মাসুদ ইরানী কক্ষে প্রবেশ করতেই আরতী আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়েছিলো, মাসুদ ইরানী বললো– বসুন। নিজেও আসন গ্রহণ করলো সে।
আরতী আসনে উপবেশন করলো, চোখ দুটো তখনও স্থির হয়ে আছে মাসুদ ইরানীর মুখে। দৃষ্টি যেন ফিরিয়ে নিতে পারছে না সে।
মাসুদ ইরানী বললো এবার–আপনি অভয়কর বিশ্বাসের আত্মীয়া?
আমি তাঁর কন্যা আরতী।
মাসুদ ইরানীর মুখমণ্ডল গম্ভীর হলো।
আরতী বললো–কিছু যদি মনে করেন আমি পিয়ানো শুনতে চাই!
এতোদূর এসেছেন কষ্ট করে, নিশ্চয়ই শোনাবো।
মাসুদ ইরানী উঠে গিয়ে তার পিয়ানোর পাশে বসলো। অপূর্ব ঝঙ্কারে মুখরিত হয়ে উঠলো কক্ষাভ্যন্তর।
মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে আরতী।
মাসুদ ইরানী তার পিয়ানোর বুকে দ্রুত হস্ত চালনা করে চলেছে।
কক্ষমধ্যে উজ্জ্বল নীলাভ আলো জ্বলছিলো। সে নীলাভ আলোতে অদ্ভুত এক মোহময় পরিবেশ রচনা হচ্ছিলো। তন্ময় হয়ে গেছে আরতী মাসুদ ইরানীর পিয়ানোর সুরে।
মাসুদ ইরানীর পিয়ানো বন্ধ হয় এক সময়।
সম্বিৎ ফিরে পায় আরতী।
ভ্যানিটী ব্যাগ খুলে বের করে এক হাজার টাকার একটি বাণ্ডিল। উঠে গিয়ে মাসুদ ইরানীর সম্মুখে বাড়িয়ে ধরে আরতী নিন, আপনার পারিশ্রমিক।
হঠাৎ মাসুদ ইরানী হেসে উঠে অদ্ভুতভাবে।
আশ্চর্য হয়ে তাকায় আরতী।
মাসুদ ইরানীর হাসি যেন থামতে চায় না।
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ–আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ায় মাসুদ ইরানী, তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে –ধনকুবের কন্যা–তাই অর্থের বাহাদুরী এতো! মাসুদ ইরানী তার পিয়ানোর সুরের জন্য বাড়ি বসে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করে না। আপনি এবার যেতে পারেন।
আরতী মাসুদ ইরানীর কথায় খুশি হতে পারে না। নত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকে সে।
মাসুদ ইরানী তার সম্মুখে এসে দাঁড়ায় দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?
আরতী একবার মাসুদ ইরানীর মুখে তাকিয়ে দৃষ্টি নত করে নিলো, তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
মাসুদ ইরানী আবার উঠে গিয়ে পিয়ানোর সম্মুখে বসলো, চললো তার পিয়ানো সাধনা।
আপন মনে পিয়ানো বাজিয়ে চলেছে মাসুদ ইরানী। অদ্ভুত এক সুরের সৃষ্টি করে চলেছে সে। রাত গম্ভীর হতে গভীরতর হয়ে উঠছে, কোনো দিকে খেয়াল নেই তার। দু’চোখ তার মুদিত।
স্বপ্নরাগের তিন তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসেন এক বৃদ্ধ, মাসুদ ইরানীর কক্ষে প্রবেশ করে স্থির হয়ে দাঁড়ান তিনি। অপূর্ব জ্যোতির্ময় এক তাপস।
মাসুদ ইরানীর পিয়ানো সমানে বেজে চলেছে। কোনো দিকে খেয়াল নেই মাসুদ ইরানীর। আপনাতে সে আপনি বিভোর!
বৃদ্ধ জ্যোতির্ময় তাপস তন্ময় হয়ে মাসুদ ইরানীর সুর শুনে চলেন।
এক সময় মাসুদ ইরানীর পিয়ানো থেমে যায়। নিদ্রায় দু’চোখ ঢুলু ঢুলু হয় তার। পিয়ানোর উপর মাথা রাখে সে।
বৃদ্ধ তাপস এগিয়ে আসেন, হাত রাখেন মাসুদ ইরানীর মাথায়।
চমকে সোজা হয়ে তাকায় মাসুদ ইরানী অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠে সে–গুরুদেব!
বৃদ্ধের দু’চোখে তীব্র অন্তর্ভেদী চাহনি স্থির কণ্ঠে বলেন তিনি–শুভাংশু–শুভংকর–শুভায়েনমঃ–বৎসে, তোমার সাধনা সার্থক হয়েছে।
মাসুদ ইরানীর দু’চোখে উজ্জ্বল দীপ্তময় এক অপূর্ব লহরী।
বৃদ্ধের পায়ে হাত রেখে কদমবুসি করে মাসুদ ইরানী।
বৃদ্ধ ফিরে যায় আপন কক্ষে।
*
গাড়ি থেকে বনহুর নেমে আসতেই শ্যালন ছুটে আসে, হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বলে–এমনি করে রাতের পর রাত তুমি কোথায় কাটাও আলম?
শ্যালন, বাংলাদেশের মাটি আমাকে সব সময় আকর্ষণ করে তাই আমি কোথাও স্থির হতে পারি না। ছুটে ফিরি সদা এখান থেকে সেখানে, এ-কাজ থেকে সে-কাজে।
আমাকে তুমি সঙ্গে নিয়ে যাওনা কেন?
তুমি নারী, সব সময় টিকে উঠতে পারবে না তাই।
কিন্তু একথা ভুলে গেছো–আমি একদিন না থাকলে–
হাঁ, সেদিন আমার মৃত্যু ঘটতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আলম!
চলো শ্যালন, ঘরে যাই।
কক্ষে প্রবেশ করে জামা কাপড় খুলতে খুলতে বলে বনহুর–শ্যালন, তুমি না মাসুদ ইরানীর পিয়ানো শুনতে ভালবাস?
হাঁ, আমার বড় ভাল লাগে মাসুদ ইরানীর পিয়ানো।
আর তাকে?
এ প্রশ্ন তুমি আরও অনেক দিন করেছে। কিন্তু কেন বলো তো?
শ্যালন, মাসুদ ইরানীকে তুমি ভালবাসো–এ কথাও অস্বীকার করতে পারো না।
কিন্তু তোমার মত নয়।
মাসুদ ইরানীর চেয়ে আমাকে তুমি বেশি ভালবাসো?
হ। আলম, তুমি আমাকে কত বার মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছো!
সে কারণেই বুঝি আমার প্রতি তোমার এতো প্রীতি?
না, শুধু সে কারণে নয়–তোমাকে আমার ভাল লাগে।
যাক সে সব কথা শোনো শ্যালন, তোমাকে বলতে এতোক্ষণ ভুলেই গেছি। আজ মাসুদ ইরানী আসবেন আমাদের বাসায়।
শ্যালন যেন আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠে, বলে–সত্যি বলছো?
হাঁ, আমি তাকে আসার জন্য অনুরোধ করে এসেছি।
কিন্তু
আবার কিন্তু কি শ্যালন?
শুনেছি তার ফি নাকি এক হাজার টাকা।
হাঁ, কিন্তু এতো টাকা আমি দেবো কোথা হতে। সত্যি আমি সে কথাও ভুলেই গিয়েছিলাম। কথাগুলো বনহুর চিন্তিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলো।
শ্যালনের মুখ বিমর্ষ হলো।
বনহুর বললো–তা হলে মাসুদ ইরানীকে নিষেধ করে দিয়ে আসি।
না, তা হয় না।
এতো টাকা আমার নেই যে শ্যালন!
আমার এ হারের দাম এক হাজার টাকা মূল্যের বেশি হবে। আলম, তুমি এ হার বিক্রয় করে টাকা নিয়ে এসো। শ্যালন তার নিজের কণ্ঠ থেকে হার খুলে বনহুরের দিকে বাড়িয়ে ধরলো।
