। প্রত্যেকটা ফাঁসীমঞ্চের নিচে এক একটি কূপ রয়েছে। লোকটা বনহুরকে বুঝিয়ে বললো, অপরাধী বন্দীদের ফাসী দেয়ার পর এসব কূপে তাদের ফেলে দেয়া হতো। এ কূপগুলোর সঙ্গে যুমনা নদীর যোগাযোগ আছে। লাশগুলো একেবারে চলে যেতো যমুনায়। এখন সে কূপগুলো বড় বড় পাথরের চাপ দিয়ে ঢাকা রয়েছে।
