ট্রের উপরে খাবার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে মিস লুসী। বনহুরকে সোফায় বসে থাকতে দেখে বলে– আপনি এতোক্ষণ জামা-কাপড় ত্যাগ করেননি মিঃ আলম?
ও, সে কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেছি। বনহুর হস্তস্থিত অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রেতে নিক্ষেপ করে উঠে দাঁড়ায়।
মিস লুসী টেবিলে খাবারগুলো সাজিয়ে রাখতে রাখতে বলে–চট করে ফিরে আসবেন কিন্তু বাথরুম থেকে।
বনহুর জামাটা খুলে আলনায় রেখে বাথরুমে প্রবেশ করলো।
পুরোন হলেও বেশ রুচিপূর্ণ বাথরুম।
বনহুর ঠাণ্ডা পানিতে বেশ করে চোখমুখ ধুয়ে নিলো, মন থেকে হিজিবিজি চিন্তাধারা মুছে ফেলতে চেষ্টা করলো, বিশেষ করে তখনকার মত।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলো, মিস লুসী টেবিলে তার খাবার সাজিয়ে নিয়ে বাংলার বধুর মত গালে হাত দিয়ে নিশ্চুপ বসে আছে। ফ্যানের হাওয়ায় চুলগুলো উড়ছে।
বনহুর এসে বসলো টেবিলে পাশের চেয়ারে।
মিস লুসী পাকা গৃহিণীর মত বললো-খিদেয় খুব কষ্ট পেয়েছেন। নিন, চটপট খেয়ে নিন এবার। প্লেটে খাবার উঠিয়ে দিচ্ছিলো লুসী।
বনহুর খেতে বসলো সুবোধ বালকের মত, ক্ষুধাও পেয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু খাবারগুলো যেন কণ্ঠ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিলো। বনহুরের দৃষ্টি নিজের অজ্ঞাতে মেঝের কার্পেটে চলে যাচ্ছিলো। ওখানে নিশ্চয়ই কোনো নরহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার বুকের রক্ত কার্পেটখানাকে সিক্ত করে তুলেছিলো এক সময়। কিন্তু সে সে ব্যক্তি ছিলো, কেনই বা তাকে হত্যা করা হয়েছিলো…এমনি নানা চিন্তায় বনহুর আনমনা হয়ে পড়েছিলো।
মিস লুসী বললো–মিঃ আলম, খাবারগুলো বুঝি খুব খারাপ লাগছে?
বনহুরের এতোক্ষণ তেমনভাবে কোনো খেয়ালই হয়নি–খাবারগুলো শুধু গলাধঃকরণ করেই চলেছিলো, কেমন লাগছে খেতে তা তো লক্ষ্য করেনি। এবার বলে উঠলো–চমৎকার হয়েছে!
তবে খাচ্ছেন না কেন?
এই তো অনেক খেয়ে ফেলেছি।
মিঃ আলম, আমার মা কিন্তু বড় খামখেয়ালী। তাকে আপনার কেমন লাগলো?
হ্যাঁ কি বললেন?
আমার মাকে আপনার কেমন লাগলো?
বনহুর মুখের খাবারটুকু গিলে বললো–অত্যন্ত মধুর।
কি বললেন?
মানে, বেশ লোক কিন্তু উনি।
মাকে দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন না, না তার ভিতরটা কেমন উনি খুব ভাল মানুষ।
আমি তা বুঝতে পেরেছি মিস লুসী যখন তাকে প্রথম দেখেছি।
এ-কথা সে-কথার মধ্যে খাওয়া-পর্ব শেষ হয়।
তখনকার মত শয্যায় দেহটা এলিয়ে দেয়ে সে।
মিস লুসী বেরিয়ে যায়।
বনহুর বাইরে বের হবার জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছিলো, এমন সময় লুসী এসে দাঁড়ায় তার পাশে, হেসে বলে– বাইরে যাবেন বুঝি?
বনহুর টাইটা ঠিক করতে করতে বলে–হাঁ, দিল্লী শহরটা একবার পরিভ্রমণ করে আসি।
মিঃ আলম, আমিও যাবো আপনার সঙ্গে।
চলুন।
অবশ্য আপনার কোনো অসুবিধা হলে…
না না, আপনি গেলে আমার ভালোই হবে, কারণ এখানের পথঘাট আমার কিছু চেনা নেই।
মিস লুসী সহ বনহুর বেরিয়ে পড়লো।
বনহুর আর লুসী যখন গাড়িতে উঠে বসেছিলো তখন হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো হোটেলের দ্বিতলের বেলকনিতে। একখানা হেঁড়ে মুখ আলগোছে সরে গেলো যেন আড়ালে। বনহুর বুঝতে পারলো–ও মুখখানা অন্য কারো নয়, মিসেস বাঞ্ছরামের।
ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিলো।
দিল্লীর চৌরঙ্গীর মোড়ে এসে বললো বনহুর–মিস লুসী, ট্যাক্সি ছেড়ে, চলুন টাংঙ্গী গাড়িতে যাওয়া যাক। সবদিক ভালোভাবে দেখতে পাওয়া যাবে।
তাই হলো। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে একটা টাংঙ্গী ধরে উঠে বসলো বনহুর আর মিস লুসী। প্রথমে বনহুর আগ্রার পথে রওয়ানা দিলো। তাজমহলের অনেক নাম শুনেছে সে কিন্তু আজও দেখবার সৌভাগ্য হয়নি।
টাংঙ্গী আগ্রার পথে অগ্রসর হলো।
শহর ছেড়ে সোজা একটা পথ চলে গেছে আগ্রার দিকে। পথের দু’ধারে ধূসর প্রান্তর, মাঝে মাঝে। নানারকম বৃক্ষ-লতা-গুল্মের ঝাড় আর সবুজ বনানী। পথের দুপাশ দিয়ে সারিবদ্ধ শাল আর সেগুন গাছ।
বনহুর অবাক হয়ে দেখলো–পথের পাশের গাছপালার মধ্যে অসংখ্য ময়ুর আর ময়ুরী পেখম তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টাংঙ্গীর শব্দে সরে যাচ্ছিলো কোনোটা বা ফিরে দেখছিলো টাংঙ্গীর দিকে। ময়ূরপাখি ছাড়াও কাকাতুয়া আর ময়নার ঝাক এ-গাছ থেকে ও-গাছে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।
মুগ্ধ নয়নে বনহুর এ সব দৃশ্য দেখছিলো।
লুসী এসব জায়গার সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত। সে সব বুঝিয়ে বলে দিচ্ছিলো। এ সব অঞ্চলের আবহাওয়া অত্যন্ত শুষ্ক। একটা উষ্ণতা অনুভব করছিলো বনহুর নিজের দেহে। আকাশ সচ্ছ নির্মল। কোথাও মেঘের খণ্ড ভেসে নেই। বাতাসও যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।
বনহুরের টাংঙ্গীর পাশ কেটে চলে যাচ্ছে কতরকম যানবাহন। বেশির ভাগ ট্যাক্সি আর উটের গাড়ি। ক্কচিৎ দু’চারটে বড় বাস চলে যাচ্ছে দিল্লী থেকে আগ্রার দিকে। লুসী বললো–এ রাস্তা ছাড়াও আগ্রা যাওয়ার আর একটি পথ আছে। সে পথটি অত্যন্ত জনাকীর্ণ এবং যানবাহন পরিপূর্ণ।
কিন্তু আমার পক্ষে এ পথটাই বেশি শ্রেয়ঃ।
আপনি দেখছি নির্জনতা বেশি পছন্দ করেন।
হা মিস লুসী আমি তাই চাই।
আচ্ছা মিঃ আলম, প্রথমে তাজমহল দেখতেই যাবেন মনস্থ করেছেন। না অন্য কোথাও?
না, অন্য কোনো জায়গা দর্শনের পূর্বে আমি আগ্রার তাজমহল দেখাই মনস্থ করেছি।
এ-কথা সে-কথার মধ্যে এক সময় বনহুর আর লুসী এসে পৌঁছে গেলো আগ্রায়। বেশ কিছু দূরে থাকতেই তাজমহলের অপরূপ দৃশ্য বনহুরের দৃষ্টি গোচর হলো। নীল আকাশের বুকে যেন শিল্পীর তুলি দিয়ে আঁকা একটি ছবি।
