যতক্ষণ না আপনাকে আপনার মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি, ততক্ষণ আমি নিশ্চিন্ত নই।
মিঃ আলম।
বলুন মিস লুসী?
না থাক, আজ নয় পরে বলবো।
বেশ তাই বলবেন।
লুসী বনহুরের হাতে ব্যাণ্ডেজ বাধা শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। অপূর্ব দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে লুসী বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুরও চট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে না।
লুসী বলে–মিঃ আলম, আপনি কি আমাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়েই চলে আসবেন?
না, আমি কয়েকদিন দিল্লীতে অপেক্ষা করবো, কারণ এ শহরটি আমি দেখিনি।
আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো লুসীর চোখ দুটো, বললো সে–তাহলে আমাদের হোটেলেই থাকছেন তো?
সেকথা এখনও সঠিক বলতে পারি না মিস লুসী।
কেন? আমাদের হোটেলে থাকাটা আপনার কাছে কি কষ্টকর হবে?
ঠিক তা বলছি না, তবে কখন কোথায় থাকবো বলে উঠতে পারছি না কিনা।
না, আপনাকে আমাদের ওখানেই থাকতে হবে।
বেশ, চেষ্টা করে দেখবো।
চেষ্টা নয় থাকতেই হবে। মিস লুসী এতক্ষণে যেন অনেকটা সচ্ছ হয়ে এসেছে। বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে সে। একান্ত আপন জন বলে ওকে মনে হয় ওর।
বনহুর সিগারেট বের করে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে। একরাশ ধুম নির্গত করে বলে মিস লুসী, আপনার আর আমার মধ্যে পরিচয় অতি অস্বাভাবিক। কিন্তু আপনার মধ্যে যে একটি রূপ আমি দেখেছি, সেটা অতি আশ্চর্য।
কি রকম? প্রশ্ন করলো লুসী।
বললো বনহুর–ঠিক আপনার মতই আর একটি মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো।
অবাক হয়ে শুনতে থাকে লুসী!
বনহুর বলে–আমি প্রথমে তাকেই মনে করেছিলাম। কারণ আপনার আর তার মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে।
এবার বুঝেছি–তারই নাম বুঝি মিস আরতী।
হাঁ, সে মেয়েটির নাম মিস আরতী।
আপনার সঙ্গে তার কি সম্বন্ধ মিঃ আলম?
আমার পিয়ানোভক্ত সে।
ও। ছোট্ট একটা শব্দ করলো লুসী।
বনহুর আর লুসী এরপর আর দু’চোখ বন্ধ করলো না। লুসী এবার বনহুরের পাশ থেকে সরে পরের আসনেও গেলো না। ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে রইলো।
লুসীর চোখেমুখে তখনও ভয়ের আভাস।
কথার ফাঁকে বার বার তাকাচ্ছে সে গাড়ির দরজার দিকে।
বনহুর অভয় দিলে বললো–এবার নিশ্চিন্ত থাকুন মিস লুসী, আর সে আসবে না।
*
দিল্লী স্টেশন।
দিল্লী এক্সপ্রেস এসে থামলো।
গাড়ি থামতেই বনহুর আর মিস লুসী নেমে পড়লো। লুসীর চোখেমুখে আনন্দোচ্ছাস–আবার সে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে তার মাতৃভূমিতে।
ট্রেন থেকে নামবার পূর্বেই বনহুর তার কালো চশমাটা পরে নিয়েছিলো। বনহুরের হাতে শুধুমাত্র একটি সুটকেস।
দিল্লী ষ্টেশনে বনহুরের এ প্রথম পদক্ষেপ। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অগ্রসর হলো বনহুর আর মিস লুসী।
সামনে এগুতেই কতগুলো শিখ ড্রাইভার বনহুর আর লুসীকে ঘিরে ধরলো–ট্যাক্সি চাইএ বাবু সাব? ট্যাক্সি চাইএ?
অমনি ঘিরে ধরলো কয়েকজন টাংঙ্গীওয়ালা–টাংঙ্গী লিয়ে বাবুজী? টাংঙ্গী লিয়ে…টাংঙ্গী লিয়ে? বহুৎ জোরদার ঘঘাড়েওয়ালা টাংঙ্গী…
যদিও ভোর হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, লাইটগুলো তখনও দপ দপ করে জ্বলছে। কুলি আর টাংঙ্গীওয়ালাদের চিৎকার আর হাঁকাহাঁকিতে সরগরম হয়ে উঠেছে দিল্লী স্টেশন।
এখানের কুলি, খালাসী সবাই দিল্লীর অধিবাসী, তাদের চেহারা দেখলেই তা বোঝা যায়। দোহারা লম্বা, গায়ের রঙ লালচে-তামাটে, মাথার চুল সামান্য কটা এবং খুব ছোট করে ছাটা। চোখগুলো একটু ঘোলাটে ধরণের। পরনে ঢিলা পাজামা আর হাঁটু অবধি লম্বা ঝুল জামা। মাথায় মস্ত বড় পাগড়ি রয়েছে। কারো কারো মুখে দাড়ি আছে, কারো শুধু গোঁফ। কতকটা পাঞ্জাবী দেশের লোকের মত চেহারা এদের।
আর একটা জিনিস লক্ষ্য করে অবাক হলো বনহুর। এদেশের ভিখারীদের ভিক্ষে করার ভঙ্গী দেখে। বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ওরা হাত দিয়ে হোতনায় আঘাত করে একরকম অদ্ভুত শব্দ করছে– হেঁ কুঁ, হেঁ কু, হুয়া হুয়া, বাবু পয়সা দে, বাবু পয়সা দে…কেউ কেউ উচ্চারণ করছে–বাবু তোর লাথি খাই একটা পয়সা দে…
এ সব অদ্ভুত উক্তি শুনে হাসি পেলো বনহুরের। ভিখারী বাচ্চাগুলো একেবারে জেঁকের মত পিছু লাগলো। বনহুর এদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য দ্রুত পা চালালো। কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা, পয়সা না নিয়ে ছাড়বে না। যদিও বনহুরের ইচ্ছা ছিলো আরও কিছুটা অগ্রসর হয়ে তবে ট্যাক্সি নেবে কিন্তু তা হলো না। অগত্যা একটা ট্যাক্সি সামনে দেখে এগুলো। তখনও পিছনে গুটিকয়েক ট্যাক্সিচালক আর টাংঙ্গীওয়ালা ঘিরে রয়েছে। ভিখারী বাচ্চাদল তো আছেই! বনহুর প্রত্যেকের হাতে কিছু পয়সা গুঁজে দিয়ে ট্যাক্সিতে চেপে বসলো।
এতক্ষণে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো বনহুর।
লুসীও পাশে বসেছে।
শিখ ড্রাইভার বললো–কাঁহা যাইয়ে বাবুসাব?
লুসীই বললো–মোগলাই রোড়ে বাঞ্ছারাম হোটেল।
বহুৎ আচ্ছে। বলে গাড়িতে স্টার্ট দিলো শিখ ড্রাইভার।
বনহুর তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। দিল্লী নগরী কেন্দ্রস্থল অতিক্রম করে ট্যাক্সি তখন ছুটে চলেছে। পথের দু’ধারে সুউচ্চ অট্টালিকা আর মনোরম দোকানপাট। ট্রাম, বাস আর ট্যাক্সিগুলো শ্রেণীবদ্ধভাবে নিজ নিজ পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দোতলা বাসগুলো একটির পর একটি চলেছে, যেন ছোট ছোট। পিপীলিকার মাঝে এক একটি ভেঁয়ে পিঁপড়ে। সত্যি বড় সুন্দর লাগছে বনহুরের কাছে এ দিল্লী শহরটি।
