এক সময় ভোর হয়ে আসে, মাসুদ ইরানী ছেড়ে দেয় আর্থারকে। বলে সে–এবার যেতে পারেন, কিন্তু আবার আসবেন রাত দশটায়।
তন্দ্রাচ্ছন্নের মত জবার দেয় আর্থার নিশ্চয়ই আসবো।
আর্থার গাড়িতে গিয়ে বসে, মনের মধ্যে তখন নানা রকম চিন্তার ফুলঝুরি ঝরে পড়তে থাকে। পিয়ানো বাজানো তাকে শিখতেই হবে, তাহলে পাবে সে শ্যালনকে। শ্যালনের রূপরাশি তাকে নতুনভাবে আকৃষ্ট করে। চললো। যদিও এখন তার সঙ্গে দেখা হবার সম্ভাবনা নেই, তবু আশার একটা ক্ষীণ আলো উঁকি দেয় তার মনের কোণে।
সে দিনের পর হতে রোজই আসতে শুরু করলো আর্থার স্বপ্নরাগ রিক্রিয়েশন ক্লাবের দ্বিতলে মাসুদ ইরানীর কক্ষে। রাতের পর রাত চলতে লাগলো আর্থারের পিয়ানো সাধনা।
*
মাসুদ ইরানী পিয়ানো বাজাচ্ছিলো।
পাশে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে শ্যালন।
পিয়ানো বাজানো শেষ করে ফিরে তাকায় মাসুদ ইরানী শ্যালনের মুখে। অদ্ভুত কালো ড্রেসে আজ অপূর্ব সুন্দর মানিয়েছে মাসুদ ইরানীকে। মাথার সোনালী কোঁকড়ানো চুলগুলো ছড়িয়ে আছে ললাটের চারপাশে। হাস্যোউজ্জ্বল মুখমণ্ডল। মাসুদ ইরানী শ্যালনের মুখে চাইতেই উভয়ের দৃষ্টি বিনিময় হয়। বলে মাসুদ ইরানী– চলুন না আজ শহর থেকে দূরে কোথাও যাই?
কিন্তু আলম যে এখনও ফিরে আসেনি?
তাতে কি আছে, আমার সঙ্গে গেলে নিশ্চয়ই মিঃ আলম কিছু বলবেন না বা মনে করবেন না, জানি তিনি। একজন মহৎ ব্যক্তি।
হাঁ, আলম সত্যিই মহান হৃদয় লোক।
চলুন শহর থেকে আজ আমরা চলে যাবো অনেক দূরে বাইরে কোথাও। শহরের কর্মব্যস্ততার কোলাহল যেখানে নেই।
নেই যন্ত্রচালিত যানবাহনের কর্কশ নিষ্ঠুর শব্দ। নেই কলকারখানার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মত জমাট রাশি। মিস শ্যালন, আমি শহরের একঘেয়েমিতে বড় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি।
উঠে দাঁড়ায় শ্যালন–একটু অপেক্ষা করুন, আমি তৈরি হয়ে ফিরে আসছি।
শ্যালন চলে যায়, কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে।
মাসুদ ইরানী অবাক হয়ে তাকায় শ্যালনের পা-থেকে মাথা পর্যন্ত। হেসে বলে–চমৎকার!
শ্যালনও ঠিক মাসুদ ইরানীর মত কালো গাউন পরে সজ্জিত হয়ে নিয়েছে। শ্যালনের সোনালী চুলগুলোও এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে ঘাড়ে–পিঠে-কাঁধের চারপাশে।
আজ মাসুদ ইরানী শ্যালনের হাত মুঠায় চেপে ধরে বলে–মিস শ্যালন, সত্যি আপনি অপূর্ব! আপনিও!
ছোট্ট করে জবাব দেয় শ্যালন।
*
কলকাতা শহরের বাইরে এসে পড়ে তারা।
আজ নতুন নয় শ্যালনের, আরও কয়েকদিন সে মাসুদ ইরানীর সঙ্গে বেড়াতে বের হয়েছে কিন্তু শহরের বাইরে এতদূরে কোনোদিন আসেনি। আলিপুরের বাগান, চিড়িয়াখানা, যাদুঘর, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল– আর কোনোদিন বা গিয়েছে চিত্রা সিনেমা হলে বা ষ্টার থিয়েটারে। আলম এজন্য কোনোদিন তাকে কিছু বলেনি বরং শুনে খুশিই হয়েছে। তাই শ্যালন আজও মাসুদ ইরানীর সঙ্গে এক কথায় বেরিয়ে পড়লো নিঃসঙ্কোচে। একেবারে পল্লীর জনহীন পথে এক্কা ঘোড়ার গাড়িতে পাশা-পাশি বসেছে ওরা। মাসুদ ইরানী ঘোড়ার লাগাম হাতের মুঠায় চেপে ধরে বসেছিলো। হাস্যোদ্দীপ্ত ওর মুখ, শ্যালনকে সম্মুখে বসিয়ে অনুভব করছিলো প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য।
মেঘশুন্য আকাশ।
বৈকালের শেষ সূর্যাস্তের আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ছিলো তাদের চোখেমুখে। এলোমেলো বাতাসে দেহমন যেন আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠছিলো।
ঘোড়ার গাড়ির ঘড় ঘড় আওয়াজের সঙ্গে, ঘোড়ার খুরের খট খট শব্দ এক যাদুময় পরিবেশ সৃষ্টি করছিলো।
মাসুদ ইরানী বললো–মিস শ্যালন, আপনি গান গাইতে জানেন?
জানি, কিন্তু ভাল লাগবে আপনার?
কেন লাগবে না?
আপনি হলেন একজন পৃথিবীর সেরা সঙ্গীত-সাধক আর আমি কোন্ ছার সামান্য একটি তরুণী।
হাসে মাসুদ ইরানী– সঙ্গীত-সাধক হলেও গায়ক তো নই।
এমুহূর্তে তোমার মিষ্টি গলার সুমিষ্ট আওয়াজ নির্জন প্রন্তরে এক অভিনব সুর সৃষ্টি করবে।
বেশ গাইছি…শ্যালন গান গায়।
এক্কা ঘোড়ার গাড়ির খট খট আওয়াজ আর শ্যালনের গানের সুর অদ্ভুত এক পরিবেশের সৃষ্টি করে চলে।
তারপর এক সময় ফিরে আসে মাসুদ ইরানী আর শ্যালন। দিনের পর দিন মাসুদ ইরানী আর শ্যালনের মধ্যে এমনি করে গড়ে উঠে গভীর এক প্রেমের সৌধ। আলম ধীরে ধীরে সরে পড়তে থাকে শ্যালনের মনের গহন থেকে।
এদিকে যেমন মাসুদ ইরানী আর শ্যালনের মধ্যে একটা গভীর সম্বন্ধ গড়ে উঠছিলো, ওদিকে তখন আর্থার পিয়ানো সাধনা নিয়ে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটিয়ে চলেছে।
আর্থার পিয়ানো বাজায়– মাসুদ ইরানী পায়চারী করে আর কি যেন গভীরভাবে চিন্তা করে। হঠাৎ একদিন। আর্থারের পিয়ানো তাকে আত্মহারা করে ফেললো, মাসুদ ইরানী আনন্দের আতিশয্যে জড়িয়ে ধরলো আর্থারকে, অস্ফুট কণ্ঠে বললো– আপনি সার্থক হয়েছেন মিঃ আর্থার, আপনি জয়ী হবেন!
মাসুদ ইরানী আচমকা খুলে ফেলে তার মাথার কোঁকড়ানো রেশমী সোনালী চুলগুলো।
অবাক চোখে তাকায় আর্থার, বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে উঠে– মিঃ আলম!
হাঁ, মাসুদ, ইরানীর কাজ আজ থেকে শেষ হলো।
কিন্তু আপনি–
এবার আপনাকে মাসুদ ইরানী সাজতে হবে।
আমাকে?
হ, আজ থেকে আপনিই মাসুদ ইরানী। মিঃ আর্থার, আপনার সঙ্গে আমার বিশেষ কতগুলো কথা আছে। মাসুদ ইরানীর ড্রেস পাল্টে ফিরে এলো বনহুর। বসলো আর্থারের পাশে, সিগারেট কেসটা হাতে তুলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরলো–মিঃ আর্থার, নিন।
