তাজের বড় গেটটার সম্মুখে এসে টাংঙ্গী থামলো।
নেমে দাঁড়ালো বনহুর আর মিস লুসী।
গেটের মুখেই কতগুলো ফেরিওয়ালা শ্বেত পাথরের ছোট-বড় তাজমহল আর নানারকম পাথরের খেলনা নিয়ে বিক্রি করছে। কাঠের পুতুল আর মোমের পুতুলগুলো বড় সুন্দর মনোরম! বিশেষ করে বনহুর একটা তাজমহল তুলে নিলো হাতে, অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে।
লুসী হেসে বললো–সত্যিকারের তাজমহলের কাছে এসে নকল তাজমহল নিয়ে মাতলেন দেখছি।
বনহুর একটু লজ্জিত হলো, ফেরিওয়ালার হাতে ছোট্ট তাজমহলটা ফিরিয়ে দিয়ে বললো–রেখে দাও, ফেরার পথে নেবো।
লুসী আর বনহুর গেট পার হয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো।
অপূর্ব সে দৃশ্য!
বনহুর কিছুক্ষণ নির্বাক স্থির নয়নে তাকিয়ে রইলো। সেখান হতে তাজের সম্পূর্ণ অংশটা দেখা যাচ্ছে। শুভ্র বলাকার মত ধবধবে সাদা মর্মরে গাঁথা তাজমহল। বনহুর কবি নয়, না হলে সে এ মুহূর্তে একটি সুন্দর কবিতা সৃষ্টি করতে পারতো। মখমলের গালিচার মত সবুজ দুর্বার চাদর বিছানো, মাঝখানে ফোয়ারার সারি। দু’পাশ কাচি-ছাটা পাইন গাছ। ফোয়ারার দু’পাশ দিয়ে দুটো পথ সোজা চলে গেছে তাজের দিকে! দক্ষিণ দিকের। পথ দিয়ে অগ্রসর হলো লুসী আর বনহুর। কারণ এ পথেই দর্শকগণ এগিয়ে চলেছে। আর যারা ফিরে আসছে। তারা বাম দিকের পথ ধরে আসছে।
বনহুর আর লুসী অগ্রসর হলো তাজমহলের দিকে।
তাজের নিকটে পৌঁছতেই আরও অবাক হলো বনহুর। একটি লোক সকলের পা থেকে জুতো খুলে নিচ্ছে, আর যাদের মাথায় কোনোরকম সাহেবী টুপী রয়েছে সেগুলোও খুলে রাখছে সে। লোকটির সম্মুখে জুতো আর টুপি পাকার হয়ে উঠেছে। কয়েকটি লোক সারিবদ্ধভাবে জুতো ত্যাগ করার পর বনহুর আর লুসী গিয়ে দাঁড়ালো।
খাদেম লোকটা বনহুরের জুতো খুলে নিয়ে তাদের এক রকম সাদা কাপড়ের জুতো পরতে দিলো।
বনহুর আর লুসী কাপড়ের জুতো পরে নিয়ে এগুলো। অপূর্ব সুন্দর এ তাজমহল! শ্বেত পাথরে তৈরি তাজের গায়ে শুধু পবিত্র কোরানের আয়াত লেখা রয়েছে। তাজের কারুকার্য-নৈপুণ্য বনহুরের চোখে যেন তাক লাগিয়ে দিলো। না জানি কোন আলেম-শিল্পীর নিপুণ তুলির আঁচড়ে খোদাই করা হয়েছে এ আরবি অক্ষরগুলো।
তাজের চারপাশে চারটি মিনার। বনহুর লুসীসহ একটি মিনারে উঠে গেলো! অবশ্য তাকে এখানে খাদেমের হাতে কিছু বখশীস দিতে হলো।
মিনারের ভিতরে সিঁড়িগুলো বেশ চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে উপরের দিকে উঠে গেছে। প্রত্যেকটা সিঁড়ির বাঁকে একটি জানালা। ভিতরে আলোর কোন ব্যবস্থা নেই। এসব জানালাপথে পৃথিবীর আলো-বাতাস প্রবেশ করে মিনারের ভিতরটা উজ্জ্বল করে তোলে।
লুসী আর বনহুর মিনারের একেবারে শেষ অবধি উঠে গেলো। উপর থেকে জানালাপথে নিচে তাকালো বনহুর। নিচের লোকজনদের একেবারে ছোট্ট ঠিক লিলিপুটের মত মনে হলো।
কিন্তু নামবার সময় হলো মজাটা।
লুসী এতগুলো সিঁড়ি অতিক্রম করে উপরে উঠতে বেশ হাঁপিয়ে পড়েছিলো, নামবার সময় অত্যন্ত হাঁপাচ্ছিলো সে।
বনহুর বললো মিস লুসী, আপনার যদি আপত্তি না থাকে তবে আমার হাত ধরে নেমে চলুন।
লুসী যেন এতোক্ষণে আশ্বস্ত হলো। বনহুরের হাতের উপর হাত রাখলো।
বনহুর আর লুসী নিচে নামতে লাগলো।
লুসীর কোমল উষ্ণ হাতখানা বনহুরের বলিষ্ঠ হাতের মুঠায় ঘেমে ভিজে উঠেছে। বনহুর নিজের মধ্যে একটা অনুভূতি উপলব্ধি করলো যেন। কেমন যেন একটা আলোড়ন তার ধমনীর রক্তকে চঞ্চল করে তুললো। লুসীর দেহের সেন্টের সুমিষ্ট একটা গন্ধ তাকে মোহগ্রস্ত করে ফেললো! বনহুর লুসীকে আকর্ষণ করলো নিজের দিকে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো সে, লুসীর হাত ধরে দ্রুত নেমে এলো নিচে।
লুসী বনহুরের আচরণে অবাক হলো, কিন্তু সে কোনোরকম উক্তি প্রকাশ করল না।
মিনার থেকে বেরিয়ে এলো ওরা দু’জনা।
তাজমহলের অপরূপ দৃশ্য প্রাণভরে উপভোগ করতে লাগলো বনহুর আর লুসী। যদিও লুসী ইতিপূর্বে আরো কয়েকবার তাজমহল দেখবার সুযোগ লাভ করেছে, তবু আজ নতুন করে যেন দেখছে সে তাজের সৌন্দর্য।
তাজমহলের পিছনে এসে দাঁড়ালো ওরা।
যমুনা…তার উপরে যেন ভাসছে তাজমহল।
স্নিগ্ধ-শীতল বাতাস বইছে। যমুনার বুকে পালতোলা নৌকাগুলো মন্থর গতিতে হেলেদুলে এগিয়ে চলেছে। কোন্ অজানার পথে।
বনহুর নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে। তাজের তুষারধবল ছায়া ভাসছে যমুনার বুকে, কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে তাজের প্রতিবিম্বটা।
কতক্ষণ বনহুর তাকিয়েছিলো হয়তো তার মনের মধ্যে মমতাজের মুখখানাই উদয় হচ্ছে; তার পাশে আর একটি মুখ–সে হলো সম্রাট শাহজাহান!
লুসীর কথায় সন্বিৎ ফিরে পায় বনহুর–বেলা শেষ হয়ে এলো, চলুন আজকের মত ফেরা যাক।
বনহুর ফিরে দাঁড়ায়–চলো। পরক্ষণেই বলে সে মাফ করবেন, একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।
না না, আপনি এখন থেকে আমাকে তুমি’ই বলবেন। কারণ আমার চেয়ে আপনি অনেক বড়।
একটু হাসলো বনহুর।
তাজমহলের খাদেমকে বলে বনহুর আর লুসী তাজের ভিতরে প্রবেশ করলো। বাইরের মত ভিতরটাও কারুকার্যখচিত। শ্বেত পাথরের গায়ে শিল্পীর নিপুণ হস্তের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে কোরআনের বাণীগুলো।
মেঝেতে পাশাপাশি দুটো কবর। মূল্যবান গেলাপে ঢাকা রয়েছে কবর দুটো। ভিতরে প্রবেশ করতেই সুমিষ্ট একটা গন্ধ বনহুর আর লুসীকে সাদর সম্ভাষণ জানালো! চন্দন আর লোবানের সুমিষ্ট গন্ধ এটা! হৃদয়ে যেন একটা অনুভূতি অনুভব করলো ওরা। বাদশাহ আজ ঘুমিয়ে পড়েছে, পাশে তার ঘুমন্ত মহিষী। কেমন একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে স্থানটিতে।
