ড্রাইভারবেশী দস্যু বনহুর বুঝতে পারলো, এ অন্য কেহ নয় মিস লুসী। তাকে নিশ্চয়ই ঘুমে ক্লোরফরম করে অজ্ঞান করা হয়েছে। গাড়ির হ্যাণ্ডেল চেপে বসে রইলো বনহুর।
লুসীকে লোকগুলো উঠিয়ে দিলো গাড়ির পিছন আসনে ড্রাইভিং আসনের পাশে চেপে বসলো শয়তান ধীরেন, বললো–ড্রাইভার চলো। জিন্সী রোড, ২৪ নং এ।
আচ্ছা স্যার। মুখে ‘আচ্ছা স্যার বললেও জিম্সী রোড কোথায় জানে না বনহুর, দিল্লীর পথঘাট তার তেমন করে পরিচিত নয়। তবু গাড়িতে স্টার্ট দিলো।
জনহীন রাজপথ।
গাড়ি উল্কা বেগে ছুটতে শুরু করলো।
ধীরেন বললো–কোন্ পথে যাচ্ছো?
স্যার, এ পথ দিয়েও যাওয়া যায়।
এ পথটাই বুঝি নির্জন?
হ স্যার।
খুব সাবধানে গাড়ি নেবে ড্রাইভার। দেখে কেউ যেন টের না পায়। তোমাকে মোটা বকশীস দেবো।
স্যার, একটা কথা বলবো?
বলো?
জিন্সী রোড আপনাদের জন্য খুব নিরাপদ নয়।
কেন?
কারণ ওখানে গোয়েন্দা বিভাগের এক অফিসার থাকেন। বড় সতর্ক ব্যক্তি তিনি। হঠাৎ যদি…।
তুমি কোথাকার কথা বলছো ড্রাইভার, জিন্সী রোডে পুলিশ গোয়েন্দা…
ঠিক সে মুহূর্তে বনহুর ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে ফেলে, সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার চেপে ধরে ধীরেনের বুকে খবরদার নড়বে না!
বিস্ময়ভরা ভীত কণ্ঠে বলে ধীরেন কে তুমি?
হেসে উঠে বনহুর–আমিই জিন্সী রোডের সে পুলিশ গোয়েন্দা।
তুমি! তুমি…
হাঁ, বন্ধু এবার তোমার পরিত্রাণ নেই।
সুচতুর ধীরেন হকচকিয়ে গেলো, একেবারে পুলিশ গোয়েন্দার কবলে পড়বে, কল্পনাও করতে পারেনি সে। কি করে উদ্ধার পাবে আর লুসীকে আত্মসাৎ করবে, এ চিন্তাই করতে লাগলো।
ঠিক সে মুহূর্তে পিছন আসনে মিস লুসী আর্তকণ্ঠে ককিয়ে উঠলো। একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো বনহুর।
ধূর্ত ধীরেন আচম্বিতে বনহুরের হাতে আঘাত করতেই তার রিভলভারখানা ছিটকে পড়লো গাড়ির সামনের নিচে।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর রিভলভার তুলে নিতে গেলো কিন্তু জমাট অন্ধকারে সে কিছুই দেখতে পেলো না।
সে সুযোগে ধীরেন গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে অদৃশ্য হলো পথের ওপাশে। আর তার সন্ধান পাওয়া গেলো না!
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে গাড়িতে ষ্টার্ট দিলো।
দিল্লীর পথঘাট তার পরিচিত নয়, কাজেই এ-পথ সে-পথ গাড়ি চালিয়ে বড় একটা হোটেলের সম্মুখে এসে গাড়ি রাখলো বনহুর।
লুসী তখন অনেকটা সুস্থ হয়ে এসেছে। বনহুর ওকে বললো–লুসী ভয় নেই–আমি মিঃ আলম।
আপনি!
সব পরে তোমাকে বললো, এখন আমার হাত ধরে নেমে এসো।
কোথায় যাবো?
এটা একটা হোটেল। এ হোটেলের একটা ক্যাবিন রিজার্ভ করে থাকবো।
লুসীর মাথাটা তখনও ঝিমঝিম করছে, তবু বনহুরের শরীরে ড্রাইভারের ড্রেস দেখে বললো–আপনার শরীরে এ ড্রেস কেন?
সব পরে জানতে পারবে। এসো লুসী। বনহুর গাড়ির দরজা খুলে হাত বাড়ায় লুসীর দিকে।
লুসীসহ বনহুর হোটেলে এসে উঠলো।
দিল্লীর বড় হোটেল গুলশান।
বনহুর বিপদে পড়লো…তার শরীরে এখন ড্রাইভারের ড্রেস। কাজেই হোটেলের ম্যানেজারের কাছে লুসীকে মালিক-পত্নী বলে পরিচয় দিলো সে।
হোটেলের ম্যানেজার মাহমুদ রিজভী অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি স্বয়ং লুসীর জন্য ভালোভাবে সব ব্যবস্থা করে দিলেন। কারণ লুসী তখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেনি।
প্রথমে ম্যানেজার মাহমুদ রিজভীর একটু সন্দেহ হয়েছিলো, কিন্তু পরে জানলেন, পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে যাওয়ায় তার এ অবস্থা। তখন তিনি আর ভালোভাবে তার থাকা এবং খাওয়ার সব জোগাড় করে দিলেন।
লুসী রইলো ক্যাবিনে আর ড্রাইভারবেশি বনহুর রইলো তার দরজার পাশের বেলকুনিতে। অবশ্য ম্যানেজারের মত নিয়েই সে এখানে শুয়ে পড়লো।
লুসীর তখন ভালোই জ্ঞান হয়েছে, বললো–একি করেছেন?
হেসে বললো বনহুর ড্রাইভারের ভাগ্যে এর চেয়ে বেশি কি আশা করা যায় বলো?
রাতটা কোনোরকমে কাটলো।
*
পরদিন ড্রাইভারবেশী বনহুর ম্যানেজার সাহেবের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো? যাবার সময় বললো–স্যার, মিসেস পারভিনের দিকে একটু লক্ষ্য রাখবেন। আজ স্বয়ং মালিক মিঃ আলম আসবেন, আমি তাকে আনতে যাচ্ছি।
বনহুর লুসীর পরিচয় মিসেস পারভিন বলে দিয়েছিলো!
ম্যানেজার মাহমুদ রিজভী ড্রাইভারকে ভরসা দিলেন।
বনহুর চলে গেলো!
তারপর যখন বনহুর ফিরে এলো তখন তার দেহে মূল্যবান স্যুট। সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে তার চেহারা। কয়েক ঘন্টা পূর্বের সে ড্রাইভার যে এখনকার মিঃ আলম, এ কথা কেউ যেন ভাবতেই পারবে না।
ম্যানেজারকে এসে তার পরিচয় জানালো বনহুর।
ম্যানেজার সসম্মানে অভ্যর্থনা জানালেন, এবং বললেন–আপনার স্ত্রী এখন ভালো আছেন। তিনি নিজে মিঃ আলমকে নিয়ে চললেন লুসীর কামরার দিকে।
বনহুর আজ বিব্রত হলো না, কারণ এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। লুসীর স্বামীর অভিনয় তাকে করতেই হবে, বাঁচাতে হবে লুসীকে। তাকে পৌঁছে দিতে হবে তার বাবা অভয়কর বিশ্বাসের কাছে।
বনহুর লুসীর কক্ষে প্রবেশ করতে লুসী খুশিতে উচ্ছল হলো। এখন বনহুরের দেহে কোনোরকম ছদ্মবেশ নেই। স্বাভাবিক ড্রেস তার। বনহুরকে দিল্লীর কেউ চেনেনা, জানে না তার আসল পরিচয়। কাজেই বনহুরের স্বাভাবিক ড্রেসে এখানে কোনো অসুবিধা ছিলো না।
মাহমুদ রিজভী বনহুরকে ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে চলে গিয়েছিলো।
মিস লুসী বললো–মিঃ আলম, আপনার জন্য আমি উদ্বিগ্ন রয়েছি। বলুন আমার মা কোথায়? এবং আমার এ অবস্থা কেন?
