বনহুরের চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো নিজের অজ্ঞাতে। মনের কোণে উদয় হলো একটি মুখ–সে ঐ নূরী। না জানি নূরীর মৃতদেহ আজ কোথায় মিশে গেছে…
খাদেম জানালো তাদের এবার বেরিয়ে যেতে হবে।
বনহুর আর লুসী বেরিয়ে এলো তাজমহলের ভিতর থেকে। লুসী বললো–এখানে কারো প্রবেশ নিষেধ। কি-না, তাই খাদেম আমাদের বেশিক্ষণ থাকবার জন্য অনুমতি দিলেন না।
তাজমহল থেকে বিদায় নিয়ে বনহুর আর লুসী রওয়ানা দিলো সেকেন্দ্রা অভিমুখে। সেখানে নিশ্চিন্তে নিদ্রিত রয়েছেন দিল্লীর সম্রাট আকবর বাদশাহ্।
সেকেন্দ্রায় পৌঁছতেই বনহুর অবাক হয়ে দেখলো সেকেন্দ্রা টেট। দূর থেকেই লালে লাল মনে হচ্ছিলো, কে যেন আবির ঢেলে দিয়েছে। বেলাশেষের সূর্যের রশ্মিতে রক্তাক্ত মনে হচ্ছিলো সব!
আকবরের সমাধিসৌধ দেখার পর বনহুর আর লুসী অন্দরমহলে চললো। সেকি সুন্দরভাবে তৈরি রাজপ্রাসাদ! দিল্লীর সম্রাট আকবরের বেগম মহল। পাশাপাশি সারি সারি কক্ষ। বেগম মহলের পাশেই চুড়ি মহল। এখানে আকবরের বেগমগণ চুড়ি পরতেন। এবার বনহুর আর লুসী চললো আরও ভিতরে, আকবরের হিন্দু বেগম মহলে।
বেশ সুন্দরভাবে তৈরি এ অন্দরমহলটা।
এখানে আকবরের হিন্দু বেগমগণ বাস করতেন। আকবরের কয়েকখানা তৈলচিত্র টাঙ্গানো রয়েছে দেখলো। ওরা। এ তৈলচিত্রে আকবর হিন্দু-সাজে সজ্জিত রয়েছেন। সেকি গম্ভীর বীর-পুরুষ চেহারা। দাড়িগুলো দু’ভাগে ভাগ করে কানের পিঠে সুন্দরভাবে আটকানো। কানে এবং গলায় মতির মালা শোভা পাচ্ছে। মাথায় মণি মুক্তা খচিত মুকুট।
বনহুর প্রতিটি ছবির পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছিলো। সম্রাট আকবরের শত শত চিহ্ন তার দৃষ্টির সম্মুখে ভেসে বেড়াচ্ছে যেন। এবার তারা আকবরের রাজপ্রাসাদ দেখা শেষ করে বেরিয়ে এলো। শেরশাহের স্থাপিত পাথরের ঘোড়ার মূর্তির সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। পাথরে খোদাই করা এ অশ্বমূর্তিটা সত্য বনহুরের মনে স্মরণ করিয়ে দিলো তার প্রিয় তাজের কথা। তাজের কথা মনে হতেই আনমনা হয়ে গেলো বনহুর।
লুসী বললো–আজ ফিরে চলুন মিঃ আলম। আবার আসা যাবে। এখনও অনেক বাকী আছে।
হাঁ, আজ ফেরা যাক।
বনহুর আর লুসী এবার ট্যাক্সী নিয়ে চেপে বসলো।
বনহুর বললো–সত্যি লুসী, তোমার জন্যই আজ দিল্লী এলাম। তাইতো দেখতে পেলাম এতো সব।
বললো লুসী–কদিন থাকলে আরও কত কি দেখতে পাবেন–কুতুব মিনার, মতি মসজিদ, দিল্লী দুর্গ, দিল্লী দরবার, ময়ূর সিংহাসন…
হাসলো বনহুর ময়ূর সিংহাসন এখনও আছে নাকি?
আসল নেই, তবে নকলটা আছে।
বেশ তাহলে আর একদিন আসা যাবে।
হোটেল বাঞ্ছারামে পৌঁছতে কিছুটা সময় লেগে গেলো। বনহুর আর লুসী হোটেলের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলো উপরে। লুসী বনহুরসহ প্রবেশ করলো কক্ষমধ্যে।
লুসী অগ্রে ছিলো, আর বনহুর পিছনে।
লুসী লক্ষ্য না করলেও বনহুরের দৃষ্টি এড়ালো না, লুসী আর সে প্রবেশ করতেই কে যেন মিসেস বাঞ্ছারামের কক্ষ থেকে দ্রুত পাশের কক্ষে চলে গেলো। লোকটা যে সিগারেট পান করছিলো তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কারণ তখনও সিগারেটের একটা মিষ্টি গন্ধ কক্ষমধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো।
লুসী মায়ের কণ্ঠ জড়িয়ে ধরে চুমু দিলো তার ফুটবলের মত গণ্ডে। মা কোনোরকম উক্তি প্রকাশ করলো না।
লুসী বললো–মা, উনি আগ্রায় তাজমহল দেখতে গিয়েছিলেন।
বেশ এবার ওকে ওর ঘরে যেতে দাও। আর তুমি খেয়ে নিজের কামরায় চয়ে যাও। টেবিলে তোমার খাবার ঢাকা দেওয়া আছে।
মিস লুসী আনন্দভরা কণ্ঠে বললো–তুমি খাবে না মা?
আজ আমি সকাল সকাল খেয়ে নিয়েছি।
লুসী আর বনহুর পাশের কক্ষে চলে গেলো।
বনহুরের জন্য টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া রয়েছে।
লুসী বললো–নিন, এবার খেয়ে নিন। ইস্ সারা দিন যা পরিশ্রম গেছে। বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে আপনার!
বনহুর জামাটা খুলতে খুলতে বললো- মোটেই না!
আমার কিন্তু বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে মিঃ আলম।
বনহুর জামাটা আলনায় রেখে, শয্যায় গা এলিয়ে দেয়!
লুসী বলে–বারে, শুয়ে পড়লেন যে?
এতো বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, বিশ্রাম না করে খাবার উপায় নেই।
তাহলে আমি চলি, গুড নাইট।
অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো বনহুর–গুড নাইট!
মিস লুসী বেরিয়ে যায়।
বনহুর আর শুয়ে থাকে না, দ্রুত শয্যা ত্যাগ করে উঠে পড়ে। কলিং বেল টিপতেই বৃদ্ধা বয় চাঁদ এসে হাজির হলো-কিছু চাই বাবু?
বনহুর বললো–আমার মোটেই ক্ষুধা নেই, টেবিলের খাবারগুলো নিয়ে যাও!
সেকি বাবু, খাবেন না তা কি হয়! না খেলে গিন্নি-মাতা রাগ করবেন। আপনাকে খেতে হবে।
কিন্তু খাবার যে কোনো উপায় নেই চাঁদ। আচ্ছা চাঁদ, তুমি খেয়ে নিয়েছো?
কন কি বাবু? আমরা চাকর-বাকর মানুষ–সবার শেষে খাবো।
বনহুর খুশি হয়ে বললো–তা হলে এক কাজ করো চাঁদ।
বলুন বাবু?
আমার খাবারগুলো চেয়ারে বসে খেয়ে নাও।
ছিঃ ছিঃ ছিঃ তা কি হয়?
কেন হবে না। আমি বলছি খাও।
কিন্তু….
কেউ জানবে না। খাবার পর এটো থালাগুলো নিয়ে গিয়ে বলো বাবু খেয়েছে, বাস্ তা হলেই হলো।
বৃদ্ধা চাঁদ চাকর মানুষ, তাদের জন্য সব সময় আজে-বাজে খাবারগুলো থাকে ভালো খাবার কোনোদিনই তাদের ভাগ্যে জোটে না। সবার শেষে যা থাকে তাই ওরা খায়। বাবুর জন্য টেবিলে ঢাকা দেওয়া ভালো খাবারগুলোর লোভ চাঁদ ছাড়তে পারলো না। টেবিল থেকে থালাটা মেঝের এক কোণে নামিয়ে রেখে খেতে শুরু করলো।
