অভয়কর বিশ্বাস কালোমূর্তির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। বাধ্য হয়েই তিনি সিমেন্ট কারখানায় নির্ভেজাল সিমেন্ট তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কথায় বলে, যে কুকুরের লেজ বাকা, সো হাজার ইট পাটকেল বেঁধে দিলেও সোজা হয় না।
অভয়কর বিশ্বাসের কারখানায় ভেজালশূন্য সিমেন্ট তৈরি হলেও এবার পুরাদমে শুরু হলো ব্লাকমার্কেট। তার কারখানা থেকে হাজার হাজার ব্যাগ সিমেন্ট চোরাচালানিভাবে জাহাজ বোঝাই হয়ে গোপনে চলে যেতে লাগলো বিদেশে।
গোয়েন্দা বিভাগ নিপুণ সতর্কতা সত্ত্বেও অভয়কর বিশ্বাসের চোরা কারবারের কিছুমাত্র প্রতিরোধ করতে পারলেন না।
বনহুর সব সন্ধান পেলো।
এবার তার চোরাচালানি একেবারে বন্ধ করে দেবার জন্য সে প্রস্তুতি নিলো।
*
একদিন অভয়কর বিশ্বাস তাঁর গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলেন। খিদিরপুর তার কোম্পানী থেকেই ফিরছিলেন তিনি। তার ড্রাইভার যতীন গাড়ি চালিয়ে চলেছে।
একটা নির্জন গলি-পথে গাড়িখানা অগ্রসর হচ্ছিলো। হঠাৎ গাড়িখানা থেমে যায়, ড্রাইভার যতীনের বেশে গাড়ি চালাচ্ছিলো দস্যু বনহুর। আচমকা বনহুর রিভলভার বের করে চেপে ধরে অভয়কর বিশ্বাসের বুকে। গম্ভীর চাপা কণ্ঠে বলে–জীবন না অর্থ–কোটা তুমি চাও?
কে তুমি? বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন অভয়কর বিশ্বাস।
আমি তোমার সে হিতৈষী বন্ধু।
কি চাও আজ তুমি আমার কাছে?
চোরা কারবার বন্ধ করতে হবে, নচেৎ মৃত্যুবরণ করবে। বলো কোনটা চাও?
অভয়কর বিশ্বাস নীরব।
বনহুর পুনরায় দাঁতে দাঁত পিষে বললো–কোনোরকম মিথ্যা কথা চলবে না।
আমি চোরাচালানি করি কে বললো?
পুলিশের চোখে ধূলো দিলেও আমার চোখে ফাঁকি দিতে পারবে না। সিমেন্টে ভেজাল বন্ধ করেছো, এবার বন্ধ করবে তোমার ব্লাক মার্কেট বিজনেস। বলো রাজি?
অভয়কর বিশ্বাস তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। এ মুখ কোথাও দেখেছে বলে মনে হলো না।
একজোড়া গোঁফের নিচে কালো দু’খানা ঠোঁট। ঠিক যেন সিগারেটের ধোয়ার ধোঁয়ায় কালচে হয়ে উঠেছে। গায়ের রংটাও বনহুর পাল্টে নিয়েছিলো, ঠিক যতীনের মত করে।
অভয়কর বিশ্বাস অনেক চেষ্টা করেও স্মরণ করতে পারলেন না–একে পূর্বে কোথাও দেখেছেন কিনা। ঢোক গিলে বললেন–তুমিই কি সে কালোমূর্তি?
না! আমি তার বিশ্বস্ত অনুচর। কিন্তু আমার মালিক অতি ভয়ঙ্কর, যেমন দুর্দান্ত তেমনি নররক্তপিপাসু।
কে কে তোমার সে মালিক?
একটু পূর্বেই বলেছি–কালোমূর্তি। বলো আমার আদেশ পালন করবে তো?
অধরদংশন করলেন অভয়কর, তারপর বললেন হা।
কিন্তু মনে রেখো, যদি কোনরকম শয়তানি করো তাহলে তোমার মৃত্যুকে কেউ রোধ করতে পারবে না।
বনহুর কথা শেষ করে ড্রাইভিং আসন ত্যাগ করে নেমে গেলো।
অভয়কর বিশ্বাস ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন, কণ্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে গেছে তার।
*
স্বপ্নরাগ রিক্রিয়েশন ক্লাবের দ্বিতল একটি কামরায় থাকেন বিখ্যাত পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানী। একমাত্র সন্ধ্যায় তার সঙ্গে দেখা করার টাইম। সন্ধ্যা সাতটা থেকে নয়টার মধ্যে ছাড়া তাকে পাওয়া যাবে না। কারণ, মাসুদ ইরানী সর্বক্ষণ বাইরে ব্যস্ত থাকেন। নানা জায়গায় ফাংশানে-পার্টিতে তাকে যোগ দিতে হয়। যে কোনো ফাংশানে হাজার টাকা তার ফি। কাজেই মাসুদ ইরানীকে সব সময় পাওয়া যায় না।
আজ আরতী দেবী স্বয়ং এসেছে মাসুদ ইরানীর সঙ্গে দেখা করতে। মাসুদ ইরানীর সহকারী ফরিদ ওসমানী আরতী দেবীকে সসম্মানে ক্যাবিনে নিয়ে বসালেন। এখনও মাসুদ ইরানী তার বৈকালিক ভ্রমণ থেকে ফিরে আসেননি।
আরতি মনে একটা বিপুল উন্মাদনা নিয়ে বসে থাকে। মাসুদ ইরানীকে সে অভিনন্দন জানাতে এসেছে। মাসুদ ইরানীর পিয়ানোই শুধু তাকে বিমুগ্ধ করেনি, তার সৌন্দর্য আকৃষ্ট করেছে তাকে। সেদিনের পর থেকে তাপসীর মত মেয়ে আরতীর মনেও অগুন ধরে গিয়েছিলো। সব সময় হৃদয়ের কোণে একটি সুর যেন বেজে চলেছিলো–সে ঐ মাসুদ ইরানীর পিয়ানোর সুর।
আরতী আজ স্ব-ইচ্ছায় এসেছে মাসুদ ইরানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। অন্তরের অনুভূতি দিয়ে অভিনন্দন জানাতে। পিতার কুৎসিত মনোবৃত্তির কাছে সে ছিলো এক অসামান্য মেয়ে। মন তার ছিলো উদার-মহৎ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন। অন্যায়, অনাচারকে আরতী মন থেকে ঘৃণা করতো। পিতার আচরণের প্রতি আরতীর অশ্রদ্ধা জন্মায়, পুরুষ জাতির প্রতিই সে সম্পূর্ণ বিরূপ হয়ে পড়েছিলো। সে ভাবতো, পুরুষ জাতটাই বুঝি এমনি স্বার্থপর তার মনুষ্যত্বহীন। কিন্তু মাসুদ ইরানীকে দেখা অবধি তার মনে দারুণভাবে একটা পরিবর্তন। এসেছিলো-মাসুদ ইরানীর দুটি চোখে সে দেখতে পেয়েছিলো উজ্জ্বল পৌরুষ আর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ।
আরতী যখন মাসুদ ইরানী সম্বন্ধে ভাবছে তখন আচমকা কক্ষে প্রবেশ করলো সে সৌম্যসুন্দর দীপ্তকায় যুবকটি। মাথায় একরাশ সোনালী কৌকড়ানো চুল। গভীর নীল দুটি চোখ, হাস্যউজ্জ্বল মুখমণ্ডল। আরতীকে দেখে থমকে দাঁড়ালো।
ফরিদ ওসমানী তখন কক্ষে ছিলো না।
আরতী প্রথমে বিব্রত বোধ করলো, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললো–আমি আপনার পিয়ানোর সুরে মুগ্ধ হয়েছি।
মাসুদ ইরানী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো, এ মেয়েটিকে সে অভয়কর বিশ্বাসের বাড়িতে দেখেছিলো। আরতীর কথায় বললো–সেজন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
