বনহুর যখন খিদিরপুর পুলিশ অফিসে এসে পৌঁছলো তখন খিদিরপুর থাকা অফিসার একটা কেস থেকে সবেমাত্র ফিরে এসেছেন। চেয়ারে বসে কেবলমাত্র একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করবেন ঠিক সে মুহূর্তে বনহুর থানার মধ্যে প্রবেশ করে ব্যস্ত কণ্ঠে জানালো স্যার, এক্ষুণি আপনাকে খিদিরপুর ডকে যেতে হবে। একটা মালবাহী জাহাজে এমাত্র খুন হয়েছে!
খুন হয়েছে?
হা স্যার।
আপনি কে?
আমি অভয়কর বিশ্বাসের একজন কর্মচারী। স্যার, শুধু খুন নয়– আমাদের মালিকের প্রায় লক্ষ টাকার। বেশি টাকাসহ ব্যাগ নিয়ে হত্যাকারী উধাও হয়েছে।
হত্যাকারী টাকাও নিয়েছে?
হাঁ স্যার। আপনি বিলম্ব করবেন না স্যার, এক্ষুণি চলুন।
বনহুর জানে, পুলিশ সন্ধান নিলেই সমস্ত গোপন ব্যাপার ফাঁস হয়ে যাবে। চোরা কারবারের জন্য অভয়কর বিশ্বাসও রেহাই পাবে না। সমস্ত সিমেন্ট আটক হবে পুলিশের হাতে!
নিজের গাড়িতে করেই বনহুর নিয়ে চললো ও-সি এবং কয়েকজন পুলিশকে।
খিদিরপুর ডকে পৌঁছতে বেশি বিলম্ব হলো না। বনহুর স্বয়ং পুলিশবাহিনী সহ হাজির হলো সিমেন্টভর্তি জাহাজটায়। যে ক্যাবিনে খুন হয়েছিলো সে ক্যাবিনে এসে পৌঁছলো তারা।
অভয়কর বিশ্বাসের নজর পুলিশে পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন। খুন হোক, অর্থ যাক তবু ক্ষতি নেই, কিন্তু পুলিশকে তার সবচেয়ে বেশি ভয় বিশেষ করে তার সিমেন্টের জাহাজে। অভয়কর হকচকিয়ে গেলেন।
খিদিরপুর থানার ওসি হেমন্তবাবু যখন লাশ ইনকোয়ারী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তখন সরে পড়লো বনহুর সকলের অজ্ঞাতে। এবার সে ডকের অফিসে এসে রিসিভার তুলে নিলো, তারপর ফোন করলো লালবাজার পুলিশ হেড কোয়ার্টারে। ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ স্বয়ং ফোন ধরলেন ওপাশে।
বনহুর রাজেন্দ্রের গলা শুনেই চিনতে পারলো, বললো সে ইন্সপেক্টার সাহেব, আপনি এক্ষুণিই পুলিশ সুপার মিঃ বোসকে নিয়ে চলে আসুন। খিদিরপুর ডকে যে জাহাজটি একটু পূর্বে বন্দর ত্যাগ করতে যাচ্ছিলো সে জাহাজে রহস্যজনক একটি খুন হয়েছে।
মিঃ রাজেন্দ্রের গলা– রহস্যজনক খুন!
বললো– বনহুর– হাঁ রহস্যজনক খুন! আপনি এক্ষুণি পুলিশ ফোর্স নিয়ে চলে আসুন।
গম্ভীর কণ্ঠস্বর ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রের –আপনি কে? কোথা থেকে বলছেন?
বনহুর মৃদু হাসলো– আমি অভয়কর বিশ্বাসের পরম বন্ধু।
ওপাশ থেকে মিঃ রাজেন্দ্রের উভগ্রীব কণ্ঠ –আপনার নাম?
কিন্তু বনহুর তার পূর্বেই রিসিভার রেখে দেয়। বেরিয়ে আসে ডকের অফিস-রুম থেকে। অদূরে তার গাড়ি অপেক্ষা করছিলো, গাড়িতে বসে ষ্টার্ট দেয়।
*
সোজা বনহুর গাড়ি নিয়ে বস্তির দিকে চলে যায়। অপরিচ্ছন্ন স্যাঁতসেঁতে গলির মধ্যে খোলার জীর্ণ কুঠিগুলো সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে। পঁচা দুর্গন্ধভরা নিকৃষ্ট গলিপথ।
বনহুরের গাড়ি এসে থামলো গলির মুখে। গাড়ি থেকে নেমে বস্তির মধ্যে প্রবেশ করলো সে। টাকার ব্যাগটা বের করে নিলো ড্রাইভিং আসনের তলা থেকে।
সমস্ত বস্তি তখন নিদ্রায় ঢলে পড়েছে।
বনহুর সম্মুখের একটি দরজার বেড়া ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো। কুঠিরের মিটমিটে আলোতে দেখলো অদূরে মাদুরের উপরে শুয়ে আছে গুটিকয়েক ছেলেমেয়ে আর পাশে একটি অর্ধ বয়স্ক মহিলা। ওপাশে আর একটা ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে অর্ধবয়স্ক এক হাড় জিড়জিড়ে লোক।
বনহুর বেড়ায় টোকা দিয়ে শব্দ করলো।
ধড়মড় করে উঠে বসলো লোকটা, বনহুরকে দেখে আর্তচীৎকার করতে যাচ্ছিলো, বনহুর ওর মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে উঠে চেঁচাবে না, গলা টিপে মারব। তারপর ব্যাগ খুলে বের করে টাকার বাণ্ডিল, এই নাও, স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে আরামে থেকো। কথাটা বলে কয়েকখানা নোট খুঁজে দেয় সে লোকটার হাতের মুঠায়।
লোকটার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়! ভয় আর আনন্দ দুটো আভাসই ফুটে উঠেছে তার মুখমণ্ডলে। ভাবছে লোকটা– সে তো স্বপ্ন দেখছেনা?
ততক্ষণে স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের ঘুম ভেঙে গেছে, সবাই তাকাচ্ছে বনহুরের দিকে।
বনহুর বেরিয়ে যায়, প্রতিটি কক্ষে প্রবেশ করে সবাইকে টাকাগুলো বিলিয়ে দেয়। তারপর বেরিয়ে আসে। বস্তি থেকে। গঙ্গার তীরে এসে দাঁড়ায় এবার, খালি ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় গঙ্গার বুকে।
গঙ্গার শীতল হাওয়ায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ হয়ে। মনটা আজ বড় হাল্কা মনে হচ্ছে ওর।
বেশ কিছু সময় গঙ্গাতীরে দাঁড়িয়ে থাকার পর গাড়িতে চেপে বসলো। গাড়িখানা এবার ছুটে চললো। হ্যারিসন রোড ধরে হাওড়া ব্রীজের দিকে।
সমস্ত কলিকাতা নগরী নিস্তব্ধ।
ফুটপাতের আলোগুলো কেমন স্তিমিত মনে হচ্ছে আজ। আকাশে মেঘ জমেছে, বৃষ্টির পূর্ব লক্ষণ। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। গুড় গুডু শব্দে মেঘ ডাকছে।
বনহুর গাড়ি নিয়ে চলেছে।
ঠিক ব্রীজের উপরে গাড়িখানা আসতেই হঠাৎ বনহুর লক্ষ্য করলো– দুটো লোক ব্রীজের উপরে ঝাপটা ঝাঁপটি করছে। একটি পুরুষ–অন্যটি নারী তাতে কোনো ভুল নেই। যদিও বেশ দূরে এ ব্যাপারটা চলেছে তবু বনহুর ভালভাবেই দেখতে পাচ্ছে। এবার সে গাড়ির স্পীড় কমিয়ে দিলো। গাড়িখানা থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাত সম্মুখে ব্রীজের এক পাশে এ ধস্তাধস্তি চলেছে, পুরুষটির হাত এড়িয়ে মহিলাটি পালাবার চেষ্টা করছে কিন্তু সক্ষম হচ্ছে না।
