মিস লুসী চাঁদের গালে ঠাই করে একটা চড় বসিয়ে দেয় সঙ্গে সঙ্গে, তারপর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে বেরিয়ে যা আমার সম্মুখ থেকে…যা বলছি..
শুভ্র দাড়ি-গোঁফের আড়ালে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠলো বনহুরের মুখে! ধীরে ধীরে কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলো বনহুর। ভাবলো, হায়রে নারী জাতি, তোমরা শুধু সরল মনে সবাইকে বিশ্বাস করতেই জানো! জানোনা উজ্জ্বল আলোর পেছনেই আছে গভীর অন্ধকার।
বনহুর নিজের কামরার দিকে অগ্রসর হলো, কিন্তু হঠাৎ তার কানে প্রবেশ করলো একটি চাপা কণ্ঠস্বর। থমকে দাঁড়ালো সে। কথার শব্দটা মিসেস বাঞ্ছরামের ঘর থেকেই আসছে বলে মনে হলো।
বনহুর লঘু পদক্ষেপে এগিয়ে গেলো মিসেস বাঞ্ছরামের কক্ষের জানালার বদ্ধ শার্শীর পাশে। নিকটবর্তী হতেই শোনা গেলো অস্পষ্ট পুরুষ কণ্ঠ–বিশ হাজার দিয়েছি, কিন্তু মাল এখনও আমার ভোগে এলো না।
মিসেস বাঞ্ছারামের কণ্ঠ–সে দোষ কি আমার? আমি তো বারণ করিনি। নিয়ে যাও তুমি, আমার লোক সব ব্যবস্থা করে রেখেছে।
সেই দুষ্ট লোকটাকেও তো অজ্ঞান করা হয়েছে?
হাঁ, তার খাবারেও ক্লোরফরম ঔষধ মিশানো হয়েছিলো। আর লুসীর খাবারেও। কিন্তু শোন ধীরেন, লুসীকে এতো বড় করতে আমার যা খরচা হয়েছে তা বিশ হাজারের অনেক বেশি। কাজেই আমাকে আরও দশ হাজার দিতে হবে, এবং পূর্বেও সে ভাবে কথা হয়েছিলো তোমার সঙ্গে।
বনহুর কান পেতে শুনছে। যা সে সন্দেহ করেছিলো তাই সত্য, লুসী নিশ্চয়ই মিসেস বাঞ্ছারামের মেয়ে নয়–কে সে। কার মেয়ে লুসী…আর ধীরেন, ধীরেন তাহলে ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়েও মরেনি–সে বেঁচে আছে!
বনহুরের চিন্তায় বাধা পড়লো, আবার শোনা গেলো ধীরেনের কণ্ঠ-দশ হাজার দিতে রাজি আছি, কিন্তু যখন তোমার লুসী আমার বাধ্যের মধ্যে আসবে তার আগে নয়।
বনহুর জানালার ফাঁকে দৃষ্টি রেখে দেখলো–সেই লোক যে দিল্লী মেল থেকে লুসীকে আত্মসাৎ করতে চেয়েছিলো–সেই ধীরেনচরণ। বনহুরের চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠলো।
আবার বনহুর শুনতে পেলো ধীরেনের গলা–গাড়ি হোটেলের সম্মুখে তৈরি আছে!
আরও একটু বিলম্ব করো ধীরেন, কারণ এখনও হোটেলে লোক আছে। হাঁ, শোন আর একটা সুখবর আছে বলবো এবার।
কি সুখবর?
গত পরশু রাতে ভীম সিংহকে হত্যা করা হয়েছে..
চমকে উঠে বনহুর, ভীম সিং–অভয়কর বিশ্বাসের বিশ্বস্ত অনুচর ভীম সিং। তার রিভলভারের গুলীতে একটি হাত ওর নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো চিরতরে। তবে কি সে ভীম সিং…
আবার শোনা গেলো মিসেস বাঞ্ছারামের গলা–ধীরেন, এখন তুমি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থেকো। লুসীর ব্যাপারে শুধু সে-ই জানতো আর কেউ জানেনা লুসী অভয়কর বিশ্বাসের কন্যা…
আর একবার বনহুর চমকে উঠলো, লুসী অভয়কর বিশ্বাসের কন্যা–আশ্চর্য!
মিসেস বাঞ্ছারাম তখনও বলে চলেছে–ঐ ভীম সিং ওকে চুরি করে আমাকে এনে দিয়েছিলো। শুনেছি ওরা দুটি যমজ বোন ছিলো ঠিক এক রকম দেখতে। হাঁ, তার জন্য ভীম সিং আমার কাছ থেকে নগদ দশ হাজার টাকা নিয়েছিলো।
ধীরেনের কণ্ঠ–ভীম সিংকে হত্যা করে সব মুছে ফেলেছেন!
হাঁ, লুসীর গোপন সংবাদ একমাত্র সে-ই জানতো।
তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্য কি ছিলো মিসেস বাঞ্ছারাম?
লুসী যখন বড় হবে তখন ভীম সিংকে আরও পাঁচ হাজার দেয়ার কথা ছিলো, কারণ লুসী বড় হয়ে অপূর্ব সুন্দরী হবে–এটা সে জানতো এবং তার দামও হবে অনেক বেশি।
তাই বুঝি?
হাঁ, তাই সে বার বার কলকাতা থেকে ছুটে আসতো আমার কাছে, তার বাকি পাওনাটা বুঝে নিতে। আমাকে ভয় দেখাতে লুসীকে সব বলে দেবে।
তাই আপনি,..
হাঁ, তাই আমি পরশু রাতে তাকে খতম করে দিয়েছি।
বনহুর আড়ালে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলো, সেদিন তার কামরায় কার্পেটে যে জমাট শুকনো রক্তের দাগ লক্ষ্য করেছে তা ঐ হতভাগ্য ভীম সিং-এর বুকের রক্ত।
আর বিলম্ব করা উচিৎ মনে করলো না বনহুর, সে দ্রুত নিজের কামরায় প্রবেশ করে শুধু রিভলভারটা তুলে নিলো পকেটে। তারপর বেরিয়ে এলো বাইরে। হোটেলের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো নিচে।
হোটেলের সম্মুখে গাড়ি অপেক্ষা করছে দেখতে পেলো বনহুর। নিশ্চয়ই এটা সে গাড়ি যে গাড়িখানার কথা একটু পূর্বে ধীরেনের মুখে শুনেছে।
বনহুর গাড়িখানার পাশে গেলো, ড্রাইভার বসে বসে ঝিমুচ্ছে।
বনহুরের দেহে এখনও বৃদ্ধ বয় চাঁদের ড্রেস। বললো বনহুর–এই ড্রাইভার, তোমাকে ভিতরে ডাকছেন মিসেস বাঞ্ছারাম।
ড্রাইভার সোজা হয়ে বললো–আমাকে?
হাঁ, কিছু বখশীস দিবেন উনি নিজের হাতে।
চলো! ড্রাইভার অনুসরণ করলো চাঁদকে।
চাঁদবেশি বনহুর ড্রাইভারকে নিয়ে হোটেলের মধ্যে ম্যানেজারের ছোট্ট কামরায় প্রবেশ করলো। দেখলো ম্যানেজার চেয়ারে কাৎ হয়ে পড়ে আছে। বুঝতে পারলো–লুসীর খাবার খেয়ে তার এ অবস্থা হয়েছে। বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে ড্রাইভারের বুকে রিভলভার উঁচু করে ধরলো। তারপর নাকের কাছে একটা রুমাল চেপে ধরতেই ড্রাইভার এলিয়ে পড়লো মেঝেতে।
বনহুর কৌশলে এ কাজগুলো সমাধা করে নিলো।
ড্রাইভার সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলতেই বনহুর ওর দেহের ড্রেস খুলে নিলো। পরেও নিলো ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। চাঁদ বয়ের ড্রেসটা পরে রইলো সেখানে।
গাড়িতে এসে বসে রইলো চুপ করে।
অল্পক্ষণ পর কয়েকজন মানুষ একটি যুবতীর সংজ্ঞাহীন দেহ ধরাধরি করে নিয়ে এলো গাড়ির পাশে।
