অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রগুলোও বেজে উঠলো পিয়ানোর সঙ্গে যোগ দিয়ে।
কক্ষস্থ সবাই মুগ্ধ হয়ে গেলো। তন্ময় হয়ে শুনছে সবাই এ সুরের সংযোজন।
টেবিলে খাদ্যসম্ভার দেওয়া হলো।
খেতে শুরু করলেন সম্ভ্রান্ত অতিথিবৃন্দ।
ওদিকের একটা টেবিলে আলবার্ড আর শ্যালন বসেছিলো। তাদের পাশেই বসেছিলেন অভয়কর বিশ্বাস। মাঝে মাঝে তিনি শ্যালন আর আলবার্ডের সঙ্গে কিছু আলাপ-আলোচনা করছিলেন।
মাসুন ইরানীর মন পিয়ানোর মধ্যে সংশ্লিষ্ট থাকলেও দৃষ্টি তার শ্যালনকে আকৃষ্ট করছিলো। আর কখনও কখনও নজর চলে যাচ্ছিলো তার অজ্ঞাতেই দক্ষিণ কোণে সোফায় উপবিষ্ট তরুণীর উপর।
তরুণী অভয়কর বিশ্বাসের কন্যা আরতী।
মাসুদ ইরানীর পিয়ানো থেমে যায়।
করতালিতে মুখর হয়ে উঠে হলঘর।
মাসুদ ইরানী উঠে মাথার ক্যাপ খুলে সকলের আনন্দধ্বনির জবাব দেয়। হঠাৎ তার দৃষ্টি চলে যায়, শ্যালন নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
মাসুদ ইরানীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়।
কিন্তু মাসুদ ইরানী আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে–ওদিকের সোফায় বসেছিলো যে তরুণী সে কখন চলে গেছে তার আসন ত্যাগ করে। সে বুঝতে পারে তরুণী শুধু তারই পিয়ানো শোনার অপেক্ষাতেই ছিলো। যেমন পিয়ানো বাজানো শেষ হয়েছে তেমনি সরে গেছে সে। কে এ তরুণী যে শুধু পিয়ানো শোনার জন্যই এ ফাংশনে যোগ দিয়েছিলো? অভয়করের সঙ্গে কি তার সম্বন্ধ?
ফাংশন শেষ হয়।
সম্মানিত অতিথিগণ বিদায় গ্রহণ করেন।
শুধু এখনও আলবার্ড শ্যালনকে নিয়ে বসে রয়েছেন তার নির্দিষ্ট সোফায়।
বাজনাওয়ালারা সবাই চলে গেছে।
মাসুদ ইরানীও চলে গেছে কিছু পূর্বে।
অভয়কর বিশ্বাসের গাড়ি-বারান্দায় তখনও আলবার্ডের গাড়িখানা অপেক্ষা করছে।
বিরাট হলঘরটা শুধুমাত্র এখন তিনটি প্রাণী–আলবার্ড, শ্যালন এবং অভয়কর বিশ্বাস।
আলবার্ডের সঙ্গে অভয়কর বিশ্বাসের ইঙ্গিতে কিছু কথা হলো।
শ্যালন বাড়ি ফেরার জন্য চঞ্চল হয়ে পড়েছে।
এমন সময় বয় তিন কাপ চা এনে টেবিলে রাখলো।
অভয়কর বিশ্বাস এক কাপ আলবার্ডের হাতে দিয়ে দ্বিতীয় কাপ শ্যালনকে দিলেন–চা খেয়ে তারপর বাড়ি যেও।
শ্যালন বাড়ি ফেরার আনন্দে চায়ের কাপটা হাতে নেয়।
অভয়কর বিশ্বাস তৃতীয় কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দেন।
আলবার্ড এবং শ্যালনও চায়ের কাপে চুমুক দিলো।
চা-পান শেষ না হতেই শ্যালন ঢলে পড়লো তার সোফায়। আলবার্ড আর অভয়কর বিশ্বাসের দৃষ্টি বিনিময় হলো।
আলবার্ড উঠে পড়লেন।
অভয়কর তাকে গাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলেন। শ্যালনের সংজ্ঞাহীন দেহটাকে হাতের উপর তুলে নিয়ে পাশের কামরায় নিজের শয্যায় শুইয়ে দিলেন।
দরজা বন্ধ করে ফিরে গেলেন তিনি নিজ শয্যার পাশে। শ্যালনের সুন্দর ফুলের মত দেহটা দুগ্ধধবল বিছানায় ছিন্নলতার মত পড়ে আছে। অভয়কর বিশ্বাস খাটের পাশে বসে পড়লেন। উজ্জ্বল বিদ্যুতের আলোতে নিষ্পলক নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন শ্যালনের যৌবনভরা দেহটার দিকে। তারপর দক্ষিণ হাতখানা রাখলেন সংজ্ঞাহীন শ্যালনের কোমল গণ্ডের উপর। ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলো তার মাথাখানা নিচের দিকে।
ঠিক সে মুহূর্তে পিঠে অনুভব করলেন অভয়কর বিশ্বাস একটা হিমশীতল কঠিন বস্তুর ছোঁয়া। চমকে সোজা হলেন তিনি, ফিরে তাকাতেই আড়ষ্ট হয়ে গেলেন, জমকালো মূর্তি তার পিছনে দাঁড়িয়ে, তার হস্তের রিভলভারের ছোঁয়াই পিঠে হিমশীতল কঠিন পরশ দিয়েছে।
জমকালো মূর্তি বললো এবার–পাপাত্মা, একটা নিষ্পাপ জীবনকে তুমি বিনষ্ট করতে যাচ্ছো! জানেনা এর শাস্তি কি?
ফ্যাকাশে মুখে বলে উঠেন অভয়কর বিশ্বাস–এ ঘরে তুমি কি করে প্রবেশ করলে?
লৌহসিন্দুকেও যমের প্রবেশ অসাধ্য নয়।
তুমি
হাঁ, আমি তোমার যম!
কি চাও তুমি আমার কাছে? কত টাকা চাও?
আজ টাকা নয়, এ নিষ্পাপ যুবতীকে তোমার কবল থেকে উদ্ধার করতে চাই।
না। আমি কিছুতেই একে দেবো না।
দেবে না?
না, আলবার্ডের নিকট হতে একে আমি খরিদ করেছি। কোটি টাকার বিনিময়ে—
তোমার জীবনের মূল্য ক’ কোটি টাকা হতে পারে?
কে তুমি?
আমি তোমার হিতৈষী বন্ধু।
যদি হিতৈষী বন্ধু হও তাহলে–তাহলে চলে যাও। যত টাকা চাও তাই দেবো। শ্যালনকে আমার চাই।
তোমার সমস্ত ঐশ্বর্যের বিনিময়েও তুমি ওকে পাবে না। দাঁতে দাঁত পিষে বললো কলো মূর্তি।
এতে তোমার স্বার্থ? বললেন অভয়কর।
হাসলো কালোমূর্তি–হিতৈষী বন্ধু কোনোদিন স্বার্থ নিয়ে কাজ করে না। কালোমূর্তির হস্তে তখনও উদ্যত রিভলভার অভয়কর বিশ্বাসের বুক লক্ষ্য করে স্থির রয়েছে।
অভয়কর বিশ্বাস ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছেন একবার জমকালোমূর্তির কালো আবরণে ঢাকা মুখখানার দিকে, আর একবার তাকাচ্ছেন তার হস্তের উদ্যত রিভলভারের দিকে।
বিছানায় সংজ্ঞাহীন শ্যালন পড়ে আছে।
এবার কালোমূর্তি তার পকেট থেকে সিল্ক কর্ড বের করে অভয়কর বিশ্বাসকে মজবুত করে বেঁধে ফেললো, আর একখানা রুমাল গুঁজে দিলো তার মুখের মধ্যে। শ্যালনের পাশে বিছানায় ওকে শুইয়ে দিয়ে শ্যালনকে তুলে নিলো কাঁধে।
*
শ্যালনকে পিছন আসনে শুইয়ে দিয়ে ড্রাইভ আসনে উঠে বসলো কালোমূর্তি। এবার উল্কা বেগে গাড়ি ছুটতে শুরু করলো। গাড়িতে বসেই কালোমূর্তি তার জমকালো পোশাক খুলে ফেললো। লুকিয়ে রাখলো ড্রাইভিং আসনের নিচে।
