এবার সে একটা কাগজ আর কলম তুলে নিলো। তারপর লিখে চললো, কতবার যে আবোল-তাবোল কত কি লিখলো! কতবার ছিঁড়ে টুকরো করে ফেললো তার ইয়ত্তা নেই।
বনহুর আবার মনোযোগ দিলো মহাতকের চিঠিখানায়।
বনহুর লিখলো, বহুবার ছিড়লো– হঠাৎ একবার আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো তার মুখমণ্ডল! আপন মনেই বলে উঠলো, পেয়েছি– পেয়েছি এবার। লেখা কাগজখানার পাশে মেলে ধরলো মহাতকের দেয়া সাংকেতিক চিঠিখানা মিলিয়ে পড়তে লাগলো। প্রথম মহাতকের সাংকেতিক চিঠিখানা পড়ে নিলো সে–
ভী–মাং– বং– একং– হাং– ব–সিং। মিং– পাং– খিং– পুং– ডং–জাং–
থাং– বেং– আঃ–সেং– টাং– মিং– দিং– বোং—
ঐ চিঠিখানার সঙ্গে মিলিয়ে এবার পড়তে লাগলো নিজের লিখাটা –ভীম সিং, মালিককে–বলো–এক — হাজার। বস্তা সিমেন্ট পাঠাতে খিদিরপুর– ডকে। জাহাজ–থাকবে –আমি সেখানে গিয়ে–টাকা– মিটিয়ে দিবো– উল্লসিত ভাবে হেসে উঠলো বনহুর, তারপর কাগজ দু’খানা ছিঁড়ে ফেললো টুকরা টুকরা করে।
*
খিদিরপুর ডক।
হাজার বস্তা সিমেন্ট ভর্তি হয়েছে জাহাজে। অল্পক্ষণ পরই জাহাজ খিদির পুর ডক ছেড়ে রওয়ানা দেবে।
রাত তখন বারোটা বেজে গেছে।
ডকের খালাসীরা এবার সারাদিনের পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নিতে চলে গেছে। দু’চারজন এখনও ঘোরাফেরা করছে বটে কিন্তু তারা কোনো মাল বহনের আশায় নয়, কোনো পরিচিত বন্ধুর খোঁজে হয়তো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। হয়তো বা একটা বিড়ির প্রয়োজন হয়েছে বা এক খিলি পান খাবে ওর পয়সায়।
জাহাজের সিঁড়ি এখনও উঠিয়ে নেওয়া হয়নি। ডেকের রেলিং– এর পাশে দুটো লোক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিম্নস্বরে কিছু কথাবার্তা বলছিলো।
অদুরে ডেকের অন্ধকারে আর একটি কালোমূর্তি দাঁড়িয়ে ছিলো রেলিং-এ ঠেশ দিয়ে। সমস্ত শরীর কালো ড্রেসে আবৃত। মাথায় জমকালো ক্যাপ। অন্ধকারে তাকে মোটেই দেখা যাচ্ছিলো না।
ডকে দাঁড়িয়ে যারা এতোক্ষণ কথাবার্তা বলছিলো তারা এবার পাশের ক্যাবিনে প্রবেশ করলো। ক্যাবিনের দরজাটা টেনে দিলো প্রথম ব্যক্তি। ক্যাবিনের আলোতে দেখা গেলো ওরা দু’জনের একজন মহাতক সিং, দ্বিতীয় জন অন্য কেহ নয়– স্বয়ং অভয়কর বিশ্বাস। বেশ কিছুদিন তিনি নীরব থাকার পর আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন। ভুলে গেছেন কালোমূর্তির শাসনবাণী। আবার অভয়কর বিশ্বাস শুরু করেছেন কালোবাজারী। গোপনে তিনি দেশ-বিদেশে ব্ল্যাকে সিমেন্ট চালান দিয়ে যাচ্ছেন।
মহাতকের নিকট হতে আজকের সিমেন্টের টাকা গুণে নিলেন অভয়কর বিশ্বাস।
জাহাজ ছাড়ার ভোঁ বেজে উঠেছে।
ব্যাগ হস্তে উঠে দাঁড়ান অভয়কর বিশ্বাস।
ঠিক সে মুহূর্তে ক্যাবিনে প্রবেশ করে কালো মূর্তি হস্তে উদ্যত রিভলভার। চোখে কালো চশমা।
মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলো উভয়ে। কিন্তু মহাতক সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিলো, আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠলো ওর চোখ দুটো! দাঁতে দাঁত পিষে বললো– কে তুই?
কালোমূর্তি অন্য কেউ নয়– স্বয়ং দস্যু বনহুর। কালো চশমার আড়ালে তার চোখ দুটো দিয়েও অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হতে লাগলো। কঠিন কণ্ঠে বললো সে–খবরদার নড়বে না!
মহাতকের নিশ্বাস ফোঁস ফোঁস করে বইছে, রাগে ফুলে উঠেছে ওর দেহের মাংসপেশীগুলো। গোঁফ দুটো সজারু কাটার মত খাড়া হয়ে উঠেছে। কলকাতার সেরা গুণ্ডা সে। সমস্ত গুণ্ডাদলের সর্দার মহাতক আর সে কি না ভয় পাবে সামান্য এক কালোমূর্তি দেখে। এতোক্ষণ ঝাঁপিয়ে পড়তো সে কালো মূর্তির উপর। কিন্তু। ওর হস্তের আগ্নেয় অস্ত্রটার জন্যই সে অগ্রসর হতে দ্বিধা বোধ করছিলো। কিন্তু সে সুযোগ খুঁজছিলো।
বনহুর রিভলভার ঠিক রেখে বাম হাতটা বাড়িয়ে দেয় অভয়কর বিশ্বাসের দিকে ব্যাগ দাও।
অভয়কর আর মহাতক দৃষ্টি বিনিময় করেন।
ব্যাগটা যেমন বাড়িয়ে দিতে যান অভয়কর বিশ্বাস। অমনি মহাতক সিং ঝাঁপিয়ে পড়ে কালোমূর্তির উপর। কিন্তু ঠিক সে মুহর্তে কালোমূর্তির হস্তের রিভলভার গর্জে উঠলো।
একটা তীব্র আর্তনাদ করে হুমড়ি খেয়ে ক্যাবিনের মেঝেতে পড়ে গেলো মহাতক সিং।
বনহুর দ্রুত হস্তে অভয়কর বিশ্বাসের হাত থেকে টাকার ব্যাগটা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে বেরিয়ে যায়।
ততক্ষণে ছুটে আসে আরও অনেকে।
মহাতকের রক্তাক্ত দেহটাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে উঠে সবাই, খুন–খুন– খুন
*
জাহাজ সবেমাত্র তখন বন্দর ত্যাগ করতে শুরু করেছে।
কিন্তু বন্দর ত্যাগ করা আর হলো না, সিমেন্টভর্তি জাহাজখানা আবার নোঙ্গর করতে বাধ্য হলো!
এখানে যখন মহাতকের লাশ নিয়ে মহা হুলস্থুল পড়েছে, অভয়কর বিশ্বাস ক্যাবিনের দেয়ালে মাথা ঠুকে বিলাপ করে চলেছেন– তাঁর লক্ষ লক্ষ টাকা ছিলো ঐ ব্যাগটার মধ্যে। কালোমূর্তি শুধু মহাতক সিংকে খুন করেই উধাও হয়নি, সর্বস্ব নিয়ে গেছে অভয়কর বিশ্বাসের।
বনহুর তখন তার গাড়ি নিয়ে উল্কা বেগে ছুটে চলেছে সোজা খিদিরপুর থানা অভিমুখে। ইতিমধ্যে সে দেহের কালো ড্রেস পাল্টে নিয়ে স্বাভাবিক এক ভদ্রলোকের ড্রেসে সজ্জিত হয়ে নিয়েছে। টাকার ব্যাগ আর রিভলভারটা সে লুকিয়ে রেখেছে ড্রাইভিং আসনের নীচে। কেউ তাকে দেখলে বুঝতে পারবে না একটু পূর্বেই সে একজনকে নিহত করে লক্ষ টাকা নিয়ে পালিয়েছে।
সে জাহাজ থেকে যখন ডকে নেমে আসে তখন তার গাড়িটা ডকের বাইরে একটা পানির টাঙ্কির নীচে। দাঁড়িয়ে ছিলো। জায়গাটা অত্যন্ত নির্জন এবং অন্ধকার। বনহুর এখানেই তার ড্রেস দ্রুত পাল্টে নিতে সক্ষম হয়েছিলো।
