বনহুর গাড়ি ব্রেক কষে থামিয়ে ফেললো। স্পষ্ট দেখতে পেলো– ব্রীজের এক পাশে একটি ছোট্ট কার দাঁড়িয়ে আছে। কারটি ঐ ধস্তাধস্তিরত ব্যক্তিদ্বয়ের বলেই মনে হলো।
বনহুর গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো।
ঠিক সে মুহূর্তে মহিলাটি পুরুষ লোকটির হাত থেকে নিজকে বাঁচিয়ে নিয়ে লাফিয়ে পড়লো গঙ্গার জলে।
বনহুর ছুটে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো, একবার লোকটির দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখে নিলো, পরক্ষণেই বনহুর ঝাঁপিয়ে পড়লো গঙ্গার বুকে।
যেমন করে হোক মহিলাটিকে বাঁচাতেই হবে। কে এ মহিলা, আর পুরুষ লোকটিই বা কে? কিন্তু পুরুষ লোকটি তখন দ্রুত তার গাড়িতে গিয়ে চেপে বসেছে। অল্পক্ষণেই গাড়ি নিয়ে লোকটা অদৃশ্য হলো ব্রীজের ওপাশে।
বনহুর তখন গঙ্গার অথৈ জলে মহিলাটির সন্ধানে হাতড়ে চলেছে।
২.১০ দিল্লীর বুকে দস্যু বনহুর
বনহুর যখন গঙ্গার বুক থেকে তীরে উঠে এলো, তখন তার হাতের উপর এগিয়ে আছে সংজ্ঞাহীন এক নারী-দেহ। যদিও গঙ্গাবক্ষস্থ ভাসমান ল্যাম্পের আলো এবং ব্রীজের লাইটের ঝাপটা আলো-রশ্মি এসে পড়ছিলো তবু বনহুর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো না, কে এ নারী।
বনহুর যখন সংজ্ঞাহীন নারীটিকে নিয়ে তার গাড়ির পাশে এসে পৌঁছলো তখন লাইটের উজ্জ্বল আলোতে মেয়েটিকে দেখে চমকে উঠলো, এ যে অভয়কর বিশ্বাসের কন্যা আরতী দেবী। ভাগ্যিস, আশেপাশে তখন কোন লোক ছিল না। গভীর রাত্রির নির্জনতায় ভরে উঠেছিলো গঙ্গাতীর ও ব্রীজের উপরিভাগ। বনহুর আর বিলম্ব করা উচিৎ মনে করলো না। হঠাৎ তাকে এবং আরতী দেবীকে দেখলে লোকে নিশ্চয়ই জঘন্য কিছু মনে করে বসবে। বিপদে পড়ার ভয় করে না বনহুর কিন্তু একটা অহেতুক হট্টগোল বা ফ্যাসাদ এ সময় পছন্দ নয়। তার। বনহুর গাড়ির পিছন আসনে আরতী দেবীকে শুইয়ে দিয়ে ড্রাইভিং আসনে চেপে বসলো। যদিও তার ভিজে কাপড়ে খুব অসুবিধা হচ্ছিলো, তবু নিপুন ড্রাইভারের মত গাড়ি চালিয়ে চললো।
বনহুরের গাড়ি যখন তার বাসায় এসে পৌঁছলো, তখন চাকর-বাকর সব নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। আরতীর। সংজ্ঞাহীন দেহটা নামিয়ে নিজের শয্যায় এনে শুইয়ে দিলো বনহুর। কিন্তু ভিজে কাপড়ে ওকে এভাবে কতক্ষণ রাখা যায়। এতে খারাপ হবার সম্ভাবনা আছে যথেষ্ট।
ভিজে কাপড়টা আরতীর দেহের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে লেপটে গিয়েছিলো, সহজে খুলে ফেলার কোন উপায় ছিলো না। বাসায় কোনো মেয়ে পরিচারিকা নেই, তা হলেও তাকে নিয়ে ওর কাপড়-চোপড় পাল্টে নেওয়া যেতো।
বনহুর লাইটের উজ্জ্বল আলোতে তাকালো আরতীর এলিয়ে-পড়া সংজ্ঞাহীন দেহটার দিকে। যৌবনভরা দীপ্তময় একটি দেহ-বনহুর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। একটা সঙ্কোচ আর দ্বিধা তার মনকে সঙ্কোচিত করে ফেললো। অসম্ভব, সে কিছুতেই ওর জামা-কাপড় পাল্টে দিতে পারবে না। পারবে না ওর দেহে হাত। রাখতে।
কিন্তু ভোর হতেও বেশি বিলম্ব নেই। অল্পক্ষণ পরে চাকর-বাকর সব জেগে পড়বে, তখন ওকে এ অবস্থায় তার বিছানায় শায়িত দেখলে নিশ্চয়ই ওদের মনে নানারকম সন্দেহ জাগবে। তাছাড়া এভাবে রাখাটা ঠিক নয়। বনহুর একটা চাদর এনে আরতীর দেহে মুড়ে দিলো। তারপর মুক্ত জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ইতিমধ্যে বনহুর নিজের ভিজে কাপড় পাল্টে নিয়েছে। সিগারেট বের করে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো বনহুর।
ভোরের আকাশ সবে তখন ফর্সা হতে শুরু হয়েছে।
বনহুর একটির পর একটি সিগারেট নিঃশেষ করে চললো। মনের মধে: নানারকম ভাবনার ফুলঝুরি ঝরে। পড়তে লাগলো। আরতীকে সে দেখেছিলো একদিন অভয়কর বিশ্বাসের বাসভবনে। মাসুদ ইরানীর বেশে যেদিন সে পিয়ানো বাজাচ্ছিলো সেখানে। সেদিন বনহুর আরতীর পরিচয় জানতো না, তবে মেয়েটি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো সকলের অজ্ঞাতে। আরতীর মধ্যে সে দেখেছিলো সত্যিকারের একটি আদর্শ নারী-মূর্তি। ধীরস্থিরা গম্ভীরা একটি যুবতী তারপর আরতীই একদিন স্বয়ং গিয়ে হাজির হয়েছিলো মাসুদ ইরানীর খোঁজে স্বপ্নরাগ হোটেলে একেবারে তার ক্যাবিনে। সেদিন বনহুর তার চোখেমুখে যে উচ্ছ্বাস আর আনন্দের দ্যুতি দেখেছিলো সত্যি তা অপূর্ব। মাসুদ ইরানীর পিয়ানোর সুরে সে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। প্রায়ই সে যেতো মাসুদ। ইরানীর পিয়ানো শুনতে। কিন্তু যেদিন থেকে মাসুদ ইরানী হারিয়ে গেলো শ্যালনের মধ্যে সেদিন থেকে আরতীও আর তার মাসুদ ইরানীর সন্ধান পায়নি। শুধু আরতীই নয়, সমস্ত কলকাতায় মাসুদ ইরানীর অন্তর্ধান। নিয়ে একটা তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিলো। পত্রিকায় পত্রিকায় এ ব্যাপার নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে। কিন্তু মাসুদ ইরানীর সন্ধান আর পাওয়া যাচ্ছে না। সবচেয়ে মাসুদ ইরানীর ভক্তগণ মুষড়ে পড়েছিলো বেশি।
পত্রিকায় মাসুদ ইরানী সম্বন্ধে নানারকম আলোচনা পড়ে হাসতে বনহুর। সমস্ত কলকাতাবাসীর মনে সে অহেতুক একটা চঞ্চলতা সৃষ্টি করছে। কিন্তু সরে না পড়ে কোনো উপায় ছিলো না। বিশেষ করে শ্যালনের জন্য তাকে সরে পড়তে হয়েছে। শ্যালন ভালবেসে ছিলো মাসুদ ইরানীকে, তাই বনহুর ছলনা করে আর্থারকে সাজিয়ে ছিলো সে মাসুদ ইরানীর ড্রেসে। তার বাসনা সিদ্ধ হয়েছে। শ্যালনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পেতে সক্ষম হয়েছে সে।
বনহুর মুক্তির নিশ্বাস ফেলেছিলো।
