বনহুর হার গ্রহণে কোনো রকম আগ্রহ না দেখিয়ে হেসে বললো–অর্থের চেয়ে হারখানা যদি তুমি তাকে উপহার দাও, সেটাই হবে তার পক্ষে বেশি আনন্দের।
শ্যালনা বনহুরের কথায় সন্তুষ্ট হলো।
*
সমস্ত দিন ধরে শ্যালন চাকর-বাকর আর নিজে খেটে-খুটে সুন্দর করে ঘরগুলো গুছিয়ে নিলো। ড্রইংরুমখানা রুচিশীল করে সাজালো শ্যালন নিজের হাতে।
বনহুর এক সময় হেসে বললো–শ্যালন, জরুরি কাজে আমাকে বাইরে যেতে হবে। মাসুদ ইরানী এলে। তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বসাবে। আমার ফিরতে হয়তো একটু রাত হবে।
আকাশ থেকে যেন পড়লো শ্যালন, ফুলদানীতে ফুলগুলো গুছিয়ে রাখছিলো, ফুলগুচ্ছ হস্তে ফিরে দাঁড়ালো–তা হলে সব মাটি করে দেবে আমার?
তার মানে?
মানে, তুমি চলে যাবে আর আমি একা মাসুদ ইরানীর পিয়ানো শুনবো?
তাকে কি? মাসুদ ইরানী তো তোমাকেই তার পিয়ানো শোনাতে আসবেন, আমাকে তো নয়!
তা হয় না। তুমি চলে যাবে আর আমি একা একা—
বেশিক্ষণ দেরি হবে না আমার, ঠিক ঘন্টা দুই পরে চলে আসবো।
অভিমান ভরা কণ্ঠে বলে শ্যালন–বেশ, যা ভাল মনে করো তাই হবে।
সন্ধ্যার পূর্বেই বনহুর বেরিয়ে গেলো তার ষ্টুডি কমাণ্ডার গাড়ি নিয়ে।
শ্যালন মন খারাপ করে বসে রইলো। মাসুদ ইরানী আসবে আজ তাদের বাসায়–এ কম কথা নয়। বিশ্ববিখ্যাত পিয়ানোবাদক তিনি। কত তাদের ভাগ্য, তিনি তো আর যেখানে সেখানে যান না!
শ্যালন রাগ করে কি করবে তাকেই সব দিক সামলাতে হবে যে। মাসুদ ইরানী এসে পড়বে যে এখন।
সত্যি-ই যা ভেবেছিলো, সন্ধ্যার ঘন্টাখানেক পর মাসুদ ইরানী তার বিরাট প্লিমাউথ গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গেলো হাওড়া শালকিয়া গঙ্গাতীরস্থ শ্যালনের বাসভবনে।
শ্যালন প্রথমে একটু হচকিয়ে গেলেও সামলে নিলো সে অল্পক্ষণে। নিজে গিয়ে মাসুদ ইরানীকে। অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে এলো অভ্যন্তরে।
মাসুদ ইরানী কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে বললেন–আপনার স্বামীকে দেখছি না যে?
শ্যালন আমতা আমতা করে জবাব দিলো–তিনি অল্পক্ষণের জন্য বাইরে গেছেন।
শ্যালন নিজ হস্তে মাসুদ ইরানীর খাবারের আয়োজন করলো।
কিন্তু মাসুদ ইরানী আগে খেলেন না, তিনি বললেন–আলম সাহেব এলে এক সঙ্গে খাবেন। পিয়ানোর পাশে গিয়ে বসলেন মাসুদ ইরানী।
শ্যালন তার অদূরে একটি সোফায় বসেছিলো।
মাসুদ ইরানী ডাকলেন–এখানে আমার সম্মুখে বসুন।
শ্যালন দ্বিধাজড়িতভাবে উঠে এসে বসলো মাসুদ ইরানীর সম্মুখস্থ আসনে। হেসে বললো–আপনি বহু শ্রোতামহলে পিয়ানো শুনিয়ে তাদের আনন্দ দান করেন। আজ কিন্তু আমি একা আপনার পিয়ানো শ্রোতা।
সেই ভাল। বহু শ্রোতা এবং দর্শক মহলের শুনাম কুড়োনোর চেয়ে একজনের প্রশংসা অত্যন্ত কামনার, যদি।
সে তেমনি কোনো একজন ব্যক্তি হয়।
শ্যালন হাসলো–আমি তো তেমন কোনো ব্যক্তি নই।
তবু আপনি একাই যথেষ্ট। কথাটা বলে মাসুদ ইরানী পিয়ানোতে হাত রাখেন।
মধুময় ঝঙ্কারে মুখর হয়ে উঠে গঙ্গাতীরস্থ বাংলো বাড়িটা। রাতের অন্ধকারে গঙ্গার বুকে জাগে এক অপূর্ব সুরের লহরী।
মাসুদ ইরানী পিয়ানো বাজিয়ে চলে।
ভুলে যায় শ্যালন তার আপন সত্তা। আলমের কথা তার মন থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য।
মাসুদ ইরানীর পিয়ানো বেজেই চলে।
রাত বেড়ে আসে।
মাসুদ ইরানী পিয়ানো রেখে উঠে দাঁড়ায়।
শ্যালন তখনও তন্দ্রাচ্ছন্নের মত বসেই আছে।
মাসুদ ইরানী এবার বিদায় চায়।
শ্যালন ফিরে পায় তার সম্বিৎ, বলে–এতো শীঘ্র চলে যাবেন? আর একটু বাজাবেন না?
আজ নয়, আবার আসবো।
শ্যালন কণ্ঠ থেকে হার ছড়া খুলে বাড়িয়ে ধরে–টাকা নেই, তাই–
হাসে মাসুদ ইরানী–ওটা আপনার গলাতেই থাক। টাকার চেয়ে আপনার সান্নিধ্য আমার কাছে অনেক মূল্যবান।
মাসুদ ইরানীর কথায় শ্যালন যেন অভিভূত হয়ে পড়ে। এমনি করে আলম তো কোনোদিন তাকে বলে না। তার আলমের চেয়ে মাসুদ ইরানীর হৃদয় কত স্বচ্ছ!
মাসুদ ইরানী বিদায় নিয়ে চলে যায়।
শ্যালন পিয়ানোর পাশে গিয়ে বসে, হাত বুলায় সে পিয়ানোখানার উপর।
পিছনে এসে কখন যে দাঁড়িয়ে আছে বনহুর সে দেখতে পায়নি। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে দেখে সে, মুখে ফুটে উঠে একটা আনন্দদ্যুতি। ডাকে এক সময় শ্যালন!
চমকে ফিরে তাকায় শ্যালন, তাড়াতাড়ি পিয়ানোর পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে–এতো দেরী করে এলে আলম? বাহু দুটি দিয়ে জড়িয়ে ধরে ওর কণ্ঠ।
হাসিমুখে জবাব দেয় বনহুর–কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম, তাই ফিরতে দেরী হয়ে গেলো। সত্যি আমি বড্ড অপেয়, তাই তোমার মাসুদ ইরানীর পিয়ানো আজ শুনবার সৌভাগ্য আমার হলোনা।
কিন্তু মাসুদ ইরানী বার বার তোমার কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন।
নিশ্চয়ই তোমার ব্যবহারে সে মুগ্ধ হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আলম, সে বলেছে আবার আসবে।
সত্যি বলছো?
হাঁ। আর শোনো, মাসুদ ইরানী কোনো রকম ফি নেননি আমার কাছে। হার দিতে গিয়েছিলাম–নিলেন না।
চমৎকার! চমৎকার তো? তাহলে মাসুদ ইরানী তোমাকে বাড়ি বয়ে আপনা-আপনি পিয়ানো শুনিয়ে গিয়েছেন? হুঁ, হবেই তো! এবার থেকে শুধু আর একদিন কেন, রোজই ধন্না দেবেন– একটু চুপ থেকে বললো বনহুর–মাসুদ ইরানীর পিয়ানোর সুর তোমাকে যেমন মুগ্ধ করেছে শ্যালন, তেমনি মুগ্ধ হয়েছে মাসুদ ইরানী তোমার রূপে।
শ্যালন বনহুরের কথাটা শুনে হেসে উঠলো খিল খিল করে, তারপর বললো–এ কথা তোমাকে কে বলেছে?
