বিস্ময়ে চমকে উঠলো শ্যালন, অবাক হয়ে তাকালো সে মাসুদ ইরানীর মুখের দিকে।
মাসুদ ইরানীবেশি আর্থার তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।
কারো মুখে কথা নেই।
গীর্জার ফাদার সম্মুখে দণ্ডায়মান।
বনহুর ওপাশে রক্ষিত টেবিল থেকে দু’গাছা ফুলের মালা নিয়ে দু’জনার হাতে দেয়।
ফাদার বলেন– শুভ মুহূর্ত চলে যাচ্ছে। বিয়ের মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকেন তিনি।
শ্যালন স্থবিরের মত মালাটা পরিয়ে দেয় মাসুদ ইরানীবেশি আর্থারের গলায়।
আর্থার তার হস্তস্থিত মালাটা শ্যালনের কণ্ঠে দেয়।
ফাদার ইংরেজিতে উচ্চারণ করেন তাদের বিয়ের মন্ত্র।
বিয়ে হয়ে যায়।
বনহুর আনন্দের হাসি হাসে!
*
বনহুর আজ বন্ধনহীন।
মুক্তির নিশ্বাস ফেলেছে সে। শ্যালন আর তাকে বিরক্ত করতে আসবে না কোনোদিন। কথাটা ভাবতেই বনহুরের মনটা যেন কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। আজ সমস্ত দিনটা সে এতোটুকু স্বস্তি পায়নি যতই শ্যালনের কথা মন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছে, ততই যেন গভীরভাবে দাগ কেটে বসেছে ওকে। সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চললো সে।
বনহুর হাতঘড়ির দিকে তাকালো।
রাত দু’টো বেজে বিশ মিনিট হয়েছে। আসন ত্যাগ করে উঠতে পড়লো। আজ তাকে জিজ্ঞাসা করবার কেউ নেই! এতোবড় বাড়িখানায় শুধু বনহুর একা– নিঃসঙ্গ।
চাকর-বাকরগণ তাদের নিজ নিজ বিশ্রামকক্ষে গাঢ় নিদ্রায় মগ্ন!
বনহুর তার ড্রেসিং কক্ষে প্রবেশ করে।
তারপর যখন বেরিয়ে আসে তখন তাকে ঠিক একটি শ্রমিকের বেশে দেখা যায়। কাপড়ের নিচে ছোট্ট আণ্ডারওয়ারের মধ্যে লুকিয়ে নিলো একগাছা সিল্ক-কর্ড আর একটি রিভলভার। গাড়িখানা তার গাড়ি-বারান্দায় অপেক্ষা করছিলো, ড্রাইভিং আসনে উঠে বসে ষ্টার্ট দিলো। একেবারে সোজা শ্যামবাজার অভিমুখে রওয়ানা। দিলো সে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্যামবাজার এসে পড়লো বনহুর। সে পূর্বের গলি, যে গলির মধ্যে একদিন ড্রাইভারের বেশে অভয়কর বিশ্বাসের গাড়ি নিয়ে সে এসেছিলো। গাড়িখানা একটা এদো পচা গলির মধ্যে ব্যাক করে। রেখে নেমে এলো বনহুর। ঠিক সে দরজায় এসে দাঁড়ালো, যে দরজা খুলে একদিন বেরিয়ে এসেছিলো গুণ্ডাদের সর্দার মহাতক সিং।
বনহুরের মাথায় গামছা বাঁধা। কাপড়টা ছেঁড়া এবং ময়লা, হাঁটুর উপর উঁচু করে পরা রয়েছে! গায়ে একটা ময়লা ফতুয়া জামা। গলায় কালো ফিতায় গাঁথা মাদুলী। কেউ তাকে কুলী না বলে উপায় নেই।
দরজায় দাঁড়িয়ে টোকা দিলো বনহুর। একবার, দু’বার তিনবার। দরজা খুলে গেলো, একটি ভয়ঙ্কর মুখ বেরিয়ে এলো।
বনহুর লম্বা একটা সেলাম ঠুকে বললো আমি বালিগঞ্জ থেকে আসছি, কথা আছে সর্দারের সঙ্গে।
ভয়ঙ্কর চেহারার লোকটা বনহুরকে সঙ্গে যাওয়ার জন্য ইংগিত করলো!
বনহুর অনুসরণ করলো তাকে।
বাড়িটা সম্মুখ থেকে ভাংগাচোরা মনে হলেও ভিতরে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। ঠিক একটি হোটেলের অভ্যন্তরের মত! চারদিকে নিপুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অগ্রসর হলো বনহুর। পরপর কয়েকখানা ঘর পেরিয়ে। ওদিকে মাঝখানের একটা ঘরে বেশ কিছুসংখ্যক চেয়ার-টেবিল পাতা রয়েছে। ঘরটা খুব লম্বা এবং প্রশস্ত। প্রত্যেকটা চেয়ার টেবিলে। চার-পাঁচজন গুণ্ডা ধরনের লোক বসে হাসি-গল্প করছে আর বোতল বোতল মদ পান করছে। কেউ কেউ তাস নিয়ে জুয়া খেলতে বসেছে।
ওদিকের একটা টেবিলে বসে আছে সেদিনের সে গুণ্ডা সর্দার মহাতক সিং। সে একটা গোটা বোতল মুখের কাছে তুলে নিয়ে পান করছিলো।
তার লোকের সঙ্গে একটি অপরিচিত লোককে দেখে মহাতক হাতের বোতলটা নামিয়ে রাখলো। রক্ত রাঙা চোখ দুটো তুলে তাকালো তাদের দিকে।
লোকটা বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো– ইনি আমাদের সর্দার।
বনহুর সেলাম করলো।
মহাতক বললো কোথা থেকে এসেছিস বেটা?
কণ্ঠে ভীতিভাব এনে বললো কুলীবেশি দস্যু বনহুর– হুজুর বালিগঞ্জ থেকে। ভীম সিং আমাকে পাঠিয়েছে।
ভীম সিং?
হাঁ হুজুর।
বনহুর মনে মনে কিন্তু অবাক না হয়ে পারলো না। সেদিন অভয়কর বিশ্বাসের ড্রাইভারের বেশে এসে মহাতকের কণ্ঠে যে ভাষা সে শুনেছিলো সে নিখুঁত হিন্দি ভাষা বাংলা যেন বলতেই জানেনা আর কি। আর আজ সুন্দর বাংলা বলছে, কোনো ভুল নেই তার কথায়।
মহাতক বললো আবার ভীম সিং-এর খবর কি?
হুজুর, ভীম সিং এখন আগের চেয়ে অনেক ভাল। সে আমাকে পাঠিয়েছে।
হাঁ, এবার মনে পড়েছে তার কাছে আমার জরুরি একটা কাজ ছিলো। তুমি বসো, আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। মহাতক কাগজ আর কলম নিয়ে বসলো।
চিঠিখানা লিখা শেষ করে হাতে দিলো মহাতক কুলীবেশি দস্যু বনহুরের।
বনহুর চিঠি হাতে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো।
মহাতক ডাকলো– কালকেই সে যেন আমার সঙ্গে দেখা করে বলো!
আজ্ঞে বলবো। বেরিয়ে যায় কুলীবেশি বনহুর।
দাঁড়িয়ে পকেট থেকে বের করলো মহাতকের দেয়া চিঠিখানা। মেলে ধরলো চোখের সামনে। চিঠিতে লিখা আছে– সংক্ষিপ্ত কয়েকটি অক্ষর
“ভীম– মাং-বং–একং–হাং–ব। সিং–মিং– পাং– খিং– পুং– ডং–
জাং– থাং– বেং– আঃ– সেং– টাং– মিং– দিং– বোং–
তোমার মহা
বনহুর চিঠিখানা নিয়ে ফিরে এলো নিজের বাসায়। কুলীর ড্রেস পাল্টে এসে বসলো আলোর সামনে। সিগারেট কেট বের করে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে নিলো, তারপর মহাতকের দেয়া চিঠিখানা বারবার পড়তে লাগলো। কিছু বোঝা যাচ্ছে না, সংকেতপূর্ণ শব্দ লিখেছে মহাতক ভীম সিং-এর কাছে। অদ্ভুত শব্দ–আপন মনে হাসলো বনহুর।
