সেদিন আর বেশি কথা হলো না তাদের মধ্যে।
বনহুর নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো।
শ্যালনের চোখে আজ স্বপ্নের মায়াজাল, সে কল্পনার চোখে দেখতে পায়– সে তার মাসুদ ইরানীর পাশে বসে আছে। মাসুদ ইরানী পিয়ানো বাজিয়ে চলেছে, তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে শ্যালন তার মুখের দিকে।–নির্জন পল্লীর জনহীন পথ। এক্কা ঘোড়ার গাড়ি। পাশাপাশি বসে আছে মাসুদ ইরানী আর সে। মাসুদ ইরানীর হস্তে অশ্বের লাগাম, শরীরে তার কালো ড্রেস, মুখে মিষ্টি মধুর হাসি।–শ্যালনের শরীরেও ওর মত কালো ড্রেস, বাতাসে চুলগুলো উড়ছে। গান গাইছে শ্যালন, অপূর্ব সুরের ঝঙ্কারে মুখরিত হয়ে উঠেছে। পথ আর প্রান্তর। আকাশের নীল ওদের মনে লাগিয়েছে রঙের রামধনু।–মাসুদ ইরানী শ্যালনকে টেনে নেয়, শ্যালন ওর বুকে মাথা রাখে– মাসুদ ইরানীর সঙ্গে শ্যালনের দিনগুলো ভেসে উঠে পর পর তার মনের আকাশে।
পাশের কক্ষে তখন বনহুর বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে তাকিয়ে আছে কড়িকাঠের দিকে। আফ্রিকার জঙ্গলে কি করে শ্যালনকে সে গরিলার কবল থেকে উদ্ধার করেছিলো। কি করে জাহাজে একসঙ্গে কেটেছে ওদের। তারপর কলকাতায় আসার পর থেকে শ্যালন আর তার দিনগুলো কিভাবে এগুচ্ছিলো– সব স্মরণ হতে লাগলো আজ বনহুরের নতুন করে। শ্যালনকে ভাল লেগেছিলো, কেন এতো মুগ্ধ হয়েছিলো ওর প্রতি বনহুর নিজেই যেন বুঝতে পারেনি। নিজের অজ্ঞাতেই সে একদিন আকৃষ্ট হয়েছিলো শ্যালনের মধ্যে। অবশ্য শ্যালনকে সর্বক্ষণ, সর্বদিন ফাঁকি দিয়ে এসেছে। সরলপ্রাণা শ্যালন গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছিলো আলমকে, সে কোন দিন বুঝতে পারেনি– আলম তাকে সবসময় এড়িয়ে চলতে চায়! তবে মাসুদ ইরানীর বেশে বনহুরকে অনেকখানি ধরা দিতে হয়েছিলো শ্যালনের কাছে। তা না হলে কোনো উপায় ছিলো না।
আজ শ্যালনকে মাসুদ ইরানীবেশি আর্থারের হাতে তুলে দিতে সত্যি তার অন্তরে একটা গভীর ব্যথা অনুভব করছিলো। শ্যালনকে নিজের অজ্ঞাতে কখন যে সে এতোখানি ভালবেসেছিলো সে-ই টের পায়নি। সমস্ত রাত বনহুর অনেক চিন্তা করলো, আবোল-তাবোল কত কি ভাবলো–আজ কেউ বাদ গেলোনা তার চিন্তাধারা থেকে। দস্যু কালু খাঁ থেকে তার মা– বাবা, মনিরা, নূরী, একমাত্র সন্তান নূরের কথাও আজ স্মরণ হলো।
কান্দাই ফিরে যাবার জন্য মন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। তার আস্তানা, অনুচরবর্গ, অশ্ব তাজ এদের কথা আজ বার বার মনে পড়তে লাগলো। কতদিন হলো বনহুর তার আস্তানা ত্যাগ করে এসেছে।
প্রায় সমস্ত রাত্রিই ঘুম হলো না বনহুরের।
*
পরদিন এলো মাসুদ ইরানী।
শ্যালন আনন্দে আপ্লুত হলো।
বনহুর তখন নিজের কক্ষে পায়চারী করছে। শ্যালনকে কত বড় থোকা সে আজ দিতে চলেছে। শ্যালন কি সত্যিই মাসুদ ইরানীকে ভালবেসেছিলো? সে ভালোবেসেছিলো মাসুদ ইরানী আসল মানুষটিকে তার খোলসটিকে নয়। আজ সরল প্রাণা শ্যালনের পাশে যাকে মাসুদ ইরানী বেশে উপস্থিত করে দিয়েছে বনহুর, সে মাসুদ ইরানীর খোলস ছাড়া কিছু নয়।
মনটা আজ বড় অস্থির লাগছে বনহুরের। পাশের কামরায় শ্যালনের প্রাণখোলা হাসির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো বা মাসুদ ইরানীর সঙ্গে সে কোনো ব্যাপারে আনন্দে মেতে উঠেছে।
বনহুর মনকে স্থির করে নেয়, শ্যালনকে আর্থারের হাতে যতক্ষণ সঁপে না দিচ্ছে ততক্ষণ তার স্বস্তি নেই।
এমন সময় মাসুদ ইরানীর হাত ধরে শ্যালন তার কক্ষে প্রবেশ করে।
বনহুর পায়চারী করছিলো, থমকে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে তাকায়।
শ্যালন বলে আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি আলম।
বেশ যাও। বললো বনহুর।
শ্যালন আর মাসুদ ইরানীবেশি আর্থার বেরিয়ে গেলো তার কক্ষ থেকে।
শ্যালন মাসুদ ইরানীর হাত ধরে নিয়ে গেলো, প্রায় টেনে নিয়েই চললো সে ওকে।
বনহুর দ্বিতলের রেলিং-এর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। দেখতে পেলো– শ্যালন মাসুদ ইরানীর হাত ধরে গাড়িতে উঠে বসলো। উভয়ে উভয়ের মুখে তাকিয়ে হাসছে।
মাসুদ ইরানীবেশি আর্থার ঠিক বনহুরের অনুকরণেই অভিনয় করে চলছে। হাসলো বনহুর, আপন মনেই। বললো সে– সার্থক আর্থার তুমি!
সেদিনই আর্থারবেশী মাসুদ ইরানী আর শ্যালন ফিরে আসার পর বনহুর ওদের মধ্যে দাঁড়ালো, হেসে বললো– আমি তোমাদের একটি কথা বলতে চাই।
শ্যালন ও আর্থার প্রশ্ন ভরা দৃষ্টি তুলে তাকালো।
বনহুর বললো–শ্যালন, আমি চাই তোমাদের এ প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ়– আরও মজবুত করে দিতে! বলো, তোমরা রাজি আছো?
শ্যালন আর মাসুদ ইরানী মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো। তারপর বললো শ্যালন হাঁ, আমরা রাজি আছি।
বনহুর এবার ওদের দু’জনাকে নিয়ে ক্যালকাটা সেন্ট জন্স গীর্জায় গিয়ে উপস্থিত হলো।
ঠিক বিয়ের পূর্ব মুহূর্তে বললো বনহুর শ্যালন, একটি কথা আছে তোমার সঙ্গে।
শ্যালন বললো– বলো?
বনহুর ওকে গীর্জার এক পাশে নিয়ে গিয়ে বললো– শ্যালন, সত্যিই তুমি মাসুদ ইরানীকে ভালবাসো তো?
হাঁ, তাকে আমি ভালবাসি।
অন্তর থেকে বললে এ কথা?
হা।
যদি মাসুদ ইরানীর আসল পরিচয় জেনে তুমি তাকে উপেক্ষা করো বা বিয়ে করতে রাজি না হও?
না। আমি তাকে ভালবাসি। তার আসল পরিচয় আমাকে আমার সংকল্প থেকে বিচ্যুত করতে সক্ষম হবে না।
বেশ, তোমার সংকল্প অটুট থাক। বিখ্যাত পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানী আর কেহ নয়– তোমাদের পরম আত্মীয় মিঃ আর্থার।
