আর্থার শুধু স্তম্ভিতই নয়, হতভম্ব হয়ে গেছে সে কল্পনাও করতে পারেনি– আলম মাসুদ ইরানী। তন্দ্রাচ্ছন্নের মত বনহুরের এগিয়ে ধরা সিগারেট কেস থেকে একটা সিগারেট তুলে নিলো।
বনহুর নিজেও একটা সিগারেট ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে দিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করলো। একমুখ ধূয়া সম্মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বললো– মিঃ আর্থার, পিয়ানো কোনোদিনই আমার চর্চা ছিলো না। কলকাতায় এসে আমি বাধ্য হয়েছি পিয়ানো চর্চা করতে। কয়েক মাসের সাধনায় আমি জয়লাভ করেছি। আমার কার্যসিদ্ধি হয়েছে। শ্যালন ভালবাসতো আলমকে, এখন সে ভালবাসে পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানীকে। মিঃ আর্থার, এবার আপনাকে কিছুদিনের জন্য মাসুদ ইরানীর অভিনয় করতে হবে বিশেষ করে শ্যালনের সঙ্গে।
ঢোক গিলে শুষ্ক কণ্ঠে বললো আর্থার মাসুদ ইরানী!
হাঁ, ভয় নেই আপনাকে আমি সাহায্য করবো। চলুন পাশের ঘরে। বনহুর টেবিলে খুলে রাখা সোনালী কোঁকড়ানো পরচুলাটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো– আসুন আমার সঙ্গে।
আর্থার অনুসরণ করলো বনহুরকে।
তারপর নিজের হস্তে আর্থারকে মাসুদ ইরানীর ড্রেস পরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো– ভেরি নাই–এই হলেই চলবে। কিন্তু মনে রাখুন, কোনো সময় আপনি শ্যালনের কথায় ঘাবড়ে যাবেন না বা কোন কেননারকম দুর্বলতা প্রকাশ করবেন না।
বনহুর আরও ভাল করে বুঝিয়ে দিলো কেমন করে তার চলতে হবে। প্রথম শ্যালনের বাড়িতে গিয়ে তাকে কিভাবে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। তারপর কিভাবে আলাপ-আলোচনা করতে হবে– সব বলে ঠিক করে নিলো বনহুর।
মাসুদ ইরানীর বেশে আর্থারকে ঠিক পূর্বের মাসুদ ইরানীর মতই লাগছে।
বনহুর তার বিরাট প্লিমাউথ গাড়ির ড্রাইভিং আসনে মাসুদ ইরানীবেশী আর্থারকে বসিয়ে নিজেও বসলো তার পাশে।
গাড়ি চালিয়ে চললো আর্থার মানে মাসুদ ইরানী।
*
শ্যালন রেলিং এর পাশে ঝুঁকে পথের দিকে তাকিয়ে ছিলো, মাসুদ ইরানীর আসার সময় হয়েছে। প্রতিদিন সে এমনি সময় মাসুদ ইরানীর প্রতীক্ষায় রেলিং–এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
গাড়ি-বারান্দায় গাড়ি পৌঁছতেই ছুটে এলো শ্যালন তার হাইহিল জুতোর গোড়ালীতে শব্দ তুলে। কিন্তু গাড়ির পাশে এসে থমকে দাঁড়ালো, বললো– আলম তুমি!
বনহুর হাসিমুখে বললো– হঠাৎ পথের মধ্যে মাসুদ ইরানী আমাকে দেখতে পেয়ে তার গাড়িতে উঠিয়ে নিলেন।
গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়লো বনহুর আর মাসুদ ইরানী
শ্যালন মাসুদ ইরানীর দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে চুম্বন করলো হাতের পিঠে।
তারপর তিনজন এগিয়ে গেলো হলঘরে।
বনহুর বললো– মাসুদ ইরানী, সত্যি আমি দুঃখিত এতো দিনের মধ্যে আজ শুধু আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ ঘটলো।
হেসে বললো মাসুদ ইরানী–আমিও সেজন্য কম দুঃখিত নই মিঃ আলম। যাক, তবু আপনার সঙ্গে পূর্বে আলাপ ছিলো বলেই আজ পথে আপনাকে দেখতে পেয়ে সঙ্গী করে নিতে পারলাম।
আমার পরম সৌভাগ্য আজ আপনার পিয়ানো শুনতে পাবো। কি বলো শ্যালন, সত্যি কিনা?
নিশ্চয়ই আজ তোমার পরম ভাগ্য আলম।
বনহুর হাসলো।
মাসুদ ইরানী পিয়ানোর পাশে গিয়ে বসলো।
শ্যালনও উঠে এসে বসলো ওর পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে।
বনহুর বললো– এবার শুরু করুন মিঃ ইরানী।
মাসুদ ইরানী একবার বনহুরের মুখে তাকিয়ে নিয়ে পিয়ানোতে হাত রাখলো। বুকের মধ্যে ওর টিপ্ টিপ করছে তখন।
বনহুরের মনেও যে আলোড়ন শুরু হয়নি তা নয়, যদি কোনো রকম ভুল হয় তাহলে শ্যালন নিশ্চয়ই ধরে ফেলবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাসুদ ইরানীবেশি আর্থার ঠিকভাবে পিয়ানো বাজিয়ে গেলো।
বনহুরের আনন্দ আর ধরে না!
পিয়ানো বাজানো শেষ করে মাসুদ ইরানী তাকালো বনহুরের দিকে।
বনহুর মাথা নত করে অভিনন্দন জানালো।
শ্যালনের করতালিতে মুখর হয়ে উঠলো হলঘর।
সেদিন আর বেশিক্ষণ মাসুদ ইরানী অপেক্ষা করলো না, সে শ্যালন আর আলমের কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
বনহুর লক্ষ্য করলো, শ্যালনের মুখ বেশ গম্ভীর হয়েছে।
তখনও তাকিয়ে আছে শ্যালন যেদিকে প্লিমাউথ গাড়িখানা অন্তর্ধান হয়েছে।
বনহুর কাঁধে হাত রাখে শ্যালনের।
শ্যালন ফিরে তাকায়, বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই মাথা নত করে নেয়।
বনহুর হেসে উঠে– আমি বুঝতে পেরেছি শ্যালন, মাসুদ ইরানী তোমার হৃদয়-মন হরণ করে নিয়েছে।
শ্যালন আবার তাকায় বনহুরের মুখে, সে দেখতে চায় ও-মুখে কোনো রকম পরিবর্তন এসেছে কিনা।
বনহুর শ্যালনের হাত ধরে কক্ষমধ্যে নিয়ে যায়, ওকে বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসে পাশের সোফায়, বলে বনহুর– শ্যালন, মাসুদ ইরানী তোমাকে বিয়ে করতে চায়, বলো তুমি রাজি আছো?
শ্যালন ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে যায়–একদিন আলমকে বিয়ে করার জন্য শপথ করেছিলো সে। আজ আর একজনকে বিয়ে করবে বলে কি করে মত দেবে!
শ্যালনকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে বলে বনহুর বিশ্ববিখ্যাত পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানী বহু নারীর কামনার পাত্র। শ্যালন, তাঁকে স্বামীরূপে পাওয়া পরম ভাগ্যের কথা। বলে তাকে বিয়ে করতে রাজি আছো?
শ্যালন বলে এবার– হাঁ, রাজি আছি।
তোমাকে কগ্রাচুলেশন জানাচ্ছি শ্যালন। বনহুরের কণ্ঠে আনন্দ ধ্বনি হয়।
শ্যালন করুণ চোখে তাকায়, ব্যথাভরা কণ্ঠে বলে– তুমি রাগ করলে না তো?
রাগ। উঁহু! তোমার উপযুক্ত আমি নই শ্যালন, তাই আমি মনকে শক্ত করে নিয়েছি। একটু নিশ্চুপ রইলো বনহুর, তারপর বললো– মাসুদ ইরানী যদি কাল আসে তুমি তাকে বলো। শ্যালন, সে তোমার মুখে বিয়ের কথাটা শুনতে চায়।
