অভয়কর বিশ্বাস…সে কেন আমার বাবা হতে যাবেন! আমি তাকে চিনি না।
মিস আরতী…
আমাকে আরতী বলে ডাকবেন না, কারণ আমি মিস আরতী নই।
তবে আপনি কে?
আমি মিস লুসী ফিগাই।
লুসী ফিগাই।
হাঁ, আমার ঐ নাম।
আপনি মিস আরতী নন?
না না না, আমি আরতী নই। মিস আরতী কে আমি চিনি না।
বনহুর বিস্ময়ভরা নয়নে তাকিয়ে থাকে ওর মুখের দিকে। আরতী নয়–মেয়েটি শেষ পর্যন্ত উন্মাদ হয়ে গেলো! আরতীকে সে ভালোভাবে চেনে। সে মুখ, সে চোখ, কথা বলার সে ভঙ্গী–না না, এ আরতী না হয়েই যায় না।
বনহুর তখন আরতীকে বিশ্রাম করতে বলে পাশের কক্ষে চলে যায়।
*
আরতীকে শেষ পর্যন্ত কিছুতেই রাজি করাতে পারে না বনহুর। তার বাবা অভয়কর বিশ্বাস নয়–এ কথাই সে বারবার বলে চলে।
বনহুর একদিন একজনু বিজ্ঞ ডাক্তার ডেকে আরতীকে পরীক্ষা করলো, সত্যিকার কোনোরকম মস্তিষ্ক বিকার ঘটেছে কিনা? কিন্তু ডাক্তার বললেন, আরতীর মস্তিষ্ক স্বাভাবিক আছে, কোনোরকম অসুখ এখন তার নেই।
বনহুর চিন্তিত হলো…আরতী তাকে চিনতে না পারলেও আরতীকে সে ভালোভাবে চেনে। আরতী মাসুদ ইরানীর পিয়ানোর সুর ভালোবাসতো, কতদিন সে মাসুদ ইরানীর পাশে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছে। কাজেই আরতী তার অতি পরিচিত জন।
সেদিন রাত্রিতে বনহুর পাশের কামরায় শুয়ে শুয়ে মিস আরতীর কথা ভাবছে। আজ প্রায় সপ্তাহ হতে চললো আরতীকে গঙ্গার বুক থেকে উদ্ধার করে এনেছে। বনহুর ভেবেছিলো, আরতীর জ্ঞান ফিরে এলেই তাকে তার বাসায় পৌঁছে দেবো, কিন্তু যা ভেবেছিলো তা হয়নি। আরতীর জ্ঞান ফিরে আসার পর কিছুতেই স্বীকার করেনি–সে আরতী। হঠাৎ বনহুর শয্যা ত্যাগ করে, ওদিকে রাখা শ্যালনের পিয়ানোর পাশে গিয়ে বসে সে। বনহুর জানে পিয়ানোর সুর আরতীর অতি প্রিয়, বিশেষ করে মাসুদ ইরানীর হাতে। এই আরতীর স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে আনার নিপুণ কৌশল।
বনহুর পিয়ানো বাজাতে শুরু করলো।
অদ্ভুত অপূর্ব সুর!
আরতী কিন্তু যেমন শয্যায় শুয়েছিলো তেমনি শুয়ে রইলো। যদিও সে পিয়ানোর সুরে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু শয্যা ত্যাগ করে ছুটে যায়নি।
বনহুর বার বার তাকাচ্ছিলো দরজার দিকে, এবার হয়তো আরতী ছুটে আসবে তার পাশে। কিন্তু কই সে তো এলো না।
পিয়ানো বাজানো বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো বনহুর! পর্দা ঠেলে প্রবেশ করলো আরতীর কক্ষে। আরতী শয্যায় যেমন শুয়েছিলো তেমনি শুয়ে আছে। বনহুর অবাক হলো…আরতী তার পিয়ানো বাজানো শুনলে কিছুতেই এভাবে শয্যায় শুয়ে থাকতে পারতো না। তবে কি এ আরতী নয়?…
বনহুর আরতীর শয্যার পাশে এসে দাঁড়ালো।
আরতী অবাক হয়ে উঠে বসলো, কারণ আজ এক সপ্তাহের মধ্যে কোনোদিন রাতে এ লোকটি তার কক্ষে প্রবেশ করেনি। আজ হঠাৎ এ গভীর রাতে সে তার কামরায় কি উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করেছে। ভীত হলো সে মনে মনে–তবে কি কোনো কুৎসৎ অভিসন্ধি নিয়ে এসেছে!
বনহুর আরতীর দিকে তাকিয়ে বললো–মিস লুসী, আজ আমাকে আপনি সব খুলে বলুন। আমি সব শুনবো। কারণ, আমি এতদিন জানতাম, আপনি আরতী দেবী ছাড়া অন্য কেউ নন, কিন্তু আজ আমার সে ভুল ভেঙে গেছে। বলুন আপনি কে? কি আপনার পরিচয়?
আমি কতদিন বলতে চেয়েছি, আপনি শুনতে চাননি।
আজ বলুন, সব খুলে বলুন মিস লুসী? বনহুর একটা সোফা টেনে বসে পড়লো।
আমি মিস আরতী নই আপনাকে পূর্বেই বলেছি। আমার নাম মিস লুসী ফিগাই। আমার বাড়ি কলকাতায় নয়–দিল্লী শহরে।
দিল্লী!
হাঁ। আমার বাবা ছিলেন দিল্লীর বাঞ্ছারাম হোটেলের মালিক বাঞ্ছারাম ফিগাই।
বনহুর মনের মধ্যে এ নামটা বার দুই উচ্চারণ করে নিলো তারপর বললো–বলুন? সব বলুন আপনি?
আমি কোনোদিন কলকাতায় আসিনি। আমার বাবার এক বন্ধু কলকাতায় থাকেন। তারই সঙ্গে আমি কলকাতায় বেড়াতে আসি। আমার বাবার বন্ধুকে আমি কাকা বলে ডাকি, তিনিও আমাকে মেয়ের মত ভালোবাসতেন। বিশ্বাস করে তার সঙ্গে চলে এসেছি, কিন্তু আমার বাবার বন্ধুর ছেলে আমার উপর অত্যন্ত জঘন্য আচরণ করেছে। সে আমাকে ফুসলিয়ে তার গাড়িতে বেড়ানোর নাম করে নিয়ে এসেছিলো, কিন্তু পরের ঘটনা অত্যন্ত অশোভনীয়…আমি এর বেশি আর বলতে পারবোনা। আমি তার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য গঙ্গায় লাফিয়ে পড়েছিলাম…একটু নিশ্চুপ থেকে বললো আবার মিস লুসী–আপনি কেন আমাকে বাঁচালেন? আমাকে কেন আপনি বাঁচালেন?
আপনি উত্তেজিত হবেন না মিস লুসী, আমি যা জিজ্ঞাসা করবো সঠিক জবাব দিন?
লুসী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় বনহুরের মুখের দিকে। লোকটাকে একদিন সে অবিশ্বাস করেছিলো, প্রথমে ভেবেছিলো এ সে লোক যে তার সর্বনাশ করতে চেষ্টা নিয়েছিলো। কিন্তু পরে সে ভুল ভেঙে গিয়েছিলো লুসীর, যখন তার সম্পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এসেছিলো। এর মুখে সে ঐ কুৎসিৎ লালসাপূর্ণ ভাব দেখতে পায়নি। এর কণ্ঠে শুনতে পায়নি সে প্রিয়সী সম্বোধন। লুসী আশ্বস্ত হয়েছিলো। বনহুরের আচরণে সে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলো, ভাল লেগেছিলো ওকে। বললো লুসী–বলুন!
বনহুর প্রশ্ন করলো–আপনার বাড়ি দিল্লী? আর আপনার বাবা ছিলেন দিল্লী শহরের বাঞ্ছারাম হোটেলের মালিক বাঞ্ছারাম?
হা।
এখন বাঞ্ছারাম জীবিত নেই?
না।
আপনার মা আছেন?
আছেন। তিনিই এ হোটেল দেখাশোনা করেন।
আপনার বাবার বন্ধুর বাড়ি কলকাতা বলেছেন কিন্তু তিনি মাঝে মাঝে দিল্লী বেড়াতে যান।
