কিছুক্ষণ এ–পথ সে–পথ করে ঘুরে ফিরলো তারপর গঙ্গাতীরে এসে গাড়ি রাখলো একটা নির্জন স্থান দেখে নিয়ে। ড্রাইভিং আসন থেকে নেমে পিছন আসনে উঠে বসলো। গাড়ির ভিতরে সুইচ টিপে আলোটা জ্বেলে নিলো সে। শ্যালনের সংজ্ঞাহীন মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে দেখলো, এখনও জ্ঞান ফিরে আসেনি।
যতক্ষণ শ্যালনের জ্ঞান ফিরে না আসে ততক্ষণ তাকে গঙ্গা তীরেই অবস্থান করতে হবে। আলো নিভিয়ে দিলো সে। না হলে গঙ্গাতীরস্থ কোনো ব্যক্তি হঠাৎ যদি এসে পড়ে–বিভ্রাট ঘটবে।
অন্ধকারে শ্যালনের পাশে নিজেকে ধরে রাখাও উচিৎ মনে করলো না, কারণ সে নারী নয়–পুরুষ। একটা সংজ্ঞাহীন অসহায় যুবতীর পাশে সে একজন উচ্ছল তরুণ যুবক। নিজেকে সংযত করে নিয়ে ড্রাইভিং আসনে এসে বসলো। সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চললো সে।
অন্ধকারে গঙ্গার শীতল বাতাসে হাড়ে যেন কাপন আসছে।
হঠাৎ পিছন আসনে নড়ে উঠলো শ্যালন, একটা অস্পষ্ট শব্দ করলো, মা–মাগো–উঃ–
খুশিতে উজ্জ্বল হলো ওর মুখ, তাড়াতাড়ি হস্তস্থিত সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পিছন আসনে উঠে বসলো।
কে–কে তুমি! বললো শ্যালন।
সুইচ টিপে আলো জ্বালাতেই শ্যালন অস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করলো–আলম তুমি।
আলম নই–দস্যু বনহুর।
না, না, তুমি দস্যু নও–শ্যালন বনহুরের বুকে মুখ গুঁজলো।
*
বাধ্য হলো বনহুর গাড়ির ভিতরের আলো নিভিয়ে দিতে।
শ্যালনকে নিয়ে বনহুর গ্র্যাণ্ড হোটেলে এসে উঠলো। মিঠু ঘুমিয়ে পড়েছিলো, মনিবের ডাকে জেগে উঠে অবাক হলো। মনিবের সঙ্গে একটি যুবতীকে দেখে প্রশ্ন করে বসলো সে–স্যার, ইনি কে?
বনহুর শরীর থেকে জামাটা খুলতে খুলতে বললো–আমার বোন। দেশ থেকে এসেছে, ক’দিন এখানেই থাকবে।
এবার মিঠু খুশি হলো, হেসে বললো–ঠিক আপনার মতই দেখতে কিন্তু স্যার।
শ্যালন বনহুরের জবাবে খুশি হলো কিনা বোঝা গেলো না। যেমন নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলো তেমনি রইলো।
মিঠু বললো–স্যার, খাবার টেবিলে ঢাকা রয়েছে।
ওসবে প্রয়োজন হবে না। তুই এবার শুবি যা মিঠু।
মিঠু চলে গেলো।
শ্যালন তখনও দাঁড়িয়ে, মনের মধ্যে তার নানা চিন্তা জট পাকাচ্ছিলো।
বনহুর স্লিপিং গাউন গায়ে দিয়ে ফিরে তাকায়–কি ভাবছো শ্যালন?
শ্যালন জবাব দেয়–ভাবছি আলবার্ড কাকার নির্মম জঘন্য আচরণের কথা।
সে কারণেই আমি তোমাকে আর পার্ক-সার্কাস তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলাম না। অভয়কর বিশ্বাস আবার তোমার উপর আক্রমণ চালাতে কসুর করতেন না।
আলম, আমি আর সেখানে ফিরে যাবো না। সত্য বলছি, প্রাণ থাকতে কিছুতেই আমি ও-বাড়িতে যাবো না।
কিন্তু–
আমাকে হত্যা করলেও না। ইস, কি ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে আজ তুমি আমাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে।
শ্যালন, কিন্তু আমার কাছেই বা তুমি থাকবে কি করে?
কেন? ম্লান মুখে তাকালো শ্যালন বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর শ্যালনকে তার শয্যার পাশে বসিয়ে দিয়ে বললো– আমি বন্ধনহীন একটি প্রাণী। আমার কাছে থাকা তোমার মোটেই নিরাপদ হবে না।
আলম, তাহলে বলো আমি কোথায় যাবো?
বনহুর দরজা বন্ধ করে ফিরে এলো, শ্যালনের পাশে ঘনিষ্ঠ হলে বললো–আমাকে যেমন বিশ্বাস করো তেমনি কাউকে কি করতে পারোনা?
তোমাকে ছাড়া আমি কাউকে বিশ্বাস করিনে আলম। আমি কাউকে বিশ্বাস করিনে। শ্যালন বনহুরের কন্ঠ বেষ্টন করে ধরে।
বনহুর শ্যালনের মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়। বলে–বেশ, তুমি থাকবে আমার কাছে, কিন্তু
না না কোনো কিন্তু নয়, আমাকে তুমি দূরে ঠেলে দিও না।
কথার মাঝে আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে শ্যালন। কিছুক্ষণেই বনহুর বুঝতে পারল–তার বুকের উপর মাথা রেখে শ্যালন ঘুমিয়ে পড়েছে।
বনহুর ধীরে ধীরে শ্যালনকে তার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো, একখানা চাদর ঢাকা দিলো ওর দেহে। তারপর নিজে গিয়ে শুয়ে পড়লো ডবল সীটের একটা সোফায়।
*
ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো শ্যালনের, বিছানায় উঠে বসতেই নজর পড়লো সোফায়। সোফার হাতলে মাথা রেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে আলম। হাত দু’খানা বুকের উপরে রয়েছে।
কাঁচের শাশী দিয়ে প্রভাতের সূর্যের আলো কক্ষটাকে উজ্জ্বল করে তুলেছিলো। শ্যালন নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলো বনহুরের বলিষ্ঠ সুন্দর ঘুমন্ত মুখের দিকে।
শ্যালন নিজেকে হারিয়ে ফেলে, ভুলে যায় সে আপন সত্তা। ঝুঁকে পড়ে সে বনহুরের পুরু দুটি ঠোঁটের উপর।
ঘুম ভেঙে যায় বনহুরের, নিদ্রাজড়িত কণ্ঠে বলে–একি করছো শ্যালন?
আলম, আমাকে একা ফেলে তুমি সোফায় শুয়েছিলে কেনো? বলো জবাব দাও?
তুমি তো অবুঝ নও! ছিঃ সরে যাও শ্যালন, মিই এসে পড়বে।
পড়ুক। কোমল বাহু দুটি দিয়ে বনহুরের কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরে শ্যালন, ব্যাকুল আগ্রহে মুখখানা বাড়িয়ে দেয় সে।
বনহুর বলে–উ হু। শ্যালনের বাহু দুটি মুক্ত করে দিয়ে উঠে।
এমন সময় মিঠু দরজায় ডাকে–স্যার!
দরজা খুলে দেয় বনহুর–কি-রে মিঠু?
স্যার, অনেক বেলা হয়ে গেছে।
বনহুর সোফায় বসে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে।
শ্যালন তখন বাথরুমে প্রবেশ করেছে।
বনহুর সোফায় হেলান দিয়ে সিগারেট পান করছিলো, তাকিয়ে ছিলো সে আনমনে করিডোরের দিকে। ভাবছিলো গুরুত্বপূর্ণ কথা। এভাবে শ্যালনের সঙ্গে এক কক্ষে বাস করা আর কিছুতেই সম্ভব নয়। নিজেকে সে কতক্ষণ সংযত রাখতে পারবে। বিশেষ করে শ্যালনের যৌবন ভরা লোভনীয় দেহটাকে কতক্ষণ সে উপেক্ষা করে চলতে পারবে। পায়চারি শুরি করে বনহুর, আজকেই তাকে এ হোটেল ত্যাগ করে চলে যেতে হবে।
