আমার মন।
উঁ হুঁ, তুমি ঠিক বানিয়ে বলছো।
মোটেই না।
*
মিথ্যা নয়, এর পর থেকে মাঝে মাঝে প্রায়ই মাসুদ ইরানী তার প্লিমাউথ গাড়িখানা নিয়ে হাজির হতো শ্যালনের পাশে। পিয়ানো বাজাতো, শ্যালন মুগ্ধ হয়ে শুনতো। কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করতো না মাসুদ ইরানী শ্যালনের কাছে।
কিন্তু কোনোদিন বনহুর থাকাকালীন মাসুদ ইরানী আসতো না। শ্যালন এ জন্য অনেক সময় দুঃখ করতো।
শ্যালনের এ অনুতাপ শুনে হাসতো বনহুর।
শ্যালন বলতো হাসলে যে বড়?
বনহুর বলতো মাসুদ ইরানী আসেন তোমার জন্য–আমার জন্য নয়। নইলে হাজার টাকা যার এক ঘন্টা ফি, তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা বসে তোমাকে পিয়ানো শোনান। শ্যালন, একটা কথা সত্যি করে বলবে?
বলবো, বলো কি কথা?
মাসুদ ইরানীকে তুমি ভালবাসো?
এই কথা?
হাঁ, শ্যালন আমার বড় শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে।
শ্যালনের মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে, কোনো জবাব দেয় না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে বনহুর–তোমার মন থেকে আমি অনেক দূরে সরে পড়েছি, তাই না?
উ হু, মাসুদ ইরানীর চেয়ে তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসি–শ্যালন বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরে –কত সুন্দর তুমি!
তোমার মাসুদ ইরানীর মত নয়।
তার চেয়েও সুন্দর আলম!
*
পড়ার ঘরে বসে আর্থার একটা বই পড়ছিলো।
রাত অনেক হয়ে এসেছে, মাঝে মাঝে হাই তুলছিলো সে। যদিও তার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে তবু বেশ ভালো লাগছিলো বইখানা।
হঠাৎ পিছনে এসে কে যেন দাঁড়ালো, কাঁধে হাত রাখলো আর্থারের।
চমকে ফিরে তাকালো আর্থার, অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলো– মিঃ আলম! বহুদিন অদর্শনের পর হঠাৎ আজ গভীর রাতে তার কক্ষে আলমকে দেখে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলো।
বনহুর তার সম্মুখস্থ আসনে উপবেশন করে বললো–আজ অর্থ নিতে আসিনি।
কি চান তাহলে?
আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।
কি কাজ?
তার পূর্বে বলেন, শ্যালনকে আপনি ভালবাসতেন কিনা?
আশ্চর্য হয়ে তাকায় আর্থার বনহুরের মুখে। এতো রাতে সে বহুদিন পর আলমকে তার কক্ষে দেখে অবাক হয়ে গেছে। তারপর আচমকা এক অদ্ভুত প্রশ্ন, তবু যদি শ্যালন থাকতো! কিন্তু সে তো আর নেই, কোথায় চলে গেছে কে জানে!
বিশেষ করে আর্থার জানতো না শ্যালনকে তার পিতা স্বয়ং তুলে দিয়ে এসেছিলেন নরাধম শয়তান। অভয়কর বিশ্বাসের হাতে। সে জানতো শ্যালন তাদের বাড়িতে কাউকে না বলে কোথায় চলে গেছে। শ্যালনকে সে ভালবাসতো এ সুনিশ্চয়, কিন্তু শ্যালনের কাছে সে এতোটুকু সহানুভূতি বা আশ্বাস পায়নি কোনোদিন। তবু ঢোক গিলে বললোহ বাসতাম। কিন্তু শ্যালন তো আমাদের বাড়ি থেকে চলে গেছে। কোথায় চলে গেছে তাও জানিনে।
বললো বনহুর–শ্যালন আমার কাছেই আছে।
আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো আর্থারের মুখমণ্ডল।
খুশি হলো বনহুর। এমনি আশাই করেছিলো সে, আর্থার শ্যালনের উপযুক্ত, তাতে কোনো ভুল নেই। অর্থবান সুন্দর সুপুরুষ, যে কোনো নারীর পক্ষে আর্থার কামনার পাত্র।
বনহুর বললো–শ্যালনকে আপনি বিয়ে করতে রাজি আছেন?
শ্যালন কি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে?
আপনার মত থাকলে আমি তাকে বাগিয়ে নেবো।
জোর করে ভালবাসা আদায় করা যায় না মিঃ আলম।
তাই বলে শ্যালনের মত একটি মেয়েকে হেলায় দূরে সরিয়ে দেওয়াও যায় না আর্থার। আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।
কোথায়?
স্বপ্নরাগ রিক্রিয়েশন ক্লাবে। সেখানে মাসুদ ইরানীর কাছে পিয়ানো শিখতে হবে।
পিয়ানো।
হাঁ, কারণ শ্যালন পিয়ানো ভালবাসে।
কিন্তু!
কোনো কিন্তু নয়–মাসুদ ইরানীর কাছে আপনি পিয়ানো বাজানো শিখবেন।
আমি তো পিয়ানো বাজাতে জানিনে।
জানেন না তাইতো শিখতে হবে। চলুন—
আর্থার হাতের বইখানা রেখে মোহগ্রস্তের মত উঠে দাঁড়ালো। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো বনহুরের পিছনে পিছনে।
গাড়ির পিছন আসনে আর্থারকে বসিয়ে নিজে বসলো বনহুর ড্রাইভিং আসনে। পিছন ফিরে বললো কোনো ভয় নেই, নিশ্চিন্ত থাকুন।
*
স্বপ্নরাগ রিক্রিয়েশন ক্লাবের সম্মুখে এসে গাড়ি রেখে নেমে পড়লো বনহুর, পিছন আসনের দরজা খুলে ধরে বললো–নেমে আসুন।
সুবোধ বালকের মত নেমে পড়লো আর্থার।
মাসুদ ইরানীর কক্ষে গিয়ে দাঁড়ালো বনহুর আর আর্থার।
বনহুর বললো–আপনি বসুন, আমি মাসুদ ইরানীকে ডেকে আনছি।
এতো রাতে তিনি জেগে আছেন?
হাতঘড়ির দিকে তাকায় বনহুর–এখন তো সবে একটা–দশ। রাত তিনটে অবধি মাসুদ ইরানী তাঁর কক্ষে জেগে থাকেন। আপনি বসুন।
বনহুর পাশের কামরায় চলে যায়।
আর্থার বসে পড়ে একটা সোফায়।
প্রায় মিনিট কয়েক পরে মাসুদ ইরানী মন্থর গতিতে প্রবেশ করে সে কক্ষে।
আর্থার উঠে দাঁড়ায়, অভিনন্দন জানায়।
মাসুদ ইরানী গম্ভীর স্থির কণ্ঠে বলে–মিঃ আলমের কাছে সব অবগত হয়েছি মিঃ আর্থার। আপনি পিয়ানোবাদক হতে চান?
হাঁ, কিন্তু পারবো কিনা জানিনে।
কেন পারবেন না! পৃথিবীতে এমন কোনো কাজ নেই যা মানুষ পারে না। চেষ্টাই মানুষের জীবনে সফলতা আনে।
আসুন।
আর্থার মাসুদ ইরানীর সঙ্গে এগুলো।
পিয়ানোর পাশে গিয়ে বসলো মাসুদ ইরানী, বসতে বললো আর্থারকে তার পাশে। মাসুদ ইরানী তাকালো দরজার দিকে, হয়তো মিঃ আলমের সন্ধানে দৃষ্টি তার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
মাসুদ ইরানী বললো–মিঃ আলম বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, তাই তিনি বিশ্রাম করছেন।
তারপর চলে আর্থারকে মাসুদ ইরানীর পিয়ানো শেখানোর পালা। সম্পূর্ণ নতুন এ ব্যাপারে আর্থার, কিন্তু মনে তার বিপুল শেখার বাসনা। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে চলে, মাসুদ ইরানী সমস্ত অন্তর দিয়ে আর্থারকে শিক্ষা দান করে চলে।
