হঠাৎ আবার একি এক সমস্যা এসে দাঁড়ালো তার সম্মুখে। কে এই লম্পট শয়তান যে আরতীর ইজ্জৎ লুটে নেবার চেষ্টা করছিলো। গভীর রাত্রিতে ব্রীজের উপর তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে কাবু করে নিয়েছিলো। আরতী নিশ্চয়ই শয়তান লোকটির হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য গঙ্গার জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। ঠিক সে মুহূর্তে সে যদি ঐ স্থানে গিয়ে না পৌঁছতো তাহলে আরতীকে বাঁচানো যেতো না। কেউ জানতে পারতো না আরতী কোথায় চলে গেছে। অর্থলোভী অভয়কর বিশ্বাস অর্থের লোভে তখন খিদিরপুর ডকে মৃত মহাতকের পাশে দাঁড়িয়ে টাকার জন্য বিলাপ করছে।
মাগো, উঃ…
ফিরে তাকায় বনহুর, চিন্তাজাল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার। আরতীর জ্ঞান ফিরে এসেছে। বনহুরের মুখমণ্ডল দ্বীপ্ত-উজ্জ্বল হয়ে উঠে। এতোক্ষণ একটা দুঃচিন্তা বনহুরের মনে উঁকি দিচ্ছিল–আরতীর জ্ঞান আর ফিরে যদি না আসে। যদি ওর মৃত্যু হয় তাহলে তখন কি হবে। সরে আসে আরতীর পাশে, ঝুঁকে পড়ে বনহুর–আপনি কি খুব অসুস্থ বোধ করছেন?
আরতী চোখ দুটো মেলে তাকায়, তখন সম্পূর্ণ জ্ঞান ফিরে আসেনি। বনহুরের কণ্ঠ তার কানে পৌঁছেছে কিনা সন্দেহ। অর্ধ-নিৰ্মীলিত আঁখি দুটি বনহুরের মুখে স্থির রেখে বলে আরতী–আমি কোথায়?
বনহুর আরতীর পাশে একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে বলে–আপনি নিরাপদ স্থানে শুয়ে আছেন।
না, আমাকে তুমি ধরে এনেছো। তুমি শয়তান…
বনহুর দেখলো হঠাৎ আরতী বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।
তার কণ্ঠ ক্ষীণ জড়িত হলেও তাতে ক্রুদ্ধভাব প্রকাশ পাচ্ছে। এতো বেশি উত্তেজিত হলে পুনরায় অজ্ঞান হতে পারে। বনহুর আরতীর দৃষ্টি নিজের দিকে ভালোভাবে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে বললো–আমি সে নই।
না না, আমি তোমার সব চালাকি জানি। দুষ্ট বদমাইশ শয়তান কোথাকার…
মিস আরতী, আপনি অযথা ক্রুদ্ধ হচ্ছেন। আমি সে নই, ভাল করে তাকিয়ে দেখুন, আমি সে নই।
তবু আরতী উম্মাদের মতো বলে চলেছে আমাকে যেতে দাও। আমাকে যেতে দাও। আমি তোমার সব চালাকি জানি। শয়তান হরনাথ, তুমি আমাকে নতুন নামে ডেকে ভোলাতে চেষ্টা করছো!
হরনাথ–নতুন নামে ডেকে…এসব কি বলছে আরতী! তবে কি গঙ্গার বুকে হাবুডুবু খেয়ে তার মস্তিষ্ক বিকার ঘটেছে। হয়তো তাই হবে, কিন্তু ওর আরও বিশ্রাম দরকার। বনহুর আরতীর মাথায় হাত রেখে শান্তস্বরে বললো–আপনি এখন ঘুমাতে চেষ্টা করুন। পরে আপনাকে আপনার পিতার কাছে পৌঁছে দিবো।
বনহুরের কথায় আরতী ঘুমালো না বা চোখ মুদলো না। সে ভালো করে তাকালো বনহুরের দিকে, ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি যেন স্থির হয়ে এলো। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বললো–কে, কে আপনি?
আমার পরিচয় পরে জানতে পারবেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি শয়তান নই। মিস আরতী…আপনি…
আরতী? কে আরতী? আমি আরতী নই।
আপনি এখনও সুস্থ হননি, সুস্থ হলেই সব বুঝতে পারবেন।
আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছি। আমি আরতী নই–আমি আরতী নই…
ভোরের আলো তখন ফুটে উঠেছে।
বনহুর বয়কে ডেকে বললো–গরম দুধ নিয়ে আয়।
অল্পক্ষণে গরম দুধ এলো।
বনহুর বয়ের হাত থেকে দুধের গেলাস হাতে নিয়ে বললো–নিন, এ গরম দুধটুকু খেয়ে নিন।
আরতী কিন্তু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে তন্ময় হয়ে দেখছে, হয়তো ভাবছে–কে এ যুবক।
বনহুর বলে–আমি কি খাইয়ে দিবো?
উঠে বসে আরতী, হাত বাড়িয়ে বনহুরের হাত থেকে দুধের গেলাসটা হাতে নেয়।
বনহুর বলে–আপনি দুধটুকু খেয়ে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমান।
যতক্ষণ জানতে না পেরেছি আমি কোথায়, ততক্ষণ আমি ঘুমাতে পারবো না।
বেশ, আমি বলছি–আপনি এখন হাওড়া শালাকিয়া এরিয়ার একটি বাসায় রয়েছেন। এ বাসাটি আমার। আমান নাম মিঃ আলম।
আশ্চর্য কণ্ঠে বললো আরতী হাওড়া! আমি কি তাহলে কলকাতায় এসেছি?
সেকি! সে কি আপনি তো কলকাতাই থাকেন।
না না, আমি কলকাতায় থাকি না। আমি কলকাতা চিনি না।
আপনি এসব কি বলছেন মিস আরতী?
কে–কে আরতী! আমি আরতী নই…
বনহুর বুঝতে পারলো, আরতীর স্বাভাবিক জ্ঞান এখনও ফিরে আসেনি। সে নিশ্চুপ রইলো কিছুক্ষণ, তারপর বললো–আপনি দুধটুকু খেয়ে নিয়ে, আপনার জামা-কাপড় পাল্টে নিন। কারণ এখনও আপনার জামাকাপড় সম্পূর্ণ ভিজা রয়েছে।
বলুন আপনি হরনাথের কে?
আমি তার কেউ নই! যা পরে সব জানতে পারবেন, আপনি অনুগ্রহপূর্বক আপনার জামা-কাপড় পাল্টে নিন। কিন্তু দুধের গেলাসটা আগে শূন্য করে ফেলুন দেখি?
এবার আরতী তার হস্তস্থিত গেলাসের দুধটুকু এক নিঃশ্বাসে পান করে নিলো।
বনহুর বললো–পাশের কামরায় জামা-কাপড় আছে..
বনহুর কথা শেষ না করে হঠাৎ থেমে গেলো, তারপর বললো কিন্তু আমার বাসায় তো কোন মেয়েমানুষ নেই। মিস আরতী, আপনাকে আমার পাজামা আর পাঞ্জাবী পরতে হবে।
আরতী গম্ভীর কণ্ঠে বললো–আমি ওসব পরতে পারবো না। তাছাড়া আমার জামা-কাপড় প্রায় শুকিয়ে গেছে।
অনেক বলেও আরতীর জামকাপড় পাল্টানো গেলো না। সে যেমন ছিলো তেমনি রইলো। এবার আরতী জেদ ধরে বসলো–আমাকে দেশে পৌঁছে দিন।
দেশ! অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করলো বনহুর।
হাঁ, আমার দেশে আমাকে পৌঁছে দিন।
বেশ তো, একটু সুস্থ হয়ে উঠুন, আপনার বাবার কাছে আপনাকে পৌঁছে দিবো।
বাবা? আমার তো বাবা নেই।
সেকি, আপনি দেখছি গঙ্গায় ডুবে সব ভুলে গেছেন! আপনার বাবা অভয়কর বিশ্বাস কলকাতার ধনকুবের…
