আরও একটা জিনিস বনহুরকে অবাক করলো–অসংখ্য গাড়ি আর যানবাহনের মধ্যে উটের গাড়িগুলো। ঠিক এক্কা গাড়ির মত দেখতে; কতকটা টাঙ্গার মত মনে হয়। উটগুলো তো আর ঘোড়ার মত ছুটতে পারে না, আস্তে মনে হলেও বেশ দ্রুত পা চালিয়ে যাচ্ছিলো।
প্রশস্ত পথ।
পথে অসংখ্য যানবাহনের ভীড় থাকলেও তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না। বনহুর আর লুসীর গাড়ি এক সময় মোগলাই রোডে বাঞ্ছারাম হোটেলের সম্মুখে এসে থামলো।
দিল্লী শহরের প্রায় এক প্রান্তে এ হোটেল। মোগলাই রোড হয়ে কিছুটা অগ্রসর হলেই আগ্রা যাওয়ার বড় পথ। বাঞ্ছারাম হোটেল খুব বড় এবং সেকেলে ধরনের। অতি পুরানো হোটেল। নিচে হোটেল আর উপর। তলায় থাকে মিস লুসীর মা বাঞ্ছারাম পত্নী মিসেস বাঞ্ছারাম।
বনহুর আর লুসীর গাড়ি থেকে নেমে পড়লো।
বনহুর ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে স্যুটকেসটা হাতে তুলে নিলো। লুসী পথ দেখিয়ে অগ্রসর হলো।
পিছনে অনুসরণ করলো বনহুর।
দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো লুসী আর বনহুর। মহানগরী দিল্লীর বুকে এমন ফাটল-ধরা জিরজিরে অট্টালিকা কেমন যেন বেখাপ্পা লাগছিলো বনহুরের কাছে।
চুন-বালি খসে পড়া, ইটগুলো কঙ্কালের দাঁতের মত হিস হিস করছে যেন। কালি আর ঝুলগুলোও ঝাড়া হয়নি যেন কতকাল। একটা দরজার সামনের এসে দাঁড়ালো, লুসী বললো–এটা আমার মায়ের ঘর।
বনহুর কোনো কথা বললো না। সে আশ্চর্য হয়েছে–লুসী যে তাকে নিয়ে হোটেলের সিঁড়ি বেয়ে এতোদূর। এলো, তবু একটি লোক সে দেখতে পেলো না।
লুসী দরজার পুরোন পর্দাটা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো। বনহুর তাকে অনুসরণ করলো। ভিতরে প্রবেশ করে থমকে দাঁড়ালো বনহুর। বিস্ময়ে থ’ মেরে গেলো সে!
একটি জমকালো পাহাড় যেন বসে আছে একটা চৌকির উপর। লুসী ততক্ষণে ছুটে গিয়ে জমকালো পাহাড়টার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে–মা মাগো!
জমকালো পাহাড়টা আদতে মানুষ, এবং একটি মহিলা। মাঝারী একটি চৌকির উপর জেঁকে বসে আছে মহিলাটি। সম্মুখে মস্ত বড় একটা পানের বাটা, বাংলাদেশের পানের বাটার মত নয়। ঠিক একটা পিতলের ডেকচির মত।
লুসীকে মহিলাটির বুকের মধ্যে একটি ছোট্ট পুতুলের মত মনে হলো।
কিন্তু আশ্চর্য, লুসীর মা মিসেস বাঞ্ছারাম কন্যাকে দেখে কিছুমাত্র খুশি হয়েছে বলে মনে হলো না। লুসী মায়ের মুখে বারকয়েক চুমু দিয়ে বললো–মা, জানো ইনি কে?
জমকালো মিসেস বাঞ্ছারাম তার গোলাকার প্যাটপ্যাটে চোখ দুটো তুলে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে, তারপর বললো–এ-ই বুঝি তোকে উদ্ধার করে এনেছে?
হাঁ মা, ইনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। সত্যি ইনি না থাকলে আমাকে আর ফিরে পেতে না।
মিসেস বাঞ্ছারাম যখন কথা বলছিলো, তখন মনে হচ্ছিলো বাংলা বলা ঠিকমত অভ্যাস নেই তার। বেশ একটু থিতিয়ে থিতিয়ে বললো–ভালো কথা। যাও লুসী ওকে থাকবার ঘর দেখিয়ে দাও।
একটা ধন্যবাদ বা সহানুভূতিসূচক কোন কথাই উচ্চারণ করলো না মিসেস বাঞ্ছারাম। কন্যাকে ফিরে পেয়ে এতোটুকু খুশি হয়েছে বলে মনে হলো না।
লুসী বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো–আসুন আমার সঙ্গে।
বনহুর নীরবে অনুসরণ করলো লুসীকে।
ওদিকের কামরায় লুসী প্রবেশ করে ডাকলো–আসুন।
বনহুর পাশের কামরায় প্রবেশ করতে গিয়ে একবার ফিরে তাকালো নিজের অজ্ঞাতে মিসেস বাঞ্ছারামের দিকে। বনহুর তাকাতেই দেখলো মিসেস বাঞ্ছারাম কেমন যেন অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাড়াতাড়ি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে পাশের কামরায় প্রবেশ করলো বনহুর।
মিস লুসী তখন পাশের কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে পড়েছে।
বনহুর লুসীর পাশে এসে দাঁড়ালো। সব যেন কেমন রহস্যময় বলে মনে হলো তার কাছে। মিস লুসীকে গঙ্গার বুক হতে উদ্ধার থেকে হোটেল বাঞ্ছারাম পর্যন্ত ঘটনাটি বিদ্যুৎগতিতে মাথায় খেলে গেলো একবার।
মিস লুসী বললো–আপনি এ কক্ষে থাকবেন। এ কক্ষটা আমাদের নিজস্ব গেষ্টদের থাকবার জন্য।
বনহুর একবার কক্ষমধ্যে তাকিয়ে দেখে নিলো। দোতলায় এ কামরাটা খুব ছোট নয়। বাইরের মত ভিতরেও চুন-বালি খসা। ইটগুলো দাঁত বের করে হাসছে। ওদিকে দুটো জানালা। জানালার শিকগুলো সেকেলে, জং ধরে জিরজিরে হয়ে গেছে। কক্ষটা পুরোন হলেও ভিতরের আসবাবগুলো বেশ মূল্যবান এবং আধুনিক। এক পাশে একটা খাট–শাল কিংবা মেহগনি কাঠের তৈরি হবে। খাটে দুগ্ধফেননি শয্যা পাতা রয়েছে। মেঝেতে পুরু কার্পেট, কয়েকখানা সোফাসেট বেশ রুচিমত সাজানো আছে।
লুসী সুইচ টিপে ফ্যান চালু করে দিলো। বললো সে–আপনি বিশ্রাম করুন। আমি খাবার আনছি।
বনহুরকে কোনো কথা বলার সময় না দিয়ে বেরিয়ে গেলো লুসী। খুশিতে আজ সে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
বনহুর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো, তারপর একটা সোফায় বসে সিগারেট কেস্ বের করে একটা সিগারেট ধরালো। ধূম্র পান করতে করতে কক্ষমধ্যে নিপুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলো! হঠাৎ বনহুর দেখলো…তার পায়ের নিচে কার্পেটখানায় এক জায়গায় খানিকটা জমাট রক্ত লেগে আছে। কিন্তু রক্তটা বেশ করে মুছে তুলে ফেলা হয়েছে। লাল কার্পেট রক্তের দাগ চট করে কেউ ধরতে পারবে না। রক্তটা শুকিয়ে কালো হয়ে উঠেছে।
বনহুর উবু হয়ে রক্তের দাগটা ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখছিলো এমন সময় দরজায় পদশব্দ শুনে সজাগ হয়ে বসে সে।
