বনহুর শয্যায় বসে তাকিয়ে রইলো চাঁদের দিকে।
খাওয়া শেষ হতে না হতে চাঁদ ঢলে পড়লো মেঝের কার্পেটে। বনহুর জানতো, আজ তার খাবার বিশুদ্ধ নেই…এটা তার সন্দেহ হয়েছিলো কাজেই সে খাবার স্পর্শ করেনি। যদিও ক্ষুধায় তার পেট চো চো করছে!
বনহুর দ্রুতহস্তে বয়ের দেহ থেকে তার পোশাকটা খুলে নিলো এবার, তারপর বয়কে তার শয্যায় শুইয়ে দিয়ে বেশ করে চাদর চাপা দিলো।
এবার বনহুর বয়ের ড্রেস আর নিজের সুটকেসটা নিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করলো।
বনহুরের সুটকেসটার মধ্যে ছিলো তার ছদ্মবেশ ধারনের নানারকম জিনিসপত্র। বনহুর যখন তার বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো তখন তাকে দেখলে বয় চাঁদ ছাড়া কিছু মনে হবে না। তেমনি দাড়ি-গোঁফ আর মাথার চুলগুলো সাদা, জ্বতেও পাক ধরেছে! একটু উবু হয়ে হাঁটছে সে–ঠিক চাঁদের মতই।
বনহুর সম্মুখের দরজা ভালোভাবে আটকে দিয়ে পিছন দিকের জানালার শার্শী খুলে বেরিয়ে পড়লো তার কক্ষ থেকে। অত্যন্ত দ্রুত সে এ কাজগুলো করে নিলো।
আর সে মুহূর্ত বিলম্ব না করে প্রবেশ করলো মিস লুসীর কক্ষে। মিস লুসী তখন বাথরুম থেকে ফিরে এসে সবেমাত্র খাবার টেবিলে বসেছে। মাথার উপর ইলেকট্রিক ফ্যানটা ভনভন করে ঘুরছে।
ফ্যানের হাওয়ায় মিস লুসীর চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছিলো। দেহের কাপড়খানাও ঠিক সংযত নেই, এলিয়ে পড়েছে হাতের উপর।
চাঁদের আগমন টের পেয়ে বলে মিস লুসী, কিরে–এভোরাতে জেগে আছিস দেখছি?
দিদিমনি, তোমার খাবারটা বড্ড ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, যদি বলো গরম করে এনে দি। বনহুর তার গলার স্বর যতদূর সম্ভব চাঁদের অনুকরণ করে নিলো।
মিস লুসী জানে, চাঁদ তাকে অত্যন্ত স্নেহ করে, ছোট থেকে সে-ই নাকি ওকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে। কাজেই চাঁদের কথায় সে কিছুমাত্র অবাক না হয়ে বললো–আমার কিন্তু বড় ক্ষুধা পেয়েছে, খাবার গরম করতে দেরী হবে না তো?
এই তো এলাম বলে…বৃদ্ধ বয়ের বেশে দস্যু বনহুর লুসীর খাবার নিয়ে বেরিয়ে যায়!
হোটেলে প্রবেশ করে সে।
ছোট্ট কামরায় হোটেলের ম্যানেজারের খাবার ঢাকা দেওয়া আছে সে দেখতে পেলো। দ্রুতহস্তে টেবিল। থেকে খাবারের থালা হাতে তুলে নিয়ে লুসীর খাবারগুলো ঢাকা দিয়ে রাখলো যেমন ছিলো ঠিক তেমনি করে।
ফিরে এলো লুসীর কামরায়।
লুসীর সম্মুখে খাবার সাজিয়ে রেখে সরে দাঁড়ায় বৃদ্ধ বয়।
লুসী গোগ্রাসে খেতে শুরু করলো।
বনহুরের সন্দেহ জেগেছিলো-যেমন তার খাবারে কোন বিষক্ত ঔষধ মেশানো হয়েছিলো, তেমনি লুসীর খাবারেও থাকতে পারে, তাই সে কৌশলে পাল্টে নিয়েছিলো খাবারগুলো! কারণ এখানে আসার পর তার সমস্ত ব্যাপারগুলো তেমন সুবিধার মনে হচ্ছিলো না। বিশেষ করে লুসীর মায়ের আচরণ কেমন যেন ঘোলাটে ঠেকছিলো।
লুসী খাওয়া শেষ করে বললো–চাঁদ, ওগুলো নিয়ে যা।
চাঁদ টেবিলের এঁটো থালাগুলো নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। ডাকলো লুসী–ওগুলো রেখে একবার শুনে যাবি।
আচ্ছা দিদিমনি।
চাঁদ বেরিয়ে যায়, একটু পরে ফিরে আসে সে–দিদিমনি, কিছু বলবে?
মিস লুসী তার দেহের জামাটা খুলে ফেললো। তারপর নাইট ড্রেস পরে নিলো সে। বৃদ্ধ চাঁদকে সে যেন কোনো সঙ্কোচই করে না। ছোটবেলা হতে ওকে দেখে আসছে, ওর হাতেই মানুষ হয়েছে কিনা তাই চাঁদ কতকটা ওর মায়ের মতই। বললো লুসী–চাঁদ, আজ বড্ড ঘুরেছি, পা দুটো আমার ব্যথা হয়ে গেছে। একটু টিপে দিবি?
এবার চাঁদবেশি দস্যু বনহুর একটু হতভম্ব হলো, শেষ পর্যন্ত তাকে…না না, এতে দোষ কি! বললো– দেবো দিদিমনি।
লুসী টেবিল থেকে একটা বই তুলে নিয়ে বললো–আমি বই পড়ছি, তুই বেশ করে আমার পা দু’খানা দেবে দে চাঁদ।
লুসী বিছানায় শুয়ে পড়লো।
চাঁদ বসলো ওর পাশে! কিন্তু সহসা লুসীর দেহে হাত রাখতে দ্বিধা বোধ করছিলো। সত্যি তো আর সে বৃদ্ধ চাঁদ নয়। তবু কোনো উপায় নেই, চাঁদের অভিনয় তাকে করে যেতে হবে।
লুসীর দেহে হাত রাখলো, আলগোছে টিপতেলাগলো ওর পা দু’খানা।
লুসী বইখানা কিছুক্ষণ চোখের সামনে মেলে ধরে তারপর বন্ধ করে রাখলো বুকের উপর, বললো–চাঁদ, ও ঘরে বাবু ঘুমিয়েছে?
বোধ হয় ঘুমিয়েছে কিন্তু কেন দিদিমনি?
না এমনি বলছিলাম। আচ্ছা চাঁদ?
বলুন দিদিমনি?
বাবুকে তোর কেমন মনে হয়?
তেমনি সুবিধের বলে মনে হয় না আমার।
সে কিরে?
হ কেমন যেন বেয়াড়া ধরনের লোক।
লুসী এবার বেশ রেগে গেলো, পা দু’খানা ওর হাতের তলা হতে সরিয়ে নিয়ে বললো–কি করে বুঝলি সে বেয়াড়া।
ঐ রকম মনে হয়।
খবরদার, ওর সম্বন্ধে আর ওরকম কথা বলবি না। উনি বড় ভালো মানুষ। ওকে আমার খুব ভালো লাগে।
সত্যি আপামনি?
হাঁ। জানিস না উনি আমাকে মৃত্যুর কবল থেকে বাঁচিয়েছেন!
চাঁদ!
বলুন আপামনি?
ওকে আমি ভালবেসে ফেলেছি।
দিদিমনি।
হাঁ চাঁদ। জানিস না তুই, উনি মানুষ নন–দেবতা। ওকে আমি অন্তর দিয়ে ভালবেসেছি।
তুমি ভুল করেছে আপামনি।
না, আমি ভুল করিনি। চাঁদ,ওর মত মানুষ আমি আর দ্বিতীয় জন দেখিনি। জানিস না চাঁদ, আমি ওকে কতখানি ভালোবেসে ফেলেছি।
তা হয় না। তা হয় না দিদিমনি। একজন বিদেশী মানুষকে হঠাৎ এমন ভালোবাসা অত্যন্ত ভুল।
চাঁদ, যার সম্বন্ধে কিছু জানিস না, তার সম্বন্ধে কিছু বলতে যাসনে।
কিন্তু আমি বলছি ওকে ভালোবেসে নিজেকে বিনষ্ট করোনা দিদিমনি…
