বনহুর ঠোঁটের উপর আংগুল চাপা দিয়ে বললো–আস্তে বলো লুসী! কেউ শুনে ফেললে বিপদ ঘটবে, কারণ তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ নও।
বনহুর একটা আসনে বসে পড়ে সিগারেট ধরালো।
লুসী নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুরের সুন্দর-বলিষ্ঠ মুখমণ্ডলের দিকে। দৃষ্টি সে যেন ফিরিয়ে নিতে পারছিলো না।
বনহুর বললো–লুসী, যাকে তুমি মা বলে পরিচয় দাও, সে তোমার মা নয়।
লুসী অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–আপনি কি বলছেন মিঃ আলম!
লুসী, মাফ করো–আমি তোমাকে কয়েকটি কথা বলবো, যা তোমার কাছে অশোভনীয় লাগবে।
বলুন মিঃ আলম?
শোন লুসী, আমাকে কয়েকদিন দিল্লীতে অপেক্ষা করতে হবে, আমার সঙ্গে তোমাকেও। লুসী, এ হোটেলেই আমরা থাকবো। আমাদের একটা মিথ্যা অভিনয় করতে হবে–অবশ্য আমাদের সঙ্গলের জন্যই। তোমাকে আমি যদিও বোনের মত ভালবাসি, কিন্তু আপাততঃ তুমি আমার স্ত্রীর অভিনয় করবে।
লজ্জায় লুসী মাথা নিচু করলো, রক্তাভ হয়ে উঠলো তার গণ্ড। হাজার হলেও লুসী বাংলার মেয়ে।
বনহুর মৃদু হাসলো, বললো–অবশ্য তুমি এতে কিছু মনে করবে না।
লুসী একবার দৃষ্টিটা তুলে তাকালো, তারপর মুখ নিচু করে নিলো।
লুসী, প্রথমে জেনে নাও তুমি মিসেস বাঞ্ছারামের কন্যা নও। তুমি কলকাতার বিখ্যাত ব্যবসায়ী অভয়কর বিশ্বাসের কন্যা।
অভয়কর বিশ্বাস!
হা।
না না আমি, আমি…আমার মা মিসেস বাঞ্ছারাম…চুপ করে শোন লুসী। গম্ভীর কণ্ঠস্বর বনহুরের!
লুসী তাকালো। আর কোনো কথা বলতে পারলো না সে।
বনহুর বললো–শিকারী এখনও তোমার পিছু ছাড়েনি। ধীরেনচরণের নিকট তোমার মিসেস বাঞ্ছারাম তোমাকে বিশ হাজার টাকায় বিক্রয় করেছে।
আমার মা আমাকে ধীরেনচরণের নিকটে বিক্রয় করেছেন!
হাঁ লুসী, এখন তুমি ধীরেনচরণের ক্রয় করা বস্তু।
অসম্ভব?
মিসেস বাঞ্ছারামের নিকটে কিছুই অসম্ভব নয় লুসী। তোমাকে সে ক্রয় করেছিলো ভীম সিং এর নিকট থেকে।
ভীম সিং! কলকাতার সে হিন্দুস্থানী একহাতশুন্য ভীম সিং?
সেই তোমাকে ছোটবেলায় হরণ করে আনে, এবং সুদুর দিল্লী নগরীতে বিক্রয় করে। বনহুর সে মুহূর্তে শোনা সমস্ত কথাগুলো বলে লুসীর কাছে। কোনো কথাই গোপন করে না। কেমনভাবে সে ড্রাইভার সেজে ধীরেনচরণ থেকে তাকে নিয়ে এ হোটেলে এসে উঠেছে, এবং মনিব-পত্নী বলে তার পরিচয় দিয়েছে–সব বলে বনহুর।
লুসীর মুখে কোনো কথা সরে না যেন। মুখমণ্ডল গম্ভীর থমথমে হয়ে পড়ে। ললাটে ফুটে উঠে চিন্তার রেখা।
বনহুর বলে–লুসী, তোমাকে যেদিন প্রথম গঙ্গবক্ষ থেকে উদ্ধার করেছিলাম, সেদিন আমি তোমাকে আরতী বলে ভুল করেছিলাম; কারণ তোমার চেহারার সঙ্গে মিস আরতী দেবীর হুবহু মিল আছে। মিস আরতী অভয়কর বিশ্বাসের কন্যা।
আমি এখন কি করবো মিঃ আলম?
তোমার বাবার কাছে যাবে।
আমি তাকে চিনি না। কোনোদিন তাকে দেখেছি বলে মনে হয় না।
সব সচ্ছ হয়ে যাবে লুসী, তুমি কিছু ভেবো না।
কিন্তু ধীরেনচরণ যদি…
হাঁ, সে আবার তোমাকে চুরি করার চেষ্টা করবে!
আমি ধীরেনচরণের হাত থেকে বাঁচতে চাই। আমাকে বাঁচান আপনি?
তোমাকে বাঁচানোর জন্যই আমি আরও কয়েকদিন দিল্লী অপেক্ষা করবো। ধীরেনচরণ তোমার অন্বেষণে দিল্লী শহর চষে ফিরছে। লুসী, তোমাকে অত্যন্ত সতর্ক এবং সাবধানে থাকতে হবে।
আমাকে দিল্লী থেকে নিয়ে চলুন মিঃ আলম।
যাবে, কিন্তু যেখানেই যাও ধীরেনচরণ তোমাকে রেহাই দেবে না। তাই তাকে তোমার চলার পথ থেকে সরিয়ে তবে আমার নিস্কৃতি।
লুসীর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো, কৃতজ্ঞতায় মন তার কানায় কানায় ভয়ে উঠেছে। যদিও মনটা বড় ভালো লাগছিলো না, কারণ একি আজব কথা শুনলো সে। মিসেস বাঞ্ছারাম তার জননী নয়। আজ নতুন করে স্মরণ হতে লাগলো অনেক কথা। তার জ্ঞান হবার পর থেকে সে দেখছে মিসেস বাঞ্ছারামকে। তার স্নেহ বলে কিছু ছিলো না, কেমন যেন নীরস কঠিনভাবে সব সময় দেখে এসেছে সে তাকে। কোনো কোনো সময় লুসীর মন বিদ্রোহ হয়ে উঠেছে, মিসেস বাঞ্ছারামের আচরণ অসহ্য লেগেছে তার কাছে। হয়তো হোটেলে কোনো ধনবান ব্যক্তির আগমন হলে লুসীকে সাজিয়ে-গুজিয়ে পাঠানোর চেষ্টা চলেছে তার কাছে। অর্থের লোভে লুসীকে অসৎ কাজে লিপ্ত করার চেষ্টা চলেছে রীতিমত। কিন্তু লুসীকে বাগে আনতে পারেনি কোনদিন। লুসীর মনে পড়ে আর একটি দিনের কথা…মিসেস বাঞ্ছারামের কোনো এক আত্নীয় এসেছিলো, লুসীকে নিয়ে গিয়েছিলো দিল্লী দুর্গ দেখবার নাম করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিল্লী-দুর্গে যায়নি সে, নিয়ে গিয়েছিলো সেকেন্দ্রা পার্কে। সেখানে তাকে জোরপূর্বক আলিঙ্গন করেছিলো শয়তান ভদ্রলোক জানিয়েছিলো প্রেম-নিবেদন। কিন্তু লুসী তাকে প্রশ্রয় দেয়নি, চরম আঘাত করেছিলো–জোরে একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিলো সে তার গালে।
এরপর লোকটার সঙ্গে মিসেস বাঞ্ছারামকে গোপনে আলাপ-আলোচনা করতে শুনেছে। হঠাৎ যদি সেখানে লুসী গিয়ে পড়েছে, অমনি কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেছে তাদের। এসব দেখে লুসীর মন বড় খারাপ হয়েছে। কিন্তু ভেবে পায়নি এর পিছনে তার মা মিসেস বাঞ্ছরামের কি স্বার্থ ছিলো! আজ সব সচ্ছ হয়ে গেছে, মিঃ আলম তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।
বনহুর বললো–কি ভাবেছো লুসী?
ভাবছি আমার জীবনের বিগত ইতিহাসের কথাগুলো।
যা তুমি যখন সব বুঝতে পেরেছো?
