মিস লুসী চিৎকার করতে যাবে ঠিক সে মুহূর্তে লোকটা লুসীর মুখ বাম হস্তে চেপে ধরলো। তবু একটা আর্তনাদের ক্ষীণ শব্দ বেরিয়ে এলো লুসীর মুখ থেকে।
ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের। তাকিয়েই উঠে বসলো বিদ্যুৎ গতিতে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো জ্বলে উঠলো আগুনের ভাটার মত।
ডাকু তখন মিস লুসীকে চেপে ধরে তার বুকের কাছে সূতীক্ষ্ণধার ছোরাখানা উদ্যত করে ধরেছে।
বনহুর সহসা এগুতে পারলো না, কারণ সে এতোটুকু অগ্রসর হলেই দুবৃর্ত্ত লুসীর বুকে ছোরা বসিয়ে দিতে কসুর করবে না।
দাঁতে দাঁত পিষে বনহুর বললো–কোন সাহসে তুমি এ কামরায় প্রবেশ করেছো?
ডাকুও তেমনি কঠিন কণ্ঠে জবাব দিলো–এ কামরা শুধু তোমার জন্য নয়। তাছাড়া লুসীকে নিয়ে তুমি কোথায় ভাগছো শুনি?
বনহুর অবাক হলো, ডাকু তা হলে নতুন লোক নয়। সে রীতিমত লুসীকে চেনে। বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ হলো, বললো সেলুসীকে তুমি চেনো দেখছি!
শুধু চিনিই না, সে আমার শিকার।
কে তুমি?
হেসে উঠলো ডাকু হাঃ হাঃ হাঃ আমার পরিচয় জানতে চাও! …আমার পরিচয় জানে লুসী।
লুসীর মুখ তখন মরার মুখের মত বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে! চোখেমুখে ভীতি আর উদ্বিগ্নতার চিহ্ন, করুণ চোখে তাকাচ্ছে লুসী বনহুরের মুখের দিকে। লুসী আর্তকণ্ঠে বলে উঠে–ধীরেন, তুমি আবার আমার কাছে এসেছো। ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও আমাকে…
বনহুর বুঝতে পারে–এই সে ধীরেনচরণ ভদ্রে, যার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য লুসী একদিন গঙ্গার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। সুযোগের অপেক্ষা করছে বনহুর, কেমন করে লুসীকে ওর কবল থেকে নিরাপদে সরিয়ে আনবে। এখনও লুসী শয়তানটার হাতের মুঠায়, ওর বুকের কাছে উদ্যত সূতীক্ষ্ণধার ছোরা।
বনহুরের হস্তদ্বয় মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠেছে। অধর দংশন করে সে। শয়তান ধীরেনচরণ লুসীকে নিয়ে পিছন হটছে।
গাড়ি তখন উদ্দাম গতিতে ছুটে চলেছে। গাড়ির জানালাগুলো সব বন্ধ। শুধু দরজাটা খোলা অবস্থায় রয়েছে। গাড়ি যখন লক্ষ্ণৌ ষ্টেশনে দাঁড়িয়েছিলো সে মুহূর্তে শয়তান ধীরেনচরণ গাড়ির পা-দানিতে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তারপর গাড়ি যখন ফুল স্পীডে চলতে শুরু করেছিলো তখন সে প্রবেশ করেছিলো গাড়ির মধ্যে।
ধীরেনচরণ যেমন লুসীকে নিয়ে পিছন হটতে গিয়ে আসনে ধাক্কা খেয়েছে, অমনি বনহুর লাফিয়ে পড়ে। আক্রমণ করে তাকে। আচম্কা আক্রমণে ধীরেন পড়ে যায় গাড়ির মেঝেতে। লুসীও পড়ে যায় তার সঙ্গে। বনহুর লুসীকে এক টানে সরিয়ে দিয়ে বাম হস্তে চেপে ধরে শয়তানটার গলা। আর দক্ষিণ হস্তে ছোরাসহ। ধীরেনের দক্ষিণ হস্তখানা এঁটে ধরে।
শুরু হলো ভীষণ ধস্তাধস্তি।
মিস লুসী ওদিকে দাঁড়িয়ে ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। চোখে মুখে ফুটে উঠেছে দারুণ উৎকণ্ঠতার ভাব।
বনহুর নিরস্ত্র আর ধীরেনচরণের হস্তে সূতীক্ষ্ণধার ছোরা।
বনহুর চেষ্টা করছে ওর হাত থেকে ছোরাখানা সরিয়ে নিতে।
সেকি তুমুল লড়াই। দস্যু বনহুর আর ধীরেনচরণ ভদ্রে। চলন্ত ট্রেন উল্কাবেগে ছুটে চলেছে। মেলের প্যাসেঞ্জারগণ নিজ নিজ আসনে নিশ্চিত মনে ঘুমাচ্ছে, কেউ জানে না তাদেরই ট্রেনের একটি কামড়ায় এতো কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে!
মিস লুসী এগুতে চেষ্টা করছে…গাড়ির চেইন টানবে, কিন্তু ওদিকে যাবার সুযোগ পাচ্ছে না।
ধীরেনচরণ যতই শক্তিমান হোক, দস্যু বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠা মুস্কিল।
ধীরেন অল্পক্ষণেই কাবু হয়ে পড়লো। তার হাতের ছোরাখানা ছিটকে পড়েছে দূরে। এবার সে প্রাণ বাঁচিয়ে পালাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
বনহুরের এক একটা ঘুষি এসে পড়ছে ধীরেনচরণের নাকের উপর। এবার সে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
দিল্লী এক্সপ্রেস যখন লক্ষৌ ব্রীজ অতিক্রম করছিলো। ধীরেন হঠাৎ বনহুরের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে লাফিয়ে পড়লো ব্রীজের নিচে যমুনাবক্ষে।
বনহুর ট্রেনের দরজায় ঝুঁকে তাকালো নিচের দিকে। গাঢ় অন্ধকারে কিছু দেখা গেলো না। ট্রেন তখন ব্রীজ অতিক্রম করে ছুটে চলেছে।
দরজা বন্ধ করে ফিরে এলো বনহুর মিস লুসীর পাশে। পাশের আসনে ছিটকে পড়া ধীরেনের হস্তের ছোরাখানা হাতে তুলে নিয়ে একবার ছোরাখানা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো জানালা দিয়ে বাইরে।
লুসীর দু’চোখে বিস্ময়! নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে সে বনহুরের বলিষ্ঠ দীপ্ত ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডলের দিকে। হঠাৎ লুসীর দৃষ্টি চলে যায়, দেখতে পায় বনহুরের দক্ষিণ বাহুর একটি জায়গা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। হয়তো ধীরেনচরণের ছোরার সামান্য একটু আঁচড় লেগেছিলো।
লুসী ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠেই কি সর্বনাশ, আপনার হাত কেটে রক্ত পড়ছে!
লুসীর কথায় বনহুর ফিরে তাকায় নিজের বাহুর দিকে। এতোক্ষণ সে খেয়ালই করেনি, তার বাহু কেটে রক্ত পড়ছে।
তাড়াতাড়ি লুসী বনহুরের ক্ষতটা চেপে ধরে। তারপর নিজের রুমাল দিয়ে বেঁধে দিতে থাকে যত্ন করে। বলে সে আমার জন্য আপনাকে এতো কষ্ট ভোগ করতে হলো মিঃ আলম!
বনহুর পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলে–এমন কিছু হয়নি মিস লুসী, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
সত্যি আপনার মত মহঞ্জন আমি এর পূর্বে দেখিনি। আপনি মহান ব্যক্তি।
অত্যন্ত বাড়িয়ে বলেছেন মিস লুসী।
না, আমি একটুও বাড়িয়ে বলিনি। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
