বজ্ৰবিহারী ঢোক গিলে বললো তুমি, তুমি কে?
আমি হিতৈষী বন্ধু, যা বললাম স্মরণ রেখো–কথাটা বলে যেমন এসেছিলো তেমনি বেরিয়ে গেলো সচ্ছন্দে কালোমূর্তি।
বজ্ৰবিহারী শর্মা আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন–কে আছো ডাকাত ডাকাত–পুলিশ—
পুলিশ– বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ থেকে ছুটে এলো সবাই, ঘিরে ধরলো বজ্ৰবিহারী শর্মাকে।
বজ্ৰবিহারী শর্মা তখন মাথায় করাঘাত করে বিলাপ করে বলছেন–হ্যায়, আমার সব নিয়ে ডাকাত পালিয়েছে–
ততক্ষণে কালোমূর্তি তার গাড়িতে চেপে বসে ষ্টার্ট দিয়েছে।
সে রাত্রেই কালোমূর্তি আরও দু’টো জায়গায় হানা দিয়ে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা নিয়ে উধাও হয়। এ দু’টো ডাকাতি হয় হ্যারিসন রোডের দুটো মারোয়াড়ীর দোকানে। একটি সোনার দোকান অন্যটি ময়দার গুদামে!
*
পরদিন পত্রিকায় ব্যাপারগুলো বিভিন্ন আকারে প্রকাশ পেলো। কালীঘাটের বজ্রবিহারী শর্মা এবং মারোয়াড়ীদ্বয়ের দোকানের ডাকাতির সঙ্গে কালোমূর্তির আবির্ভাবজড়িত অদ্ভুত কাহিনী।
আরও প্রকাশ পেলো–অভয়কর বিশ্বাসের কোম্পানীর অফিস রুমে কালোমূর্তি দস্যু প্রবেশ করে মিঃ। বিশ্বাসের বিশ্বস্ত কর্মচারী ভীম সিংকে আহত করে অন্তর্ধান হয়েছে।
সমস্ত কলকাতা শহরের বুকে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। একি অদ্ভুত কাণ্ড! কোথা থেকেই বা আচমকা কালোমূর্তির আবির্ভাব হয়–আবার হানা দিয়ে সব লুটে নেবার পর কোথাই বা চলে যায়।
পুলিশ মহল সজাগ পাহারা দিয়েও কিছুই করতে পারছে না। শহরবাসিগণ এখন সদা আশঙ্কা নিয়ে যানবাহনে চলাফেরা করছে। কোন্ মুহূর্তে কোথায় কালোমূর্তি হানা দিয়ে বসবে কে জানে।
বনহুর প্রতিদিনের মত আজও পত্রিকাখানা তুলে নিলো হাতে। বাম হস্তের আঙ্গুলের ফাঁকে ধূমায়িত সিগারেট। আলগোছে দৃষ্টি বুলিয়ে চললো সে পত্রিকাখানার উপর। কুঞ্চিত হয়ে উঠলো, মৃদু একটি হাসির রেখা ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে।
*
অভয়কর বিশ্বাসের হলঘর।
আজ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে সমস্ত ঘরখানা। ফুলদানীতে সদ্য ফোঁটা রজনীগন্ধার থোকা শোভা পাচ্ছে। লোবানদানীতে সুগন্ধি লোবান মিষ্টিমধুর গন্ধ ছড়াচ্ছে। মার্জিত রুচিসম্পন্নভাবে সোফাসেটগুলো থরে থরে সাজানো।
অভয়কর বিশ্বাস নিজেও আজ তরুণ যুবকের বেশে সজ্জিত হয়েছে।
দক্ষিণ পার্শ্বের ডায়াসে পিয়ানো আর অর্কেষ্ট্ৰা বাদ্যযন্ত্রগুলো সাজানো। একটু পরেই গণ্যমান্য অতিথিগণ এসে পড়বেন। আজকের উৎসবের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানী পিয়ানো পরিবেশন করবেন।
সন্ধ্যার পর থেকেই অতিথিগণ আসতে শুরু করলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বালিগঞ্জের চৌ-রাস্তার পাশে অভয়কর বিশ্বাসের বাড়ির সম্মুখে অসংখ্য গাড়ি ভীড় করে। দাঁড়ালো। স্টুডি কমাণ্ডার, বুইক, কুইন, প্রেসিডেন্ট, মাষ্টার বুইক কত রকম গাড়িই না এসে পৌঁছলো আজ। অভয়কর বিশ্বাসের বাড়ির সম্মুখস্থ রাস্তার পাশে।
অতিথিগণ সবাই আসন গ্রহণ করলেন।
অভয়কর বিশ্বাস গাড়ি-বারান্দায় পায়চারি করছেন, আমন্ত্রিত অতিথিগণ সবাই এসে গেছেন শুধু এখনও আসেননি আলবার্ড এবং তার ভ্রাতুস্পুত্রী শ্যালন।
আজকের উৎসবের মূল উদ্দেশ্যই আলবার্ড তার আশ্রিতা শ্যালনকে নিয়ে আসবেন তার বাড়িতে।
রাত বেড়ে আসছে।
সমস্ত অতিথিবৃন্দ উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছেন। অর্কেষ্ট্রা বাদ্যযন্ত্রগুলোর সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাদ্যকরগণ, শুধুমাত্র পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানী এখনও এসে পৌঁছায়নি।
কক্ষস্থ সবাই মাসুদ ইরানীর দর্শন লাভের আশায় উন্মুখ। তার নিপুণ হস্তের পিয়ানো বাজনা শুনতে পাবে এই যেন সকলের কামনা।
অভয়কর বিশ্বাসের কন্যা আরতীও আজকের আসরে যোগ দিয়েছে। সে পিতার কোনো ফাংশানে বড় বেশি আসতো না। আজ তার ইচ্ছা–মাসুদ ইরানীর পিয়ানো বাজানো শুনবে।
এক পাশে বসেছিলো আরতী। ধীর-স্থির-শান্ত লাবণ্যময়ী মেয়েটি যেন।
শুধুমাত্র তিনটি অতিথির জন্য এখনও টেবিলে খাবার দেওয়া হয়নি।
ডায়াসে অর্কেস্ট্রা বাজতে শুরু করেছে। দুগ্ধধবল উজ্জ্বল টিউব লাইট থেকে বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি কক্ষটাকে স্বপ্নপুরীর মত মনোরম করে তুলেছে।
প্রত্যেকটা টেবিলে নারী-পুরুষ মিলে ঘিরে বসেছে। হাসি গল্প আর অর্কেস্ট্রার সুর সৃষ্টি করেছে অভূতপূর্ব .. একটা পরিবেশ।
এমন সময় আলবার্ডের সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলো শ্যালন। হাস্যোদ্দীপ্ত চঞ্চল মেয়েটি। শ্যাম্পু করা একরাশ কোঁকড়ানো চুল ছড়িয়ে আছে ঘাড়ের চারপাশে। লিপষ্টিক রঞ্জিত রক্তাভ দুটি চিকণ ওষ্ঠ। নীল উজ্জ্বল দুটি চোখ।
অভয়কর বিশ্বাস এদের অভ্যর্থনা করে বসালেন। তার মুখমণ্ডলে আনন্দোচ্ছাস ফুটে উঠলো।
কিন্তু একি, এততক্ষণেও এলোনা মাসুদ ইরানী, ব্যাপার কি!
ঠিক সে মুহূর্তে একখানা বিরাট প্লিমাউথ গাড়ি এসে থামলো অগণিত গাড়িগুলোর পাশে। গাড়ি থকে নেমে এলো দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ সুঠাম দীপ্তকান্তি যুবক মাসুদ ইরানী। প্রবেশ করলো হলঘরে।
কক্ষস্থ সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো মাসুদ ইরানীর উপর। মাসুদ ইরানী কক্ষে প্রবেশ করেই মাথার ক্যাপ। খুলে সবাইকে উদ্দেশ্য করে সাহেবী কায়দায় অভিনন্দন জানালো, তারপর এগিয়ে গেলো সে ডায়াসের দিকে।
ক্ষণিকের জন্য অর্কেস্ট্রা থেমে গেলো।
মাসুদ ইরানী ডায়াসে পিয়ানোর সম্মুখে এসে বসলো। টিউব লাইটের উজ্জ্বল আলোতে মাসুদ ইরানী কক্ষমধ্যে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো, তারপর হাত রাখলো পিয়ানোর রীডে। অপূর্ব এক সুরের ঝঙ্কারে মুখর হয়ে উঠলো সমস্ত কক্ষটা।
