এমন সময় মিঠু পত্রিকাখানা রেখে যায় টেবিলে। বনহুর সোফায় বসে পত্রিকাখানা তুলে নেয় হাতে। আজ অন্যান্য খবরে দৃষ্টি না দিয়ে প্রথমে নজর বুলায় সে বিজ্ঞাপন পৃষ্ঠায়। বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞপ্তিগুলোর উপর দৃষ্টি বুলিয়ে চলে। হঠাৎ খুশি হয় সে, “হাওড়া শালকিয়া এলাকায় গঙ্গার ধারে একটি ছোট্ট বাংলো প্যাটার্ণ বাড়ি ভাড়া দেয়া হবে। ঠিকানা, এবং ফোন নাম্বার নিচে রয়েছে।
বনহুর কাগজখানা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে পড়লো।
শ্যালন তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো বাথরুম থেকে, বললো–কি ব্যাপার? পত্রিকাখানা অমন করে ছুঁড়ে ফেলে দিলে কেন?
নতুন কোনো সংবাদ নেই। কথাটা অবশ্য মিথ্যা, কারণ বনহুর পত্রিকায় ভালভাবে লক্ষ্যই করেনি।
শ্যালন পত্রিকাখানা হাতে তুলে নিতেই অস্কুট ধ্বনি করলো দেখেছো, আজও আবার সে জমকালো মূর্তির আবির্ভাব!
হুঁ! কোথায়? বনহুর স্লিপিং গাউনের বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বললো।
শ্যালন পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় লক্ষ্য করে বলল–অভয়কর বিশ্বাসের বাড়িতে। কালোমূর্তি মিঃ বিশ্বাসকে নাকি বেঁধে তার সর্বস্ব নিয়ে উধাও হয়েছে। ইতিপূর্বে আরও দু’বার এ কালো মূর্তি তার বাড়িতে এবং কারখানার অফিসে হানা দিয়েছে।
বনহুর ঝুঁকে পড়লো, পত্রিকায় দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললো–ডাহা একটা মিথ্যে কথা বলেছে বিশ্বাস!
মিথ্যে, কি করে বুঝলে আলম?”
না না কিছুনা। কাল রাতে তোমাকে নিয়ে আসার পর তাহলে কালোমূর্তি হানা দিয়েছিলো বলে মনে হচ্ছে।
শ্যালন এবার প্রশ্ন করলো–এতোবড় শহরটার বুকে একটা কালো মূর্তি রোজ এভাবে লোকচক্ষুর সম্মুখে লুটতরাজ করে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে উধাও হবে আর পুলিশ তাকে ধরতে পারবে না–সত্যি বড় আশ্চর্য!
বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ালো–শ্যালন, কালোমূর্তি গ্রেপ্তার হলে তুমি খুশি হও?
বা রে খুশি হবো না মানে! খুব খুশি হবো।
তাহলে অভয়করের হাত থেকে তোমার উদ্ধার চিরতরে মিটে যেতো।
কেন? কেন?
কালোমূর্তিই তোমায় উদ্ধার করেছে শ্যালন।
তবে যে বললে তুমি?
হাঁ, কালোমূর্তির সহায়তা ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলো না। একটু থেমে বললো সে–শ্যালন, তুমি অপেক্ষা করো, আমি বাইরে যাবো।
সেকি, আমাকে সঙ্গে নেবে না?
না।
কোথায় যাবে?
পরে বলবো।
*
হাওড়া।
শালকিয়া এলাকায় গঙ্গার ধারে সুন্দর বাংলো প্যাটার্ণের একখানা বাড়ি।
বনহুর এ বাড়িই ভাড়া নিলো তার থাকার জন্য। তাই বলে সে এ্যাও হোটেল থেকে বিদায় নিয়ে এলো না। সেখানেও ঠিক পূর্বের মতই রয়ে গেলো। তবে মিতুকে সব সময় তার কামরাটা পাহারা দিয়ে রাখতে হতো। কারণ, বনহুর প্রায় রাতই হোটেলে ফিরতোনা।
শ্যালনকে প্রথম দিন বনহুর বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলো। মস্ত বড় বাড়ি, পাশাপাশি বেশ কয়েকখানা কামরা। বনহুর যে কামরায় থাকতো তার পাশের কামরাই ছিলো শ্যালনের জন্য।
কিন্তু শ্যালন যাতে বুঝতে না পারে সে তাকে এড়িয়ে চলার জন্যই এ ব্যবস্থা করেছে। বনহুর বলেছিলো–সব সময় হোটেলে থাকা সম্ভব নয়, বিশেষ করে তোমাকে নিয়ে–তাই এ বাড়িটা ভাড়া নিলাম।
গঙ্গাতীরে সুন্দর মনোরম বাড়ি।
খুশিই হলো শ্যালন।
এখানে তার নেই কোনো ভয়-ভীতি আর আশঙ্কা। কিন্তু একটা উদ্বিগ্নতা এখন তার মনে অহরহ জেগে রয়েছে। সদা ভয় তার আলমকে নিয়ে। বাইরে গেলে আর সহজে ফিরবার কথা নেই।
শ্যালন একা একা বাড়িটায় যেন হাঁপিয়ে পড়ে।
আজ সপ্তাহ হলো এ বাড়িতে এসেছে, একটি দিন আলমকে সে একান্ত নিভৃতে পায়নি। বাড়ির চাকর বাকর আর বাবুর্চি ছাড়া কেউ থাকতো না বা কাউকে পেতো না সে।
আলম ফিরতো, কিন্তু গভীর রাতে যখন শ্যালন নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে তখন। মাঝের দরজায় আলম খিল এঁটে দিয়ে ঘুমাতে ঘুম ভেঙে গেলেও সে ওর নাগাল পেতো না। শ্যালন যেন হাঁপিয়ে পড়ছিলো দিন। দিন।
*
সেদিন বনহুর ভোরে বাথরুম থেকে বের হতেই শ্যালন গিয়ে ধরে বসলো–আজ তোমাকে কোথাও যেতে দেবোনা আলম।
বনহুরের মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো, বললো–শ্যালন, আজ না গিয়ে যে কোনো উপায় নেই।
কোথায় যাবে তুমি?
আজ ষ্টার থিয়েটার হলে মাসুদ ইরানী পিয়ানো বাজাবে।
মাসুদ ইরানী! শ্যালন আনন্দধ্বনি করে উঠলো। তারপর বললো–তুমিও বুঝি মাসুদ ইরানীর পিয়ানো শুনতে ভালবাসো?
খুব!
সত্যি, আমার কাছে অপূর্ব মনে হয়!
মাসুদ ইরানী, না তার পিয়ানোর সুর? কোনটা?
দু’টোই! মাসুদ ইরানী সত্যিই অদ্ভুত মানুষ।
বনহুর কোনো কথা বললো না।
শ্যালন বনহুরের মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বললো– রাগ করলে নাতো?
অভিমানের সুরে বললো বনহুর–মাসুদ ইরানীর তুলনায় আমি তো নগণ্য একটি মানুষ—
ছিঃ, আমি সে কথা বলিনি। মাসুদ ইরানীর পিয়ানো আমার ভাল লাগে তাই।
বেশ, মাসুদ ইরানীর সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেবো।
সত্যি বলছো?
হু।
কিন্তু আজ আমিও যাবো তোমার সঙ্গে।
কোথায়?
ষ্টারে, মাসুদ ইরানীর পিয়ানো শুনতে।
কিন্তু অভয়কর বিশ্বাস বা তার লোক যদি তোমায় দেখে ফেলে?
থাক আমি যাবোনা! শ্যালনের মুখখানা বিমর্ষ-বেদনাময় হলো।
বনহুর ওকে কাছে টেনে নিলো, আবেগ ভরা কণ্ঠে বললো– শ্যালন, মাসুদ ইরানীকে যদি আমার বাংলোয় নিয়ে আসি খুশি হবে তুমি?
ডাগর ডাগর চোখ দুটি তুলে তাকালো শ্যালন বনহুরের মুখে, ওর কথা যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা। মাসুদ ইরানী আসবে তার এখানে– অসম্ভব এ কথা। বললো শ্যালন–শুনেছি মাসুদ ইরানীর অনেক টাকা ফি?
