না ঠিক বেড়াতে যান না।
তবে?
তিনিও বাঞ্ছারাম হোটেলের একজন মালিক। কারণ বাবার হোটেলে তারও শেয়ার আছে।
তাই তিনি হিসাব-নিকাশ নিতে যান আর কি?
হ, আপনি ঠিক বলেছেন।
আপনি কি তাকে ছোটবেলা হতেই দেখে আসছেন?
ছোটবেলা হতেই তাকে দেখে আসছি।
আচ্ছা মিস লুসী?
বলুন?
আপনার বাবার বন্ধুর নামটা কি এখনও কিন্তু আমাকে আপনি বলেন নি।
আমার বাবার বন্ধুর নাম কালীচরণ ভদ্রে।
আর তার সন্তানের?
ওর নাম ধরতে আমার কণ্ঠ আড়ষ্ট হয়ে আসে।
তবু বলতে হবে?
ধীরেনচরণ ভদ্রে।
ধীরেনচরণ ভদ্রে?
হাঁ, বড় শয়তান, বড় দুষ্ট সে।
আমি তাকে চিনি মিস লুসী, তার বাবা কালিচরণ ভদ্রের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। কলকাতার ধনী স্বর্ণ ব্যবসায়ী কালীচরণ?
আপনি ঠিক বলেছেন। বাবার বন্ধু তিনিও স্বর্ণ ব্যবসায়ী বটে। কিন্তু তিনি তো প্রকাশ্যে এ ব্যবসা করেন না? আপনি কি করে জানেন এ সংবাদ?
আমার অজানা কিছুই নেই মিস লুসী। আপনার বাবার বন্ধুর বাড়িটাও আমি চিনি–টালীগঞ্জে।
আপনি দেখছি সব জানেন।
হাঁ, আমি চিনি। এখন আপনাকে সচ্ছন্দে আপনার বাবার বন্ধুর কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
না না, আমি ওখানে আর যাবো না। আমি ওখানে আর যাবো না…
তাহলে আপনি কোথায় যাবেন বা যেতে চান?
আমার মায়ের কাছে আমাকে পৌঁছে দিন।
দিল্লী?
হাঁ, আমাকে দিল্লী রেখে আসুন। আমাকে আপনি বাঁচিয়েছেন, এ কাজটুকু আপনাকে করতেই হবে।
বনহুর তখন ভেবে চলেছে…কি আশ্চর্য! মিস আরতী আর মিস লুসীর মধ্যে কি অদ্ভুত মিল রয়েছে। কিছুতেই এদের দু’জনকে পৃথক বলে মনে হয় না। মিস আরতী কলকাতায় আর মিস লুসী কোন্ সুদূর দিল্লী শহরে…
কি ভাবছেন আপনি?
ভাবছি আপনার কথা।
হাঁ, আমাকে উদ্ধার করে আপনি ভুল করেছেন মিঃ আলম। এখন আমার বোঝা আপনাকে অত্যন্ত বিব্রত করে তুলেছে।
না, এ তেমন আর কি। দিল্লী শহরে কোনদিন যাইনি, একবার গেলে শহরটা দেখে আসা যাবে।
বনহুরের কথায় খুশি হলো মিস লুসী, বললো সে আমাদের হোটেলেই থাকবেন, মা আপনাকে পেলে অনেক খুশি হবেন।
মিস লুসীর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা করার পর বনহুর নিজ কক্ষে চলে গেলো।
*
দিল্লী এক্সপ্রেস।
উল্কাবেগে গাড়ি ছুটে চলেছে।
ফার্স্ট ক্লাশ কামরায় শুধু বনহুর আর লুসী।
ওদিকের সিটে মিস লুসী জড়োসড়োভাবে বসে আছে গাড়িতে হেলান দিয়ে। চোখমুখ তার নিতান্ত স্বচ্ছ স্বাভাবিক নয়। হাজার হলেও সে একটি তরুণী। অজানা-অচেনা এক যুবকের সঙ্গে নির্জন এক ক্যাবিনে তার মনে নানারকম সঙ্কোচ আর দ্বিধার উদয় হচ্ছিলো। মনের ভাব-ধারার কিঞ্চিৎ প্রকাশ পাচ্ছিলো তার চোখেমুখে।
বনহুর যদিও একটা বইএর মধ্যে ডুবে ছিলো তবুও দৃষ্টি মাঝে মাঝে চলে যাচ্ছিলো মিস লুসীর দিকে। লুসীর অবস্থা মনে মনে বেশ আঁচ করে নিচ্ছিলো সে। কারণ একটা যুবতী একটি যুবকের পাশে নিতান্ত একা– সত্যি বড় অসহায়! হাসি পাচ্ছিলো বনহুরের লুসী বার বার হাই তুলছে কিন্তু ঘুমানোর সাহস হচ্ছে না তার।
বনহুর বসেছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত আসনে। মাঝে প্রচুর জায়গা রয়েছে। বনহুর এবার বইখানা বন্ধ করে রেখে হাতঘড়ির দিকে তাকালো–রাত একটা পঁচিশ। মিস লুসী, আপনি শুয়ে পড়ুন। কথাটা শেষ করে বনহুর নিজে শুয়ে পড়লো হাতের উপর মাথাটা রেখে।
লুসী কিন্তু তবু শুতে পারলো না, বসে বসে হাই তুলছে।
বনহুর শুয়ে পড়লেও সহজে সে ঘুমাতে পারলো না, হাতের আড়ালে সে লুসীকে লক্ষ্য করছে। লুসীর সুন্দর মুখখানা তাকে আকৃষ্ট করছে; তার মধ্যে জেগে উঠেছে পুরুষত্ব মনোভাব। কিন্তু তার স্বভাব নয় দুর্বলের প্রতি অন্যায় আচরণ করা। লুসী এখন একটি পিঞ্জিরাবদ্ধ পাখির মত অসহায়। তার প্রতি যে কোনো অত্যাচার করলে সে পারবে না এতটুকু বাধা দিতে! পারবে না সে চিৎকার করে কাউকে ডাকতে বা লাফিয়ে পড়ে প্রাণ। বিসর্জন দিতে। ক্যাবিনের দরজা-জানালা এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। একটু পূর্বে মুষলধারে বারিপাত শুরু হয়েছিলো। ‘ বৃষ্টির ঝাপটা আসছিলো কামরার ভিতরে, তাই বনহুর বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিয়েছে জানালাগুলো। এখনও বাইরে বৃষ্টি পড়ছে অবিরত।
বনহুর মাথা উঁচু করে বললো–মিস লুসী, আপনি শুয়ে পড়ুন।
মিস লুসী তবু সাহস পাচ্ছিলো না, কি জানি যদি ঘুমিয়ে পড়লে মিঃ আলম তাকে আক্রমণ করে। অজানিত একটা ভয় তার মনকে চঞ্চল করে তুলছিলো।
বনহুর তার মনোভাব বুঝতে পেরে হেসে বললো–মিস লুসী, আপনি যা ভাবছেন তা মিথ্যা। আপনি নিঃসন্দেহে ঘুমাতে পারেন।
এবার লুসী না শুয়ে পারলো না।
বনহুর বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লো।
এবার সত্যি ঘুমিয়ে পড়লো লুসী আর বনহুর।
দিল্লী মেল তখন তীর বেগে ছুটে চলেছে।
এক সময় ঘুম ভেঙে গেলো লুসীর। ধড়ফড় উঠে বসলো সে। অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে। তাকালো ওদিকে সিটের দিকে। মিঃ আলম অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। সত্যি, ভদ্রলোক অত্যন্ত সৎ এবং মহৎ। শ্রদ্ধায় মিস লুসীর মাথা নুয়ে এলো যেন। এমন পুরুষ সে কমই দেখেছে, তাকে একা নিঃসঙ্গ অবস্থায় পেয়েও এ যুবকটি কোনো রকম কুৎসিৎ ইঙ্গিত করেনি।
মিস লুসী তাকিয়ে রইলো বনহুরের ঘুমন্ত মুখের দিকে। এমনভাবে মিস লুসী ওকে কোনোদিন দেখেনি। বড় ভালো লাগলো ওকে! সুন্দর বলিষ্ঠ দীপ্তময় একটি ঘুমন্ত মুখ।
কতক্ষণ লুসী তাকিয়ে ছিলো বনহুরের ঘুমন্ত মুখের দিকে খেয়াল নেই। হঠাৎ দেখলো সে…চলন্ত গাড়িখানার দরজা খুলে গেলো আস্তে করে! একটা গালপাট্টাবাধা লোক প্রবেশ করলো গাড়ির মধ্যে। লোকটার হাতে সূতীক্ষ্ণধার একটা ছোরা, ক্যাবিনের আলোতে ঝকঝক করে উঠলো।
