টাকার জন্য ভেবো না শ্যালন, তোমার নাম বললে মাসুদ ইরানী না এসেই পারে না।
তাহলে তোমাকে ছেড়ে দিলাম, কিন্তু সকাল সকাল ফিরবে। বড় রাত করে বাসায় আসো, আমি রোজ ঘুমিয়ে পড়ি।
হাঁ, তুমি আমার জন্য অপেক্ষা না করে ঘুমাবে, আর শোনো, চারপাশের দরজা ভাল করে বন্ধ করে শোবে।
শ্যালন বনহুরের কথামত কাজ করে। সূতীক্ষ্ণ বুদ্ধিমতী মেয়ে সে নয়। বনহুর ওকে ভয় দেখিয়েছে– ফাঁক পেলেই কালোমূর্তির আবির্ভাব ঘটতে পারে, কাজেই তুমি সাবধান থাকবে।
সে রাতে বনহুর ষ্টার থিয়েটার হলে বিনোদ বিহারী নামক এক ধনকুবেরের স্ত্রীর কণ্ঠ থেকে লক্ষ টাকা মূল্যের হার হরণ করে। আরও এক মহাজনের আড়ত থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে উধাও হয়।
একই রাতে দুটো রহস্যজনক ডাকাতি।
*
পরদিন।
বনহুর ঘুমিয়ে আছে, বেলা প্রায় ন’টা বাজতে চলেছে। তবু তার নিদ্রাভংগের কোনো লক্ষণ নেই।
শ্যালন ব্যস্তসমস্ত হয়ে প্রবেশ করলো তার কক্ষে। হস্তে তার দৈনিক সংবাদপত্র। বনহুরের পাশে বসে হন্তদন্ত হলে ডাকলো–আলম, আলম–
উ বলে পাশ ফিরলো বনহুর।
শ্যালন ওকে ঝাঁকুনি দিয়ে পুনঃ পুনঃ ডাকতে লাগলো–উঠো। উঠো দেখো—
হাই তুলে উঠে বসলো বনহুর–উঃ! বড় জ্বালাতন করে মারলে শ্যালন।
শ্যালন চঞ্চল কণ্ঠে বললো–এই দেখো। পত্রিকাখানা মেলে ধরলো তার সামনে।
কি ব্যাপার বলোই না? চোখ তুলে তাকালো বনহুর।
শ্যালন বললো–কাল রাতে তুমিও তো গিয়েছিলে ষ্টার থিয়েটার হলে মাসুদ ইরানীর পিয়ানো শুনতে। শুনেছিলে কিছু?
কই না তো? কেন কি হয়েছে?
“অসংখ্য জনতার মধ্যে বিস্ময়কর চুরি”
তার মানে?
গতরাতে নামকরা মহাজন বিনোদ বিহারী চন্দ্রের স্ত্রীর কণ্ঠ থেকে মূল্যবান হার-চুরি গেছে। তুমিও তো গিয়েছিলে ষ্টারে, শোনোনি কিছু?
আমি কি হার চুরি সংবাদ শুনতে গিয়েছিলাম? যখন হার চুরি হয় তখন আমি মাসুদ ইরানীর পিয়ানোর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম–সত্যি অপূর্ব! বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ায়।
শ্যালন বলে আবার–এই দেখো, আরও একজন ব্যবসায়ীর আড়ত থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা হরণ–
এ সব আমাকে শোনাচ্ছ কেন শ্যালন?
সত্যি, এতোবড় একটা শহরে প্রতিদিন এমনি চুরি-ডাকাতি হচ্ছে অথচ পুলিশ কিছু করতে পারছে না। আমার কিন্তু ভয় হয় তুমি কত রাত বাইরে থাকো–
তুমি কি মনে করো এসব চুরি-ডাকাতি আমিই করছি?
ছিঃ ও কথা কে বলছে বলো? তুমি বাইরে থাকো আমি একা বাসায় থাকি–ভয় হয় কখন কোন পথে চোর ঢুকে–
তোমাকে হরণ করে নিয়ে যাবে–এই তো ভয়?
ঠিক তা নয়।
তবে?
তোমার প্রশ্নের জ্বালায় বাঁচিনে। যাও তো বাথরুমে হাত মুখ ধুয়ে এসো, টেবিলে চা এসে গেছে।
বনহুর শ্যালনের বাধ্য ছাত্রের মত বাথরুমে প্রবেশ করে। আপন মনেই হাসে বনহুর, শ্যালনই শুধু জানে–আলম দস্যু বনহুর। কলকাতার বুকে সে ছাড়া আর দ্বিতীয় প্রাণী কেউ জানে না তার আসল পরিচয়। কিন্তু এতো জেনেও শ্যালন আলমকে অবিশ্বাস করতে পারে না কোনোদিন। কারণ, যাকে ভালবাসা যায় তাকে নাকি অসৎ ভাবা যায় না।
শ্যালনের অবস্থাও তাই, সে ভাবতে পারে না আলম কলকাতার বুকে আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলেছে। সে ভাবতেও পারে না–আলম একজন দুর্দান্ত দস্যু।
আলমকে সে শুধু ভালই বাসে না–মনপ্রাণ দিয়ে সমীহ করে, বিশ্বাস করে তাকে। আলমের মত আর কাউকে বুঝি এতোখানি সে সমীহ করেনি কোনোদিন।
পুলিশ মহল এ কালোমূর্তির আবির্ভাব নিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়েছে। আজ এখানে কাল সেখানে সব সময় কালোমূর্তি হানা দিয়ে লক্ষ লক্ষ অর্থ হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে অথচ পুলিশ বা গোয়েন্দা বিভাগ কিছুই করতে পারছে না। সমস্ত শহরময় একটা আতঙ্কভাব ছড়িয়ে আছে সর্বক্ষণ। ট্রাম, বাস বা যে কোনো যানবাহনে সদা ঐ কালোমূর্তির আবির্ভাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
যতদূর সম্ভব সবাই সতর্ক হয়ে চলাফেরা করছে। কিন্তু এতেও রেহাই নেই, কালোমূর্তি ঠিকভাবেই তার কাজ চালিয়ে চলেছে।
সবচেয়ে বেশি আক্রোশ যেন কালোমূর্তির অভয়কর বিশ্বাসের উপর। ইতিমধ্যে কালোমূর্তি হানা দিয়ে তাঁর সিমেন্ট কারখানার সমস্ত কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলো, সিমেন্টে কোনোরকম ভেজাল চলবে না। যে শ্রমিক ভেজাল সিমেন্ট তৈরি ব্যাপারে কারখানার কাজ করবে তাকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। তাছাড়া শ্রমিক সর্দার নাসির আলীর উপর আদেশ ছিলো, যতক্ষণ কারখানায় আসল সিমেন্ট তৈরির হুকুম না দেয়া হবে ততক্ষণ। বা ততদিন ধর্মঘট সমানে চলতে থাকবে। বনহুর নিজে বস্তিতে গিয়ে শ্রমিকদের অভাব-অভিযোগ দেখে প্রচুর অর্থ দিয়ে আসতো, কারণ তারা যেন ক্ষুধার তাড়নায় অন্যায় কাজে প্রবৃত্ত না হয়।
অভয়কর বিশ্বাস প্রতিটি কাজে বাধা পেতে লাগলেন। সিমেন্ট কারখানার কাজ বন্ধ হয়ে গেলো প্রায়। অন্যান্য কোম্পানীগুলোও শিথিল হয়ে এলো। শ্রমিকের দল ধর্মঘটের পর ধর্মঘট চালিয়ে চলেছে। নাসির আলীর উপর যে কোনো কর্মচারী অত্যাচার চালাবে তাকেই কালোমূর্তি চরম শাস্তি দেবে–কেউ ভয়ে নাসির আলীকে কিছু বলতে সাহসী হয় না।
অভয়কর বিশ্বাস নাসির আলী সম্বন্ধে পুলিশে রিপোর্ট দিতে গিয়েছিলেন কিন্তু পারেন নি। কালোমূর্তি তাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে সে পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ভীম সিং তার দক্ষিণ হাতখানা চিরতরে হারিয়ে অকেজো হয়ে পড়েছে। ভীম সিং এর মত একজন বিশ্বস্ত অনুচরের এ চরম অবস্থার জন্য অভয়কর বিশ্বাস মুষড়ে পড়েছিলেন। আরও বেশি তিনি ভেঙে পড়েছেন শ্যালনকে হারিয়ে। আলবার্ডের কাছেও তিনি অনেক হেয় হয়ে গেছেন। আলবার্ড দুটো কথা শোনালেও অভয়কর কোনো জবাব দিতে পারেন না। কারণ, শ্যালনকে তিনি সামলে রাখতে সক্ষম হননি। শ্যালন সম্বন্ধে পুলিশে ডায়রী দেওয়াও সমীচীন নয় ভেবে এ ব্যাপারেও তিনি ক্ষান্ত রয়েছেন। অভয়কর বিশ্বাস জানেন, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে যেতে পারে কাজেই নিশ্চুপ থাকাই মঙ্গল।
